দেশে মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং কোর্স পরিচালনা নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতার নিরসন হতে যাচ্ছে। এত দিন এই কোর্স দুটি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দ্বারা পৃথকভাবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে কোর্স দুটি এককভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিচালনা করবে। অর্থাৎ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বীকৃত সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং ইনস্টিটিউট কোর্স দুটিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে পারবে এবং এসব প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরাই সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে পারবেন।
গত ২৯ নভেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি তাদের সুপারিশে এ সিদ্ধান্ত নেয়। কোর্স দুটি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এ কমিটি গঠন হয়। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তের ফলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং কোর্স।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি কাজ
করছে। চূড়ান্ত নির্দেশনা এলে আমরা সেভাবেই ব্যবস্থা নেব। এই কোর্স দুটি একটি প্রতিষ্ঠান থেকেই পরিচালিত হওয়া উচিত। এটা কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কাজ নয়। সুতরাং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনেই পরিচালিত হওয়া যথার্থ হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শিক্ষা ও হাসপাতাল বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, একই কোর্স দুই প্রতিষ্ঠান চালানোর ফলে সমস্যা হচ্ছিল। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে এ বিষয় দুটি যায় না। কারণ এই কোর্স দুটি সরাসরি চিকিৎসার সঙ্গে সম্পর্কিত। সঠিক শিক্ষা না পেলে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হবে।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং কোর্স দুটি ১৯৬২ সাল থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০০৫ সালে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স পরিচালনা শুরু করলে জটিলতার সৃষ্টি হয়। সংকট সমাধানে ২০০৭ সালে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি কোর্স দুটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একই ছাতার অধীনে পরিচালনার সুপারিশ করে। কিন্তু তা না করে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড উল্টো ২০১২ সাল থেকে নতুন করে নার্সিং কোর্স চালু করে।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আরও জানান, ২০১৩ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আদালতে ওঠে। সে বছর মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের জন্য বিজ্ঞাপন দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেই বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরাই কেবল আবেদন করতে পারবেন বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে তখন কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন মেডিকেল টেকনোলজির শিক্ষার্থীরা চাকরির আবেদন করতে পারেন না। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তখন নিয়োগের দাবিতে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট মালিকরা আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালত তখন তাদের চাকরির সুযোগ দেওয়ার পক্ষে রায় দিলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লিভ টু আপিল করে। তখন সুপ্রিম কোর্ট কারিগরি শিক্ষা বোর্ডকে ২০০৭ সালের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশ মানতে, অর্থাৎ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কোর্স দুটি পরিচালনা করতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু পাঁচ বছরেও সে নির্দেশ মানেনি কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গত ২৯ নভেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আট সদস্যের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে। কমিটির সভাপতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রইছ উদ্দিন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত সচিব (কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ); অতিরিক্ত সচিব (সিপিটি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়); অতিরিক্ত সচিব (স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ); উপসচিব (আইন ও বিচার বিভাগ), চেয়ারম্যান (বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড); রেজিস্ট্রার (বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল); সচিব (বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ)।
সেদিন এ কমিটি গত বছরের ২ ডিসেম্বর দাখিলকৃত আগের আন্তঃমস্ত্রণালয় কমিটির প্রতিবেদন বাস্তবায়নের সুপারিশ করে। ওই সুপারিশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কোর্স দুটি পরিচালনার কথা বলা হয়। প্রতিবেদনের সুপারিশে আরও বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের সিভিল পিটিশন লিভ টু আপিল নম্বর ২১৪৩/২০১৬ মামলার নির্দেশনা মোতাবেক মেডিকেল টেকনোলজি এবং নার্সিংসংক্রান্ত সব শিক্ষা কার্যক্রম ‘ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট’-এর আওতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক পরিচালিত হবে।
নতুন আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং কোর্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দিতে বলে এবং ৩০ দিনের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে নিবন্ধন করতে বলা হয়। এ ছাড়া কারিগরি শিক্ষা বোর্ডকে এ দুই কোর্সে নতুন করে ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বোর্ড আইন-২০১৮ সংশোধন করতে বলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দায়েরকারী বেকার অ্যান্ড প্রাইভেট সার্ভিসেস মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিন বছরেও সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট বাস্তবায়ন না হওয়া খুবই দুঃখজনক। এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি যে সুপারিশ করেছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করার দাবি জানাচ্ছি।
এই নেতা আরও বলেন, এত দিন কারিগরি শিক্ষা বোর্ড যেভাবে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট তৈরি করেছে, তা সঠিক ছিল না। তাদের অধীনে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নেই। এটা তাদের ব্যবসায়িক উদ্যোগ। কারণ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডর অধীনে যেসব প্রতিষ্ঠান, সেখানে এই দুই কোর্সে ভর্তির ন্যূনতম নিয়মকানুন মানা হয় না। আমরা যারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে কোর্স করছি, তাদের অবশ্যই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করতে হবে এবং পর্দার্থবিদ্যা, জীববিজ্ঞান ও রসায়ন বিষয় থাকতে হবে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড যেভাবে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট তৈরি করছে, তাতে তাদের পক্ষে সঠিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং চিকিৎসার স্বার্থেই এই কোর্স দুটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হওয়া উচিত।
জানা গেছে, বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে সরকারি-বেসরকারি ১১০টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৩০৯টি মেডিকেল টেকনোলজি ও নার্সিং ইনস্টিটিউট রয়েছে।
