এবার নুরের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ০১:৩৬ এএম

এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছেন ছাত্রলীগের এক নেতা। এতে ফেইসবুকে ছাত্রলীগকে নিয়ে

‘অসম্মানজনক ও মানহানিকর’ বক্তব্য এবং ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস সম্পর্কে ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। রাজধানীর ধানমণ্ডি থানায় গত শুক্রবার মামলাটি করেন ঢাবির জগন্নাথ হল শাখা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক ও হল সংসদের বহিরাঙ্গন ক্রীড়া সম্পাদক অর্ণব হোড়। মামলায় নুরের সংগঠন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ রাশেদ খানকে আসামি করা হয়েছে। ধানমণ্ডি থানার ওসি হুমায়ুন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলাটির তদন্ত করবে ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগ।

এদিকে গত ২২ ডিসেম্বর ডাকসুতে ভিপি নূরসহ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ ও মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ক্যাম্পাসে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেছে ‘সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্রঐক্য’। এছাড়া

ডাকসুতে হামলার ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটি ঢামেক হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাধীন নূরের বক্তব্য নিয়েছে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার ভিপি নুরসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা ও চুরির অভিযোগে শাহবাগ থানায় মামলা করেছিলেন ডি এম সাব্বির নামে ঢাবির এক শিক্ষার্থী। তিনি গত বছর ঢাবির সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ছিলেন।

গত রবিবার ডাকসু ভবনে নিজের কক্ষে হামলার শিকার হন ভিপি নুর ও তার সংগঠনের একদল নেতাকর্মী। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের একাংশ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ওই হামলা চালান বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য। এ ঘটনার পর দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ ঘটনায় পরদিন রাতে শাহবাগ থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক মোহাম্মদ রইচ উদ্দিন। এতে ৮ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাত আরও ৩৫ জনকে আসামি করা হয়। ওই মামলায় গ্রেপ্তার ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের’ তিন নেতাকে ছয় দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ভিপি নুরের পক্ষে ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দামসহ ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন। অভিযোগটি পুলিশের করা মামলার সঙ্গে যুক্ত করে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে শাহবাগ থানা পুলিশ।

নুরের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা : ছাত্রলীগ নেতা অর্ণব হোড় ধানমণ্ডি থানায় করা মামলার এজাহারে বলেন, ‘নুরুল হক নুরসহ অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তার ফেইসবুক পেজে গত ২৩ ডিসেম্বর একটি পোস্ট দেন। যেখানে উল্লেখ করেন, বুয়েট ছাত্র আবরার, ঢাবির আবু বক্কর, ঢামেকের রাজিব, চবির দিয়াজ, পুরান ঢাকার বিশ্বজিৎদের হত্যাকারী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ত্রাস, ভিন্নমতের ওপর প্রতিনিয়ত হামলাকারী, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। স্বৈরাচারের বিরোধিতা ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাস, হত্যাসহ নানা ধরনের বর্বরতার প্রতিবাদ করার কারণেই এ পর্যন্ত ৯ বার আমাকে হত্যাচেষ্টা করা হয়। সর্বশেষ গতকাল ডাকসুতে ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি, ভারতীয় ‘র’-এর এজেন্ট, ইসকন সদস্য সনজিত ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম এবং তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নামক ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী মঞ্চের সভাপতি বুলবুল ও মামুনের নেতৃত্বে আমাকে হত্যাচেষ্টায় ডাকসুতে তিন দফা আমার ওপর হামলা চালানো হয়। সংগঠনের সহযোদ্ধাদের ওপর অসংখ্যবার হামলা চালানো হয়। এদেশের ছাত্রসমাজ তথা সাধারণ মানুষ পাশে থাকলে হামলা করে কিংবা মামলা দিয়ে আওয়ামী স্বৈরাচাররা কখনোই আমাদের থামাতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। আওয়ামী লুটেরা, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসীরা আজ পাকিস্তানি হানাদারদের থেকেও বর্বর হয়ে গেছে। সেটা তাদের কাজকর্মে-কথাবার্তায় ইতিমধ্যেই আপনারা টের পেয়ে গেছেন। তাই দেশকে মুক্ত করতে জনগণকে বাঁচাতে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। হাসপাতাল থেকে ছাত্রসমাজ তথা দেশবাসীর প্রতি ভিপি নুরের আহ্বান।’

এছাড়া একই ফেইসবুক পেজ থেকে গত ২২ ডিসেম্বর করা একটি লাইভের লিঙ্ক উল্লেখ করা হয়েছে এজাহারে। এতে বলা হয়েছে, লাইভে এসে ‘গুজব ছড়ানোর’ পাশাপাশি মুহাম্মদ রাশেদ খান বলেন, ‘আমাদের সবার এই যে মাথা আলাদা কইরা ফেলাইছে। যা ডাকসু ভিপি নুরের কক্ষ থেকে প্রচার করা হয় যা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।’ 

ছাত্রলীগ নেতা অর্ণব এজাহারে আরও বলেন, ‘উপরোক্ত দুটি ঘটনা আমি ধানমণ্ডি রোড নম্বর ৩/এ আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অবস্থানকালে গত ২৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে দেখতে পাই। উল্লিখিত ফেইসবুক পেজ থেকে ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর বিভিন্ন সময় নিজেই ফেইসবুক লাইভে আসত। উক্ত ফেইসবুক লাইভে প্রচারকৃত মিথ্যা গুজবের কারণে ঢাবিসহ সারা দেশের ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। যার কারণে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার উপক্রম হয়।’

এজাহারে বলা হয়েছে, ‘২৩ ডিসেম্বরের উসকানিমূলক পোস্ট ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাসের সম্পর্কে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করাসহ ঢাবি ছাত্রলীগের জন্য অসম্মানজনক, মানহানিকর। এই কর্মকাণ্ডগুলো দেশ ও সমাজের সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিনষ্ট করে।’ এজাহারের সঙ্গে ফেইসবুক পেজের চারপাতা স্ক্রিনশট ও লাইভ ভিডিওর রেকর্ডকৃত সিডিও জমা দিয়েছেন অর্ণব।

এ বিষয়ে সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের উপকমিশনার আ ফ ম আল কিবরিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলাটি ডিএমপি সদর দপ্তর হয়ে আমাদের কাছে আসবে। তারপর তদন্তকাজ শুরু করব।’ 

তদন্ত কমিটির কাছে হামলা বর্ণনা দিলেন নুর : এদিকে ভিপি নুরুল হক নুর এবং তার সঙ্গীদের ওপর হামলার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি সদস্যরা গতকাল সকাল ১১টার দিকে ঢামেক হাসপাতালে নুরের সঙ্গে দেখা করেন। তার কাছ থেকে ২২ ডিসেম্বরের হামলার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন তারা। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের ভিপি নুর জানান, বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটির সদস্যরা ওইদিনের (২২ ডিসেম্বর) হামলার বিষয়ে জানতে চেয়েছেন, যা ঘটেছিল তাই বলা হয়েছে। ডাকসু ভবনে ভিপি নুরুল হক নুর ও তার সঙ্গীদের ওপর হামলার ঘটনা তদন্তে পরদিন গত ২৩ ডিসেম্বর ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে ঢাবি কর্র্তৃপক্ষ। ঘটনা তদন্ত করে কমিটিকে ছয় কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।

ঢাবিতে সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্রঐক্যের পদযাত্রা : ডাকসু ভিপি নুর ও তার সঙ্গীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ ও তাদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল বিকেলে সমাবেশ ও  পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেছে ১২টি ছাত্র সংগঠনের নতুন জোট ‘সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্রঐক্য’। বিকেল ৩টার দিকে ঢাবির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে প্রথমে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। এরপর সেখান থেকে পদযাত্রা শুরু হয়ে কলাভবন, মধুর ক্যান্টিন, ফুলার রোড, নীলক্ষেত, কাঁটাবন ও  শাহবাগ মোড় ঘুরে আবারও রাজু ভাস্কর্যে এসে শেষ হয়।

সমাবেশে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন বলেন, ‘ডাকসু ভবনে আমাদের ওপর হামলা করা হলো। এখন দেখছি এই হামলায় আহতদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হলো। প্রশাসনকে হুঁশিয়ার করে বলতে চাই অতি দ্রুত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে হামলায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসুন।’

ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান বলেন, ‘আমরা বারবার মার খাচ্ছি আর হাসপাতালে যাচ্ছি, আবার আমাদের বিরুদ্ধেই মামলা করা হচ্ছে।’ ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি মেহেদি হাসান নোবেল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় এখন মৃত্যু কারখানায় পরিণত হয়েছে। এর কারিগর ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। যেখানেই তাদের সন্ত্রাস দেখা যাবে সেখানে সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্রঐক্য প্রতিহত করবে।

সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন স্বতন্ত্র জোটের নেত্রী ও শামসুন্নাহার হল সংসদের ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি, বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলনের আতিফ অনিক, ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি মাসুদ রানা প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত