ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে অতীতের ‘বিব্রতকর’ অভিজ্ঞতার কারণে আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে নতুন কৌশল নিয়েছে আওয়ামী লীগ। এবার আগেভাগেই আওয়ামী লীগ সমর্থক কাউন্সিলর প্রার্থীদের কাছ থেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের এক ফরমে স্বাক্ষর নিয়ে রাখা হয়েছে। মূলত বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে এবং বিদ্রোহী প্রার্থী থাকার কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে যে মারামারি-সহিংসতা হয় তা কমানোর কৌশল হিসেবে এ পদক্ষেপ নিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি।
জানা গেছে, ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থক ১২৯৩ জন কাউন্সিলরের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে উত্তরে ৬২৬ ও দক্ষিণে ৬৬৭ জন। উত্তরে সাধারণ ওয়ার্ড ৫৪টি, সংরক্ষিত ১৮টি। আর দক্ষিণে সাধারণ ওয়ার্ড ৭৫টি, সংরক্ষিত ২৫টি।
নির্বাচনী আইন অনুসারে মেয়র পদে রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়ন দিতে পারলেও কাউন্সিলর পদে পারে না। ফলে দলীয় সমর্থন না পেলেও অনেক ওয়ার্ডে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে এক দলের একাধিক নেতাকে প্রার্থী হতে দেখা যায়, যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে পরিচিতি পান।
এবার বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানোর কৌশলের অংশ হিসেবে কাউন্সিলর পদে দল যাকে সমর্থন দেবে তার বাইরে কাউকে নির্বাচনে
অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখছে না আওয়ামী লীগ। আগেভাগেই কাউন্সিলরদের কাছ থেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের একটি ফরমে স্বাক্ষর নিয়ে রেখেছে ক্ষমতাসীনরা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ কৌশল শুধু কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করার জন্যই নয়, নির্বাচনে মারামারি-সহিংসতা এসব কমাতেও কাজে আসবে। তারা বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কাউন্সিলর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি থাকে। এর ফলে মারামারি-হানাহানি এসব ঘটনা ঘটে।
গতকাল শনিবার ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী সব আওয়ামী লীগ নেতাকে গণভবনে ডেকে নেওয়া হয়। তাদের সবার হাতে হাতে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের ওই ফরম তুলে দেওয়া হয়। গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্মকর্তারা সবাইকে ওই ফরম সরবরাহ করেন এবং স্বাক্ষর করতে অনুরোধ করেন। ওই অনুরোধে সায় দিয়ে তারা সবাই ওই ফরমে স্বাক্ষর করে তা আবার ওই কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেন। সেখানে উপস্থিত একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী দেশ রূপান্তরকে বিষয়টি জানিয়ে বলেন, কাউন্সিলর নির্বাচনে বিদ্রোহী ঠেকাতে আওয়ামী লীগ এই কৌশল নিয়েছে। তারা আরও বলেন, আগে থেকে ফরমে স্বাক্ষর নিয়ে রাখার কারণ হলো দল কাউকে সমর্থন দিলে যাতে অন্য কোনো প্রার্থী কাউন্সিলর ভোটে অংশ নিতে না পারেন। তাই আগে থেকেই বিদ্রোহী জটিলতা দূর করে রাখছে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীনদের এই কৌশলে গণভবনে উপস্থিত একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী হতাশা প্রকাশ করেন। তারা বলেন, যথাযথ ও জনপ্রিয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হলে এই প্রক্রিয়া গ্রহণ করা যেত। কিন্তু তা তো হয় না। এখানে নেতাদের সুপারিশ, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, মাইম্যান ও আর্থিক লেনদেনের ফলে অনেক অজনপ্রিয় প্রার্থীও মনোনয়ন পাওয়ার যোগ্য হয়ে যায়। তাতে ত্যাগীরা যেমন মূল্যায়ন পায় না, তেমনি দলের জন্য ভালো কিছু করারও সুযোগ থাকে না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, কাউন্সিলর নির্বাচন নির্দলীয় হলেও দলীয় সমর্থন থাকে কারও না কারও পক্ষে। সেখানেও দলীয় বিবেচনায় নিয়ে আমরা মনোনয়ন দিয়ে থাকি। এক্ষেত্রে দল একজনকে সমর্থন দিলে আরেকজন ভোটের মাঠে থেকে যায়। সেক্ষেত্রে দল সমর্থিত প্রার্থীর ভরাডুবির আশঙ্কা থেকে যায়। তাই বিদ্রোহীরা যাতে প্রার্থী হতে না পারে দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, অতীতে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে আমদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারই আলোকে সবাইকে গণভবনে ডেকে আগেই প্রত্যাহার ফরমে স্ব স্ব প্রার্থীদের স্বাক্ষর নিয়ে রাখা হয়েছে। যাতে দল একজনকে সমর্থন দিলে অন্যজন বিদ্রোহ প্রকাশ করে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না পায়। আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর আরেক সদস্য বলেন, কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে দল ততটা সিরিয়াস থাকে না। ফলে এই পদগুলোতে নির্বাচনে যা তা অবস্থা সৃষ্টি হয়। আর বিদ্রোহীদের কারণে দল সমর্থিত প্রার্থীরা একটা ‘মারজিনাল’ ভোটে হেরেও যায়। এতে করে অন্য দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে আসে। আমরা এবার সেই সুযোগ দিতে চাই না। কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে দল যাকেই সমর্থন দেয় দলীয় নেতাকর্মীরা যেন তার পক্ষেই কাজ করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দল সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয়ের সম্ভাবনা কম থাকবে।
