সমুদ্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. বেলাল

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২০, ০৩:৩৮ এএম

চারটি নতুন অমেরুদণ্ডী ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীট আবিষ্কার করেছেন. বেলাল হোসেন তিনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক । তার শিক্ষকতা ও গবেষণা-জীবন নিয়ে বলেছেন তৌহিদুল ইসলাম হিমেল

ছোটবেলায় হতে চেয়েছিলেন চিকিৎসক। তবে বড় হয়ে হলেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা অধ্যাপক। ড. বেলাল হোসেনের আরও একটি পরিচয়–তিনি একজন কৃতী গবেষক। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি মৎস্য ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। গবেষক হিসেবে তার অর্জন হলো–তিনিই বাংলাদেশের প্রথম বিজ্ঞানী, যিনি প্রাণিজগতের চারটি নতুন অমেরুদণ্ডী কীট আবিষ্কার করেছেন। ফলে তার সুনাম ছড়িয়েছে সারা বিশ্বে। বাংলাদেশের গর্ব হয়েছেন।

জন্ম তার কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায়। বাবা আবদুস সালাম ছিলেন পেশায় ফরেস্ট অফিসার। দুই ভাই ও এক বোনের সবার বড় বেলাল। গ্রামেই বেড়ে উঠেছেন। ফলে বলতে ভালোবাসেন, ‘আমি গ্রামের ছেলে।’ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে চলে গেলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ বিভাগের ছাত্র তিনি। লেখাপড়ার পাশাপাশি সেখানেই তার গবেষণা-জীবনের শুরু। এরপর মাস্টার্স করে কৃতী ছাত্র হিসেবে ইংল্যান্ডের হাল ইউনিভার্সিটিতে। যোগ দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায়। ২০০৮ সালে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। দুই বছর পর শিক্ষা ছুটিতে চলে যান পিএইচডি করতে। ব্রুনাইয়ের বিখ্যাত দারুস সালাম ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি; অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়াম রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করেছেন। বললেন, ‘২০০২ সাল থেকে আমার গবেষণা-জীবনের সেই যে শুরু, আজও থামিনি।’ ২০১৬ সালে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ‘ন্যাফটাইস বাংলাদেশি’ নামের একটি অমেরুদণ্ডী পলিকীটের নতুন প্রজাতি অনেক কষ্টে ও শ্রমে আবিষ্কার করেছেন। বিদেশে গিয়েও তার প্রাণ গবেষণা চলেছে। ব্রুনাইয়ে থাকার সময় সেই দেশের সাগর উপকূল চষে বেড়িয়েছেন। সেখান থেকে অনেক কষ্টে ‘ভিক্টোরিওপিসা ব্রুনেইয়েনসিস’ নামের আরেকটি অমেরুদণ্ডী পলিকীটের নতুন দুটি প্রজাতি আবিষ্কার করেন। সেগুলো নিয়ে গবেষণাও করছেন ড. বেলাল হোসেন।

২০১৮ সালে এই কৃতী অধ্যাপক নোয়াখালী উপকূলীয় এলাকা থেকে আরও দুটি ‘নিউমেনিয়া নোবিপ্রবিয়া’ ও ‘অ্যারেনুরাস স্মিটি’ নামের নতুন অমেরুদণ্ডী কীট আবিষ্কার করেন।  প্রথমটির নাম দিয়েছেন তার নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) নামে। এভাবেই কীটের জীবনে এক বিজ্ঞানী তার বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচিয়ে রেখেছেন। দ্বিতীয় কীটটির নাম দিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের বিশ্ববিখ্যাত একারোলজিস্ট হ্যারি স্মিথের নামে। এগুলো সম্পর্কে বললেন, “আমার এ আবিষ্কার দুটি প্রাণিজগতের আর্থোপোডা পর্বের একারিয়া বর্গের; খুবই ছোট, দেখতে কিছুটা মাকড়সার মতো। ‘মাইটস’ নামে তারা পরিচিত। আকারে দুটি কীটই দুই থেকে তিন মিলিমিটার মাত্র। একেবারে মাইক্রোসকোপ দিয়ে দেখতে হয়। বর্ণ হালকা লাল ও হলুদের মিশেল। দুটি শুঁড় ছাড়া চার জোড়া সন্তরণ পা থাকে তাদের। সাধারণত পুকুর, নদী বা খালের পানির ওপরের স্তরে ভাসমান উদ্ভিদের সঙ্গে ঝুলে ভেসে বেঁচে থাকে। খাবার হিসেবে উদ্ভিদকণা খায়। তবে লার্ভা অবস্থায় অন্য জলজ কীটের দেহে পরজীবী হিসেবে বাস করে, তাদের কাছ থেকে খাবার জোগাড় করে। একেবারে ছোট এই প্রাণগুলোই জীবজগতের খাদ্যচক্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।’

তার এই দুটি প্রাণের আবিষ্কারে সহ-গবেষক ছিলেন মন্টেনিগ্রোর বিখ্যাত একারোলজিস্ট ড. ভ্লাদিমির, ভারতের ক্রিসেন্ট ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অধ্যাপক তাপস চ্যাটার্জি, পোল্যান্ডের শেচিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আন্দ্রজেল জয়েল ও তার ছাত্র সাইফুল ইসলাম। চার দেশের পাঁচ গবেষকের একত্রে টানা গবেষণায় দুটি প্রজাতি আবিষ্কার করা গেছে। পরে ফলাফলের জন্য তারা তাদের নমুনা মধ্য ইউরোপের মন্টেনিগ্রোতে গবেষক ভ্লাদিমিরের কাছে পাঠান। নমুনাগুলো চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করেন ও বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি দেন তিনি। এরপর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ডের আন্তর্জাতিক জার্নাল বায়োটাক্সা.অর্গ-এ পাঠান তারা। পরের বছরে ১৪ মে ‘First recoreds water nuters from Bangladesh (Acari, Hydrachnidia) with the description of two new species’ শিরোনামে গবেষণাটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। সেই দিনই সারা বিশ্বে স্বীকৃত ও নামকরা ডাটাবেজ zoobank (জুব্যাংক)-এ সেগুলো যুক্ত হয়। ফলে প্রজাতি দুটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। তিনি জানিয়েছেন, ‘স্থলজ মাইটস’ নামের প্রাণ যেমন–ছারপোকা, মাকড়সা ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা হলেও জলজ মাইটস নিয়ে তাদের আগে কোনো গবেষণাই হয়নি। ড. বেলাল হোসেন বললেন, ‘আমাদের দেশের উপকূল সমুদ্র অঞ্চল দিনের পর দিন গবেষণার জন্য ঘুরে বেড়ানো, কাজের সূত্রে জানি এই দেশের এই অঞ্চল খুবই জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। তবে সেগুলো নিয়ে কোনো গবেষকই গবেষকরা তেমন করেন না। সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেরও উদ্যোগ নেই। ফলে গবেষণার অপ্রতুলতায় বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূল ভাগসহ অন্যান্য জায়গার জীববৈচিত্র্যের পূর্ণ তালিকা তৈরি করা যায়নি।’

তবে দিলেন খুশির খবর–‘‘এখন থেকে আমার বিশ্ববিদ্যালয় এ কাজে এগিয়ে আসবে বলে আশাবাদী। আমাদের আবিষ্কার দুটির মধ্যে নিউমেনিয়া নোবিপ্রবিয়ার নাম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্ষিপ্ত ‘নোবিপ্রবি’র সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছি।’’ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য নিয়ে ব্যাপক গবেষণা সম্ভব হবে বলে সমুদ্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক জানিয়েছেন। নতুন পাওয়া এই কীটগুলো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? তার উত্তরটি হলো, ‘বাস্তুসংস্থানে যে খাদ্য শৃঙ্খল আছে, তাতে নানা স্তরের খাদক আছে। প্রতিটি স্তরের খাদক অন্য স্তরের খাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে আছে। যে কীটগুলো আবিষ্কার করছি এগুলো প্রথম স্তরের খাদক। তাদের খেয়েই খাদ্য শৃঙ্খল শুরু হয়।’ এখন পলিকীট নিয়ে গবেষণা করছেন এই অধ্যাপক। বিজ্ঞানের ভাষায় অ্যানিলিডা পর্বের ক্লাস এবং মাইটসের ভেতরের পার্থক্য মানে ডিএনএ নিয়ে গবেষণা করছেন। ফলে নতুন কীট আবিষ্কার করতে পারেন। ইমারজেন্ট পলুটেন্ট অ্যান্টিবায়োটিক, হেভি মেটাল ইত্যাদি নিয়েও গবেষণা করছেন। খুব তাড়াতাড়িই ফলাফল পাবেন বলে আশাবাদী। গবেষণা কর্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা যথেষ্ট সাহায্য করে? বললেন, ‘আমার বিভাগ থেকে কোনো ফান্ড বা অনুদান পাইনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সুবিধা ব্যবহার করেছি। পুরো গবেষণার টাকা নিজের পকেট থেকে দিয়েছি। এর আগে যে দুটি আবিষ্কার করেছি, সেগুলোও বিদেশের গবেষণা ফান্ড–অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়াম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের। এ ধরনের গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুদান দেওয়ার নিয়ম নেই। যারা এ ধরনের গবেষণা করেন, সাধারণত নিজস্ব ফান্ডেই করেন।’

নিজেকে আপাদমস্তক শিক্ষক বলতে ভালোবাসেন। এই পেশা বেছে নেওয়ার কারণ? ‘আমার শিক্ষকতার প্রতি ছোটবেলা থেকে দুর্বলতা, টান আছে। যখন ইংল্যান্ডে পড়তে গিয়েছিলাম, সেখানে থাকা অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো দেখেছি। আমার সেই দেশের নাগরিকত্ব আছে। তারপরও এখানে চলে এসেছি। কারণ বাংলাদেশে থেকে নিজে শিখব ও ছাত্রছাত্রীদের শেখাব। সব সময় চেয়েছি, এমন এক পেশা হবে আমার যেখানে সৎ থাকা যাবে, শেখা ও শেখানো যাবে।’ তবে এখন তার মাঝে মাঝে হতাশ লাগে।

ড. বেলাল হোসেন বললেন, ‘যখন দেখি বাংলাদেশের কোনো ক্ষেত্রেই কোনো কর্মপরিবেশ নেই, হতাশ লাগে। তারপরও কাজ ছাড়া মানুষের তো কিছু নেই। আমার সুবিধা হলো–নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের কাছেই বঙ্গোপসাগর। তাই গবেষণা কাজে খুব সুবিধা হয় পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের। আমার তো বটেই। অন্যান্য দেশ ও আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনা হলো আগে বিভিন্ন দেশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা বাংলাদেশ থেকে শিক্ষক নিতে আসতেন। কিন্তু এখন আমরা তো তাদের থেকে অনেক পিছিয়ে গিয়েছি। ফলে সেই সুবিধা নেই।’তেমন অবসর পান না। পেলে পত্রিকার খবর পড়েন। বৈজ্ঞানিক আর্টিকেল পড়েন। গবেষণার বিষয় ও বস্তু নিয়ে ভাবেন। যেকোনো আবিষ্কার ও অর্জনের জন্য আবেগ ও নিষ্ঠা লাগে–বলে জানালেন, ‘এ দুটি গুণ ও স্বভাব আমার আছে। সততা আমার পাথেয়।’

নতুন যারা গবেষণা করতে চান, তাদের জন্য বাংলাদেশের এই অধ্যাপকের অনুরোধ, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান বাড়ানোর বিরাট ক্ষেত্র, নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য সেরা। ছাত্রছাত্রীরা যদি প্রথম বর্ষ থেকেই গবেষণামুখী হন, তাহলে ভবিষ্যতে এগিয়ে যাবেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত