কলেজে বসে ডাকাতির ছক

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২০, ০৩:০১ এএম

যাত্রাবাড়ীতে র‌্যাব পরিচয়ে ডাকাতির পরিকল্পনাটি করা হয় রাজধানীর একটি নামকরা কলেজের ছাত্রাবাসে বসে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন গত ২৮ ডিসেম্বর ভোরেই ‘টার্গেট’ ব্যক্তির বাসার সামনে অবস্থান নেয় চক্রটির সদস্যরা, যারা দীর্ঘদিন ধরেই এভাবে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিককে টার্গেট করে ডাকাতির পর অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবি করে আসছে বলে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে উঠে এসেছে।

পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, এই ডাকাত চক্রের সদস্যরা শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পার্টটাইম চাকরি নেয়। পরে সেখানকার সব তথ্য নিয়ে পরিকল্পিতভাবে ডাকাতি ও অপহরণ করে আসছিল। চক্রের ৭-৮ জনের তথ্যও পেয়েছে সংস্থাটি। তাদের বেশ কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অধ্যয়ন করছে। তারা বেশ কয়েক বছর ধরেই প্রাইভেটকার ভাড়া নিয়ে এ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। যাত্রাবাড়ীতে র‌্যাব পরিচয়ে ডাকাতির শিকার মাহামুদুল হাসানকেও অপহরণের চেষ্টা করেছিল তারা। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকা থেকে গত ১ জানুয়ারি চক্রের দুজনকে গ্রেপ্তারের পর বের হয়ে আসছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আশিক পারভেজ ডাকাতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছে। গ্রেপ্তার অপরজন মেহেদী হাসান রকি রিমান্ডে রয়েছে। মেহেদী রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার একটি কলেজের বাংলা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র। তার বিরুদ্ধে আগেও অপহরণের মামলা হয়েছে। পিবিআইর তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চক্রের অন্যতম নেতা মেহেদী একসময় মাহামুদুল হাসানের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)-এর এসআই আল আমিন শেখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যাত্রাবাড়ীতে র‌্যাব পরিচয়ে ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার আশিক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ৭-৮ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। এদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ডাকাতি, অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবি করে আসছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত বলা যাবে।’  

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর সকালে মাহামুদুল হাসান খিলক্ষেত থেকে যাত্রাবাড়ী যাওয়ার উদ্দেশে অনাবিল গাড়িতে ওঠেন। বাসটি শনির আখড়া ফুটওভার ব্রিজের নিচে এলে র‌্যাবের জ্যাকেট পরিহিত অজ্ঞাতনামা ৩-৪ জন লোক বাসে উঠে নিজেদেরকে র‌্যাব সদস্য পরিচয় দিয়ে পিস্তল ঠেকিয়ে যাত্রীদের ভয় দেখায়। এ সময় মাহামুদুল হাসানকে টেনেহিঁচড়ে নিচে নামায় তারা। তার কাছে থাকা একটি আইফোন ও নগদ ৩ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। পরে তার মুখ চেপে ধরে মারধর করে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত প্রাইভেটকারে ওঠায়। গাড়িতে ওঠানোর পর মাহামুদুল বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করলে এক উবার চালক ও ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবল এবং উপস্থিত জনতা এগিয়ে আসে। তাদের দেখে ডাকাতরা এক্স করলা একটি প্রাইভেটকার ও র‌্যাবের জ্যাকেট ফেলে পালিয়ে যায়।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, মাসখানেক আগে রাজধানীর একটি কলেজের ছাত্রাবাসের কক্ষে বসে এই ডাকাতির পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনামতো ঘটনার দিন সকাল ৮টার দিকে একটি প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলে চক্রের ৭-৮ জন খিলক্ষেত নিকুঞ্জ এলাকায় মাহামুদুলের বাসার সামনে অবস্থান নেয়। ৯টার দিকে মাহামুদুল বাসা থেকে বের হলে তার পিছু নেয় ডাকাত দলের সদস্যরা। তারা আরও জানান, ডাকাতির কাজে ব্যবহারের জন্য চক্রটি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বছর চুক্তিতে প্রাইভেটকার ভাড়া নিত। যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় ব্যবহৃত প্রাইভেটকারটি গত বছর মো. মাকসুদুর রহমান নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে মাসিক ২৯ হাজার টাকা চুক্তিতে ভাড়া নেয় চক্রের সদস্য আলমগীর খান।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রেপ্তার আশিকের স্বীকারোক্তিতে রাজধানীর একটি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের দুই নেতাসহ বেশ কিছু নেতাকর্মীর ডাকাতিতে জড়িত থাকার তথ্য উঠে এসেছে। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়াতে বিস্তারিত তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের পরিচয় বলা যাচ্ছে না। প্রাইভেটকারের ড্রাইভার আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা গেলে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত