সবকিছুর আগে ভালো একজন কোচ চাই: ফাতেমা মুজিব

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২০, ০৬:৫৩ পিএম

বাংলাদেশে ফেন্সিং খেলার প্রচলনের কথা কজনই বা জানতেন। অপ্রচলিত সে খেলাতেই দক্ষিণ এশীয় গেমসে (এসএ গেমস) মেয়েদের সেবার একক ইভেন্টে স্বর্ণপদক জয় করেছেন ফাতেমা মুজিব। হয়ে উঠেছেন খেলাটার বিজ্ঞাপন।

মজার ব্যাপার নেপালের কাঠমান্ডুতে হয়ে যাওয়া আসরটিই ছিল বিদেশে তার প্রথম কোনো আসর। ফেন্সিংও এসএ গেমসে অন্তর্ভুক্ত হয় এই প্রথম। ফেন্সিং ক্যারিয়ারের চমকপ্রদ সব গল্পের বাইরে ২০ বছরের ফাতেমার জীবনের গল্পটাও অনুপ্রেরণা জাগানোর।

দেশ রূপান্তরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যে সব গল্প অকপটে বলেছেন ফাতেমা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- তোফায়েল আহমেদ

ফেন্সিংয়ের মতো অপ্রচলিত একটা খেলায় এসএ গেমসে স্বর্ণজয় করেছেন। ভাবতে কেমন লাগছে?

ফাতেমা: অবশ্যই ভালো লাগার। স্বর্ণজয়ের পেছনে তো আমার ভাইয়েরই (সাদ্দাম মুজিব) অবদান বেশি। সেটা আগেও সবাইকে বলেছি। ছোটবেলা থেকে এক পোশাক দিয়ে আমরা দুজনে প্র্যাকটিস করেছি। এভাবেই আজ এ পর্যন্ত আসা। আর এই সাফল্যের পেছনে আমার বিশ্বাসের কথা বলব। নেপালে যাদের সঙ্গে খেলছি, তাদের নিজের থেকে উঁচুই মনে করেছি। তবে আমি পারব এই বিশ্বাস রেখেছিলাম। ভয় পাইনি একটুও।

এমনিতে দেশ ছাড়ার আগে মনে স্বর্ণজয়ের স্বপ্ন ছিল?

ফাতেমা: যখন বিমানে উঠি, তখনো আমার এই ধারণা ছিল না যে নেপালে কতটা কী করতে পারব। আর এটাই ছিল বিদেশে আমার প্রথম গেম। তবে যাওয়ার আগে আমাদের হুদা স্যার বলেছিলেন, ‘তোমার প্রথম গেম। চেষ্টা করে দেখ বড় কিছু করতে পারো কিনা।’তো সেটা আমি মাথায় রেখেছিলাম। যতগুলো ম্যাচ খেলেছি আমি, সবগুলোই খুব কঠিন ছিল। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, আমি সব ধাপ ভালোভাবে পাড়ি দিতে পেরেছি।

image

বাংলাদেশে যে ফেন্সিং খেলা হয় আপনার সাফল্যের আগে অনেকেই তো তা জানত না। বলতে গেলে খেলাটার আলো জ্বালালেন আপনি। আলাদা ভালো লাগা কাজ করছে নিশ্চয়ই?

ফাতেমা: ঠিকই বলেছেন। আমি যখন বন্ধুদের বলতাম ফেন্সিং প্র্যাকটিস করি, ওদের তখন নিয়ে এসে দেখাতে হতো খেলাটা কী। এখন খেলাটা পরিচিত পাচ্ছে দেখে অবশ্যই ভালো লাগছে। আমাদের খেলাটা তরবারির খেলা হলেও এটা অনেক সুন্দর খেলা বলে আমি করি। তবে আমাদের খেলাটার প্রসার হওয়া জরুরি।

আপনার ফেন্সিং শুরুর গল্পটা জানতে চাই...।

ফাতেমা: যেটা শুরুতে বললাম, ভাইয়ার হাত ধরে আমার শুরু। আমরা তিন ভাই, দুই বোন। গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জ হলেও ঢাকাতেই আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা। আমার মা মারা যান আমাকে দুই বছর রেখে। আমি তখন তেমন কিছু বুঝতাম না। আমার সাত বছর বয়সের সময় বড় আপুর বিয়ে হলো। আমাকে তার সঙ্গে নিয়ে যায়। যেখানে পড়াশোনাও শুরু করি। আপুরা এর মধ্যে ঢাকায় চলে এলে আমি আবার বাবার সঙ্গে (ঢাকায়) থাকা শুরু করি। সারাক্ষণ তখন ছোট ভাইয়ার সঙ্গেই ঘুরতাম। ফুটবল, ফেন্সিং খেলে সময় কাটাতাম।

ভাইয়া আমাকে সাইকেলের পেছনে বসিয়ে মিরপুর ইনডোরে নিয়ে আসতেন। একজনের ইকুইপমেন্ট দুজনে ভাগ করে নিতাম। ও যখন হিট করত আমি জ্যাকেট পরতাম। আমি হিট করলে ও শরীরে জ্যাকেট লাগাত। এক গ্লাভস দুজনে শেয়ার করে পরতাম। পরতে পরতে ছিঁড়েও যেত। সেগুলো মুচির দোকানে গিয়ে সেলাই করে পরতাম। এ রকম গেছে আমাদের দিন-কাল। ২০১৩ সালের মার্চ থেকে আমার ফেন্সিং ক্যারিয়ার শুরু। ২০১৪-১৫ দুই বছর আমি আর্মিতে ছিলাম। এরপর ভাইয়া আমাকে নৌবাহিনীতে নিয়ে আসে। ভাইয়াও নৌবাহিনীতে আছেন। এখন পর্যন্ত চুক্তি ভিত্তিতে আমি নৌবাহিনীতে। নৌবাহিনী আমার জন্য গুডলাকও বলতে পারেন। এসএ গেমসে স্বর্ণ জয়ে তাদের অবদান অনেক।

image

এই পর্যায়ে এসে পেছন ফেরে তাকালে ফেলে আসা শৈশব-কৈশোর নিয়ে কেমন অনুভূতি হয়?

ফাতেমা: ওটা আসলে অনেক কষ্টের ছিল। মার কথা তো আমার মনে থাকার কথা না স্বাভাবিকভাবে। দেখা গেছে যে ফুপুরা ছিলেন। খালারা ছিলেন। ওনারা অনেক সহযোগিতা করছেন। বাবা রাজনীতি নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতেন। বাবা মুক্তিযোদ্ধা। তবে তিনি যে ভাতা পান, সেটা তিনি রাজনীতির পেছনেই দিয়ে দিতেন। সে নিয়ে অবশ্য আমাদের কোনো অভিযোগ কখনো ছিল না। কারণ বাবা যত দিন আছেন, তত দিন আমাদের ছায়া আছে। মা মারা যাওয়ার পর বাবা আর বিয়ে করেননি আমাদের কথা ভেবেই। তা ছাড়া বড় আপার পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি আমাদের রান্না করে খাইয়েছেন। এখন বাবা সেভাবে চলতে-ফিরতে পারেন না। তার হার্টে দুটি ব্লক ধরা পড়েছে। মেডিসিনের ওপর চলছে।

ফেন্সিং নিয়ে আপনি কী স্বপ্ন দেখেন?

ফাতেমা: আমি যখন ফেন্সিংয়ে ঢুকেছি, বড় আশা নিয়েই ঢুকেছি। প্রথমবার খেলতে এসেই আমি আনসারের বিপক্ষে খেলে সিলভার পেয়েছিলাম। ধীরে ধীরে আমার পদক বাড়তে থাকে। এখন আমার ইভেন্টে- টিম এবং ব্যক্তিগত দুই বিভাগেই স্বর্ণ থাকে। তবে স্বপ্নপূরণ সম্ভব হবে তখনই যখন আমাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হবে।

চাহিদাগুলোর কথা যদি বিস্তারিত বলতেন...

ফাতেমা: প্রথমত বলব, আমার একজন কোচের দরকার। আমাদের একজন মাত্র কোচ- আবু জাহেদ চৌধুরী। একজন কোচ তো তিনটি ইভেন্ট সামলাতে পারেন না। দেখা যায় যে অনেক সময় আমরা একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থায় চলে যাই। তবে আমার যে সাফল্য, এর পেছনে আবু জাহেদ চৌধুরী স্যারের অনেক অবদান। ছয় বছর তার কাছে আমি প্র্যাকটিস করেছি। দ্বিতীয়ত বলব, আমাদের নিজস্ব একটা খেলার জায়গা দরকার। আমরা নিয়মিত কখনো মাঠ পাই না। দেখা যায়, অন্য খেলার দল এসে ভিড়ে যায়। আমাদের লাইট দেওয়া হয় না। অন্ধকারে এসেও প্র্যাকটিস করি। কখনো কখনো পিচের ওপরও প্র্যাকটিস করতে পারি না। ফ্লোরে প্র্যাকটিস করা লাগে। খেলা নিয়মিত হলে খেলোয়াড়রা খেলা নিয়েই থাকতে পারেন। এগুলোই চাওয়া। বছরে শুরুতে আর শেষে একটা করে ঘরোয়া প্রতিযোগিতা হলে সেটা আমাদের জন্য মোটেও ভালো নয়। দেখা যায়, প্র্যাকটিস না করতে না করতে আমাদের পা জ্যাম হয়ে যায়। হঠাৎ কোনো খেলা পড়লে দুই-তিন মাস আগে থেকে ট্রেনিং শুরু হয়। আমাদের যদি নিয়মিত প্র্যাকটিস হতো, তাহলে ফিটনেসও ভালো থাকত।

image

শেষ প্রশ্ন। সাফে স্বর্ণ পদক পেলেন। নিজেকে নিশ্চয়ই আরো বড় মঞ্চে দেখতে চান?

ফাতেমা: বড় বড় গেমস গুলাতে অংশ নিতে চাই। কিন্তু সেটার আগে আমি ভালো একটা কোচ চাই। কারণ কোচ ছাড়া কোনো কিছু সম্ভব না। যদি ভালো একজন কোচ থাকে তবে তিনিই আমাকে গড়ে তুলতে পারবেন। আমার নিয়মিত একজন কোচ থাকলে ইনশা আল্লাহ আমি আরো ভালো করতে পারব সামনে। সেটা বিদেশি কোচ হলে আরো বেশি ভালো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত