দীর্ঘদিন ধরে মধ্যবিত্তের খাদ্যতালিকায় আমিষের অন্যতম উৎস হিসেবে গরুর মাংস একটি বড় স্থান দখল করে ছিল। মধ্যবিত্তরা তো বটেই নিম্ন মধ্যবিত্তরা মাসে অন্তত একবার গরুর মাংসকে খাদ্যতালিকায় রাখতে সক্ষম হতো। কিন্তু মাংসের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধিতে এখন গরুর মাংস খাদ্যতালিকা থেকে বাদ পড়ার উপক্রম হয়েছে। আমিষের আরেকটি বড় উৎস ডালের মূল্যও বাড়তে বাড়তে অনেক সময়ই নাগালের বাইরে চলে যায়। ডিমের অবস্থাও তথৈবচ। তাই এখন নি¤œ আয়ের মানুষদের আমিষের জোগান দেওয়া একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে। বিকল্প শুধু ব্রয়লার বা চাষের মাছ। কিন্তু এসব খাদ্যপণ্যের খাদ্যমান কতটুকু বা তা কতটা স্বাস্থ্যসম্মত সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দেশের মানুষের জন্য খাদ্যতালিকায় পুষ্টিগুণসম্পন্ন আমিষের জোগান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
এরই মধ্যে রাজধানীর কিছু জায়গাতেই গরুর মাংসের দাম বৃদ্ধির খবর এলো। গত শুক্রবার কিছু এলাকায় এই মাংসের কেজি ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা গত জানুয়ারিতে ছিল ৫০০ টাকা। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের শুরুতে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল ২৫০ টাকা। ওই বছর রমজানে তা বাড়িয়ে ২৭৫ টাকা করা হয়। পরের বছর রমজানে তা ২৮০ টাকা হয়। ২০১৫ সালে ভারত থেকে গরু আমদানি কমে গেলে এই মাংসের দাম হয় কেজিপ্রতি ৩৭০ টাকা। ২০১৭ সালের রমজানে আরেক দফা দাম বেড়ে হয় ৪২০ টাকা। কয়েক দিন পরই আরও ২০ টাকা বেড়ে ৪৪০ টাকায় বিক্রি হয়। ২০১৮ সালের রমজানে গরুর মাংস প্রতি কেজি ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। চলতি বছর রমজানে গরুর মাংস ৫৫০-৫৮০ টাকায় বিক্রি শুরু হয়। মাংসের শনৈ শনৈ দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সীমিত আয়ের মানুষের সঙ্গতি যে মিলছে নাÑতা বলাই বাহুল্য।
শুধু গরুর মাংসই নয়, অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ও ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধিতে মধ্যবিত্ত-নি¤œমধ্যবিত্তের নাজেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পেঁয়াজের মূল্য নিয়ে তেলেসমাতি এখনো চলছে। মাঝে চালের মূল্যবৃদ্ধির খবরও এসেছে। এখন শীতের সবজিতে বাজার সয়লাব হলেও দাম খুব কমেনি। এক সপ্তাহের ব্যবধানে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে বেড়েছে ২ টাকা। বেড়েছে পাম অয়েলের দামও। গরুর মাংসের ব্যবসায়ী ও খামারিরা মূল্যবৃদ্ধির একটা বড় কারণ হিসেবে চাঁদাবাজিকে চিহ্নিত করে। তাদের অভিযোগ, সড়কে ও বাজারে তাদের বড় অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। তখন এই চাঁদার ক্ষতি পোষাতেই মাংসের মূল্যবৃদ্ধি করতে হয়।
অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আমিষ হিসেবে গরুর মাংসের সুনাম থাকলেও অনেক সময় খামারিরা বাড়তি লাভের আশায় স্টেরয়েড দিয়ে গরুকে মোটাতাজা করে থাকে। এই জাতীয় গবাদিপশুর মাংস অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটাতাজাকরণের এসব ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট হয় না। গরুর দেহের মাংসে রয়ে যায়। এসব মাংস যখন মানুষ খায় তখন ওইসব ওষুধের প্রতিক্রিয়া মানুষের শরীরেও দেখা দেয়। স্টেরয়েড ওষুধ মানবদেহের কিডনি, ফুসফুস, লিভার, হৃৎপিণ্ডকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মানবদেহের রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। তাই খামারিরা যাতে এই বাড়তি মুনাফার প্রত্যাশায় এই অস্বাস্থ্যকর মাংসের জন্য গরু সরবরাহ না করে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
বর্তমানে দেশে গবাদিপশু লালন-পালনের একটা বড় ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। এই খাতে লগ্নি করা অর্থের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা এবং প্রায় দেড় কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে যুক্ত। এই খাত অনেক তরুণ উদ্যোক্তাকে আয়রোজগারের পথ দেখিয়েছে এবং তাদের স্বাবলম্বী করেছে। তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। এই খাতকে কীভাবে আরও বিকশিত করা যায়, সেটাই এখন গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বাংলাদেশ কীভাবে এই খাতের রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে পারে, সেই লক্ষ্যেই আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত। কৃষিনির্ভর এই দেশে গবাদিপশুর উৎপাদন বৃদ্ধি ও এই খাতের উন্নয়ন বাড়তি সুফল দেবে। কারণ, এর সঙ্গে জৈব সার এবং পরিবেশের কথা যদি আমরা বিবেচনা করি, তাহলে গবাদিপশুর অধিকতর উন্নয়ন কৃষিজমিকে উর্বর এবং দুধের চাহিদা পূরণের একটি বিরাট উৎস হিসেবে গণ্য হবে। পুষ্টির ঘাটতি মেটানো আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। গবাদিপশু খাতের বিকাশ আমাদের দুগ্ধশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি দেশের ভেতরে মাংসের চাহিদা পূরণ করতে বাজারে একটি সুষম ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন বিত্তের ক্রেতাদের আওতার বাইরে চলে গেলে গরুর মাংস বড় বাজার হারাবে।
গরুর মাংসের মূল্য যেভাবে বেড়েছে, তা হয়তো রাতারাতি কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে মাংসের সরবরাহ ও বিপণন যাতে সুষম হয় এবং বাজারে যাতে যেন স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা যায় সেদিকে লক্ষ্য প্রদান করা জরুরি। সরকার, মাংস বিক্রেতারা এবং খামারিরা সম্মিলিতভাবে এমন উদ্যোগ গ্রহণ করবেন, যাতে মাংস বিক্রেতারা এবং খামারিরা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি মাংসের মূল্য সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে থাকবে।
