২০২০ সালে ট্রাম্পকে হারাতে যা লাগবে

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:৪৫ পিএম

বিল ক্লিনটন ও বারাক ওবামা উভয়েই ‘আশা’ শব্দটির ওপর ভর করে প্রচারণা চালিয়ে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেছিলেন। এবার নির্বাচনে জয়ের জন্য ডেমোক্র্যাটদের জাদুকরী শব্দটি কী হতে পারে?

আমার প্রস্তাব : সাবান।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদের তিন বছর হতে চলেছে। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের দরকার খুব ভালোরকম ঘষেমেজে পরিষ্কার করা এক দফা গোসল। এ সরকার প্রতিদিন এমন কিছু না কিছু করেছে যাতে দেশটি নিরন্তর নোংরা বোধ করেছে। সরকারের সেই গ্লানি আর ক্লেদ ধুয়েমুছে ফেলা দরকার। এমন একজন প্রেসিডেন্ট সেই নোংরা বোধের জন্য দায়ী যিনি কিনা অভিশংসনের রাতেও মিশিগানের জনসভায় দুঘণ্টা ধরে গালমন্দ করেছেন।

ইউক্রেনের সঙ্গে গোলমেলে লেনদেনকে কে ‘নিখুঁত’ বলেছেন? ‘তিনি আমাকে সুন্দর সুন্দর চিঠি লিখেছেন। আমরা প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম’- বলে কে বিশে^র সবচেয়ে নিষ্ঠুর একনায়কের প্রশংসা করেছেন?  কে সিরিয়ায় দুর্বল মিত্রদের ত্যাগ করার পর ‘শুধুমাত্র তেলের জন্য’ সেনা রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন। কে এল পেসোর হত্যাযজ্ঞের মাত্র এক বছর আগে ‘আমাদের দেশে ঢুকে পড়ে সর্বত্র ছেয়ে ফেলছে’ বলে অভিবাসীদের ভিলেন হিসেবে তুলে ধরেছেন?

তালিকা সহজে শেষ হবে না। গত জুনে পিউ রিসার্চ সেন্টার দেশের মানুষের আলাপ-আলোচনার অবস্থা নিয়ে একটি জরিপ করেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য হচ্ছে, ৫৯ শতাংশ রিপাবলিকান মনে করেন তারা প্রায়ই বা কখনো কখনো ট্রাম্পের কথাবার্তায় উদ্বিগ্ন বোধ করেন। এই সংখ্যা ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হবে না। এর কারণ তিনটি।

ক্রমশই বেশি করে বৈরী : প্রথমত, ৭৬  শতাংশ আমেরিকান দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে ইতিবাচক মনে করেন।  ট্রাম্পের প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার সময় যা ছিল মাত্র ৪৮ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, প্রগতিশীল বামদের মূল্যবোধ দৃশ্যত ক্রমেই বেশি করে মূলধারার মূল্যবোধের প্রতি বৈরী হয়ে উঠছে। ট্র্যান্সজেন্ডার ইস্যু নিয়ে সোজাসাপ্টা মতামত দেওয়ায় চাকরিচ্যুত এক নারীর সমর্থনে লেখক জে কে রাওলিংয়ের টুইট নিয়ে ঝড় যার বড় প্রমাণ। তৃতীয়ত, বামপন্থিরা যতই ট্রাম্পের ব্যাপারে গালমন্দ করেন আর বলেন ট্রাম্পের কাছ থেকে বিপর্যয় আর ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু মিলবে না, ওইসব বিপর্যয় আর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বাস্তবের সঙ্গে না মেলায় ততই তাদের কথা বাস্তবতাবর্জিত মনে হয়।

গত অক্টোবরের শেষ থেকে ট্রাম্পের প্রতি গড় জনসমর্থন টানা বেড়ে চলাটা তাই বিস্মিত হওয়ার মতো কিছু নয়। মধ্যপন্থিদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খারাপ হতে পারেন, তবে তার নিন্দুকরা যতটা বলেন ততটা মোটেই না। একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায়, ট্রাম্পের সমালোচকরা তার ব্যাপারে হয়তো আংশিক সঠিক, কিন্তু তারা নিজেরা যতটা মনে করেন তার চেয়ে অনেক কম সঠিক। হোয়াইট হাউজের গদিতে আসীন অনুতাপহীন ব্যক্তি আর তাকে উৎখাতে উঠে পড়ে লাগা স্বঘোষিত সন্তদের মধ্যে লড়াইয়ে হয়তো অপ্রিয় লোকটিরই জয় হবে।

ট্রাম্পের পক্ষ-বিপক্ষের লোকজনের বাগ্্যুদ্ধে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে অর্থনীতির বড় ধরনের কোনো সংস্কারের অঙ্গীকার না করা। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কোনো সংস্কারের এ মুহূর্তে প্রয়োজনও নেই। দেশটির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে বেশ কয়েকটি গুরুতর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছে ক্রমহ্রাসমান জন্মহার, ২৩ ট্রিলিয়ন ডলারের ওপরে জাতীয় ঋণ, বৈদেশিক মুক্তবাণিজ্যের মতৈক্যে ফাটল ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতি হমকি। তবে যারা মনে করেন বড় ধরনের সরকারি ব্যয় (যার অর্থায়ন হবে অংশত অসাংবিধানিক ও অকার্যকর সম্পদ কর থেকে) নির্বাচনী সাফল্য এনে দেবে তাদের উচিত ব্রিটেনের হতভাগ্য লেবার দলের নেতা জেরেমি করবিনের ভাগ্যের দিকে তাকানো।

তাহলে কাজ হবে কীসে? অবকাঠামো খাতে বুদ্ধিদীপ্ত ব্যয়। আয় ও সঞ্চয়ের ওপর কর হাসের মাধ্যমে কার্বন অফসেটের ওপর নতুন কর। সম্পদশালীদের ওপর কর সহনশীল পরিমাণে বৃদ্ধি যা ভারসাম্যপূর্ণ বাজেটের অঙ্গীকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এসব প্রস্তাবে প্রগতিশীল উচ্চাভিলাষের ক্ষেত্রে যে ঘাটতি তা পুষিয়ে যায় রাজনৈতিক বাস্তবসম্মততার দিক থেকে। এগুলো ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিকেও হারিয়ে দেয়। তা হচ্ছে: যে-ই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়াক, তিনি লড়ছেন খ্যাপাটে বামদের বিরুদ্ধে।

এ থেকেই দ্বিতীয় পয়েন্টটি আসে। আজকের বামদের একটা বড় অংশই ট্রাম্প ঘরানার ডানপন্থিদের কুৎসিত চেহারা তুলে ধরতে গিয়ে নিজেদের দোষটা দেখতে পাচ্ছে না। বামদের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে তাদের ছিদ্রান্বেষণের স্বভাব, নোংরামি ও আত্মপ্রসাদ। কিন্তু লাখো সাধারণ আমেরিকান ঠিকই এটি দেখতে পাচ্ছে। ওক সংস্কৃতিকে (ড়িশব পঁষঃঁৎব)-(সামজিক ও জাতিগত ন্যায়বিচারের আন্দোলন) জোরদার ও ক্ষমতায়িত করে এমন কোনো প্রার্থীকে তারা ভোট দেবেন না। যেসব ডেমোক্র্যাট এ

সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকবেন (যেমন, ১৯৯২ সালে সিস্টার সুলজা নিয়ে ক্লিনটন ও ‘ক্যানসেল কালচার’ প্রসঙ্গে ওবামা) তাদেরই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

সবশেষে বলা যায়, বিজয়ী হতে হলে প্রার্থীকে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদে থাকাকে অতি গুরুত্বপূর্ণের বদলে বরং কম উল্লেখযোগ্য হিসেবে দেখাতে হবে। বোঝাতে হবে আমেরিকার দীর্ঘ রিপাবলিকান ঐতিহ্যের মধ্যে এ এক বিসদৃশ ফোঁড়া মাত্র, ভয়াবহ ক্যানসার নয়। মাইক ব্লুমবার্গের আর্থিক সক্ষমতার কাছে ট্রাম্পের অর্থসম্পদ প্রায় তুচ্ছ। জো বাইডেনের জীবনের অভিজ্ঞতার তুলনায় ট্রাম্পের আক্রমণগুলোও নস্যি। তার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের গালমন্দ ফিরিয়ে দেওয়ার বাগ্মিতা ডেমোক্র্যাট নেতা পিট বুটিগিয়েগ ও অ্যামি ক্লোবাশারেরই আছে।

বেশিরভাগ ‘বুলি’র ক্ষেত্রে যা হয়, ট্রাম্পকে হারানোর মূলমন্ত্র হচ্ছে তাকে গণনায় না ধরে চলা। ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিরোধী ও তার সমালোচনায় মেতে থাকা মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা যদি ২০২০ সালে তার ব্যাপারে একটু কম আর অন্যান্য বিষয়ে বেশি কথা বলার সংকল্প করেন তাহলে কতই না ভালো হতো! আপনার লক্ষ যখন খারাপ কিছু থেকে হাত ধুয়ে ফেলা, তখন তলোয়ার নয়. প্রয়োজন স্রেফ একখানা সাবান।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের পুলিৎজার পুরস্কারবিজয়ী সাংবাদিক ও কলাম লেখক,

গাল্্ফ নিউজ থেকে ভাষান্তর আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত