রাজধানীর আফতাবনগরের বাসায় আগুনে পুড়ে মারা গেছেন সাংবাদিক মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নুর ছেলে স্বপ্নীল আহমেদ পিয়াস (২৪)। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর ৪টার দিকে ওই বাসায় আগুন লাগে। দগ্ধ পিয়াসকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। আগুনে নান্নু নিজেও আহত হয়েছেন। দুপুরে আফতাবনগরে জানাজা শেষে পিয়াসের লাশ তাদের গ্রামের বাড়ি যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।
নান্নু বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক যুগান্তরের সাবেক অপরাধবিষয়ক প্রধান প্রতিবেদক ছিলেন। বর্তমানে তিনি গ্লোবাল টেলিভিশনের এডিটর (ক্রাইম) হিসেবে কর্মরত। নান্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাত ৪টার দিকে ছেলের চিৎকার শুনে দেখেন পুরো বাসা ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে। তিনি বারান্দায় গিয়ে দেখেন পাশের বারান্দায় (পিয়াসের রুমসংলগ্ন) ছেলের পরিহিত গেঞ্জিতে আগুন জ¦লছে এবং আর সে ‘মা বাঁচাও, বাবা বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছে। তিনি ছেলেকে গেঞ্জি খুলে ফেলে দিতে বলেন। জামা-গেঞ্জি খোলার পরও তার শরীরে দাউ-দাউ করে আগুন জ¦লছিল। পাশের বারান্দা থেকে আমি আর ওর মা সেটা দেখছিলাম। প্রায় ১৫ মিনিট চলে এভাবে।
তিনি আরও বলেন, ‘ছেলের রুমে প্রবেশের জন্য দরজা খোলার চেষ্টা করেও খুলতে পারিনি। দরজায় আলীবাবার ডিজিটাল লক ছিল। আমি ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। প্রতিবেশীরাও কেউ ধোঁয়ার কারণে এগিয়ে আসতে পারেনি। চিৎকার করতে করতে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে পিয়াস। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে যখন আগুন নেভায় ততক্ষণে আর ছেলেকে বাঁচানো যায়নি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পিয়াসকে মৃত ঘোষণা করেন।’
স্বজনরা জানিয়েছেন, পিয়াস একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষে ব্যবসা করছিলেন। প্রোভেন্স লিমিটেড নামে তার একটি প্রতিষ্ঠান আছে। সিসি ক্যামেরাসহ প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আমদানি ও বিক্রি করে থাকে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা রাসেল সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তারা আফতাবনগর ‘বি’ ব্লকের তিন নম্বর সড়কের ৪৪/৪৬ নম্বর বাড়িতে আগুন লাগার খবর পান। তাদের পাঁচটি ইউনিট ১১ তলা বাড়ির ১০ তলা ওই বাসার আগুন নেভায়। বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগুন লাগার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ চক্রবর্তী। তিনি ঘটনাটিকে মর্মান্তিক উল্লেখ করে বলেন, আগুন লাগার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের বাড্ডা অঞ্চলের উপসহকারী পরিচালক নিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘ছেলেটি বারান্দায় না গিয়ে ডাইনিং রুমে গেলে হয়তো বেঁচে যেতেন। ভেতর থেকে কক্ষের দরজা বন্ধ থাকায় আগুনের গোলা বারান্দার দিকে গেছে। আগুনে জানালার কাচ গলে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে নিচে পড়েছে। কক্ষটির এসি, টেবিলে থাকা ল্যাপটপ, সাউন্ড সিস্টেম, আসবাবপত্রসহ মালামাল পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। প্লাগ লাগানো ল্যাপটপ, কিংবা এসির সংযোগস্থল বা কক্ষের বৈদ্যুতিক লাইনে শর্টসার্কিট থেকেও আগুন লাগতে পারে।’
সরেজমিনে ওই বাসায় গিয়ে দেখা গেছে, পিয়াসের কক্ষসহ বাসার প্রতিটি আসবাবপত্র পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। পিয়াসের কক্ষে পোড়ার মতো কোনো কিছু অবশিষ্ট নেই। তার মা শাহিনা হোসেন পল্লবী বলেন, ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত খেয়ে রাত আড়াইটার দিকে বাসায় ফেরেন তারা। রাত ৩টার দিকে পিয়াস তার কাছে গাড়ির চাবি দিয়ে বলেন, ‘মা, আমি ঘুমাতে গেলাম।’ এরপর তারাও ঘুমাতে যান। ভোরে হঠাৎ বিকট শব্দে তাদের (নান্নু-পল্লবী) ঘুম ভেঙে যায়।
পল্লবী আরও বলেন, “আমার পিয়াস চিৎকার করে বলছিল, ‘মা, আগুন লাগছে।’ ওর বাবা তখন বারান্দায় গিয়ে দেখতে বলে।’ একপর্যায়ে পিয়াসের কক্ষের বারান্দাসংলগ্ন বারান্দায় গিয়ে দেখি, গ্রিল ধরে পিয়াস চিৎকার করে বলছে, ‘মা আগুন লাগছে, আমাকে বের করো। আমাকে বাঁচাও। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না। আমি নিজেও আর বাঁচতে চাই না।”
এদিকে অগ্নিদগ্ধ হয়ে নান্নুর ছেলের মৃত্যুর খবরে তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও ক্রাইম রিপোর্টাররা হাসপাতালে ছুটে যান।
সুরতহাল শেষে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় আফতাবনগরের বাসায়। বাড্ডা থানার ওসি পারভেজ ইসলাম জানান, মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নুর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
গতকাল বাদ জোহর আফতাবনগরে পিয়াসের জানাজা হয়। এতে ক্র্যাবের সাবেক সভাপতি আবু সালেহ আকন, সহসভাপতি মোরছালীন বাবলা, সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বিকু এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার আলম অংশ নেন।
ক্র্যাবের শোক : পিয়াসের মৃত্যুতে ক্র্যাব সভাপতি আবুল খায়ের ও সাধারণ সম্পাদক দীপু সারোয়ারসহ কার্যনির্বাহী কমিটি গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ এবং মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে।
