জনগণের সালতামামি ও নববর্ষের উপহার

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২০, ১০:৫১ পিএম

২০১৯ সাল কেমন গেল আর কেমন যাবে ২০২০ সাল? বছরের শুরুতে এটা একটি সাধারণ জিজ্ঞাসা। একটির উত্তর পাওয়া যাবে অতীতের দৃষ্টান্ত, তথ্য আর উপাত্ত থেকে, অন্যটির উত্তর খুঁজতে হবে অতীতের ঘটনার বিশ্লেষণ থেকে। কোনো কিছুর তেমন পার্থক্য নেই তা বুঝতে হলে বাংলা প্রবাদ ‘উনিশ-বিশ’-এর কথা বলা যায়। পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও ২০১৯ সাল যেমন গেল ২০২০ সালও কি তেমনি যাবে? ভালো হবে নাকি আরও খারাপের অপেক্ষায় দেশ? নতুন বছরের আগমনে এই আশা-নিরাশার দোলাচলের যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ আছে।

২০১৯ সালটা কেমন গেল?

এক কথায় বলতে গেলে বছরব্যাপী ব্যাংকগুলোতে অর্থের সংকট, রাজনীতিতে চমক, নৈতিকতার অবক্ষয় এবং সমাজে সর্বব্যাপক ভয় নিয়েই ২০১৯ সাল কাটল। সরকারের উন্নয়নের বাগাড়ম্বর, দেশটাকে ইউরোপ-আমেরিকার মতো বানিয়ে ফেলার ঘোষণা, ওপর থেকে দেখলে লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো দেখতে পাওয়া যায় ঢাকা শহর এ রকম অনেক গল্প আমরা শুনেছি। রপ্তানি বাড়ছে, ২০১৮ সালে রপ্তানি হয়েছে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি। জিডিপি ২৫ লাখ কোটি টাকার বেশি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৫। আইএমএফের হিসাবে নতুন বছরে ৯টি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের বেশি হবে। বাংলাদেশ হচ্ছে এ ক্ষেত্রে তৃতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের সামনে আছে ডোমিনিকান রিপাবলিক এবং দক্ষিণ সুদান। যুদ্ধ ও দাঙ্গা-বিধ্বস্ত দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির হার বেশি এ কথা বললে কি অতিরঞ্জন হবে? অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হচ্ছে না। ‘জবলেস গ্রোথ’ বা ‘কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি’র ফাঁদে কি আটকে গেল বাংলাদেশ?

মাথাপিছু আয় এখন ১৯০৯ ডলার। বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। কিন্তু কাগজের হিসাব আর সাধারণ মানুষের পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসাব তো মেলে না! মাথাপিছু আয় ১৯০৯ ডলার হলে পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারে বার্ষিক আয় দাঁড়ায় আট লাখ টাকার বেশি অর্থাৎ মাসে পারিবারিক আয় ৬৬ হাজার টাকার বেশি। দেশের শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ৩৫ লাখ। তাদের মধ্যে কোন শ্রমিক বা কৃষক পরিবারের এই পরিমাণ মাসিক আয় আছে, তা কি বলতে পারবেন কেউ? গার্মেন্টস শ্রমিকদের মাসিক মজুরি আট হাজার টাকা, কৃষিশ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৪০০ টাকা, মাসে ২০-২৫ দিন কাজ পেলে তা তো ১০ হাজার টাকার বেশি হয় না। পরিবহন, রি-রোলিং, ট্যানারি কোনো খাতেই শ্রমিকদের মাসে ২০ হাজার টাকার বেশি মজুরি নেই। চা-শ্রমিকদের মজুরি দিনে ১০২ টাকার সঙ্গে রেশন এবং অন্যান্য বিষয় যুক্ত করলে তা ছয় হাজার টাকার বেশি হবে না। শ্রমিকদের মজুরির বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর সবচেয়ে কম মজুরির শ্রমিকের দেশ। তাহলে সরকারি হিসাবের এই মাথাপিছু আয় কার পকেটে যায়? যাচ্ছে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের পকেটে, আর এ কারণেই বাড়ছে বৈষম্য। বছরে গড়ে পাঁচ হাজার নতুন কোটিপতি সৃষ্টি আর কয়েকশ ধনকুবের নিয়ে বাংলাদেশ স্থান পেয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতিতে ধনী হওয়া দেশের শীর্ষে। বিপুল শ্রমশক্তি আর কর্মসংস্থানের সুযোগের স্বল্পতাকে কাজে লাগিয়ে কম মজুরিতে কাজ করানোর সুবিধা নিচ্ছেন শিল্পপতিরা।

অন্যদিকে কৃষি উৎপাদন আর কৃষকের আহাজারি দুটিই বাড়ছে দ্রুতগতিতে। ধান, পাট, আলু এই তিন প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারী কৃষকের দুর্দশা বাড়ছেই। সরকার নির্ধারিত ধানের মূল্য ১০৪০ টাকা মণ অথচ কৃষক ধান বিক্রি করছেন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। সাড়ে তিন কোটি টনের বেশি ধান উৎপাদিত হচ্ছে প্রতি বছর। চালের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ টাকা কেজি। কিন্তু সাধারণ মানের চাল ৪৫ টাকার কমে পাওয়া যায় কি? সারা বছরে প্রায় দুই কোটি টন চাল বিক্রি হয় বাজারে। কৃষকের ধান বিক্রি আর ভোক্তার চাল কেনা দুই ক্ষেত্রেই লোকসান। আমন, আউশ ও বোরো এই তিন মৌসুমে ধান বিক্রি করতে গিয়ে কৃষকের লোকসান প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। আর বেশি দামে চাল কিনতে ভোক্তার বাড়তি খরচ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। আলু উৎপাদন হয়েছিল প্রায় এক কোটি তিন লাখ টন। বাজারে আলু কখনো প্রতি কেজি ১৫ টাকার নিচে বিক্রি হয়েছে কি? আর কৃষক কি মৌসুমে ছয় টাকার বেশি দাম পেয়েছেন? পাট ছিল সোনালি আঁশ কিন্তু তা যেন এখন কৃষকের গলায় ফাঁস আর পাটকল শ্রমিকদের দুঃখের চিত্র হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ২২টি জুট এবং ৩টি নন-জুট কারখানায় অনশনরত হাজার হাজার শ্রমিক তাদের জীবন দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশা কত গভীর? সবজিচাষি, ফুলচাষি, মাছচাষি কিংবা হাঁস-মুরগি-গরু-ছাগল পালনকারীদের বঞ্চনার চিত্র ভিন্ন নয়। মৌসুমে ১৫ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রি আর মৌসুম শেষে ২৫০ টাকায় পেঁয়াজ কেনার ঘটনা ভুলে যাওয়ার মতো নয়। কিন্তু এই কেনাবেচায় লাভ কার ক্ষতি কার? কৃষি এখন মুনাফা শিকারের বড় ক্ষেত্র এবং কৃষক অসহায় শিকারে পরিণত হয়েছে। ২০১৯ সালে জনগণ এটা দেখেছে বেদনায় এবং ক্ষোভে।

জনগণের আমানত আর ভবিষ্যৎ দুটোই হুমকিতে ছিল ২০১৯ সালে। ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ সরকারের নির্ধারণ করা সীমা ছাড়িয়েছে। সারা বছরে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার কথা ছিল ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা কিন্তু সরকার গত পাঁচ মাসেই নিয়ে ফেলেছে ৪৭ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। বাকি সাত মাস কীভাবে চলবে তাহলে? সরকারের আয়ের উৎস দুটি। একটি হলো রাজস্ব আয় এবং অন্যটি রপ্তানি আয়। এ দুই ক্ষেত্রেই সরকারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। কিন্তু সরকারের ব্যয় অনেক বেড়েছে, ফলে ঋণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু ভ্যাটের আওতা বেড়েছে, সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বেড়েছে, তাহলে আয় বাড়ল না কেন? কারণ সাধারণ মানুষ পরোক্ষ কর দিলেও ধনীরা কর দিচ্ছেন না। বরং ঋণ নিয়ে সময়মতো শোধ না করায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে। নতুন দায়িত্ব পেয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়বে না। কিন্তু জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। তা এখন ১০ দশমিক ০৫ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এসব তো গেল অর্থনীতির সংকটের চিত্র। এর ওপর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো শেয়ারবাজার এখন নিঃস্ব ও হাহাকারের বাজারে পরিণত হয়েছে। ২০১০ সালের পর সবচেয়ে খারাপ বছর ছিল ২০১৯ সাল। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সূচক এক বছরে ১,০০০ পয়েন্ট নিচে নেমেছে। দৈনিক লেনদেন প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে। দিনে গড়ে ৩১৯ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। গড়ে দিনে ২০০ কোটি টাকার মতো কমে গিয়েছে বলে এ খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

এসব তো গেল দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার চিত্র। এর পাশাপাশি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধঃপতন তো ভয়াবহ। নারী-শিশু নির্যাতন, লাঞ্ছনার ক্রমবর্ধমান চিত্র আর শাসকদের দায়হীনতা দুটো একই সঙ্গে বেড়েছে। সরকার আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জরিপ নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে কিন্তু সংখ্যার সামান্য হেরফের ছাড়া এর সত্যতা সবাই মানবেন। ২০১৯ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে আসক বলেছে, এ বছর ৩৮৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছেন ১৪ জন। শিশু নিহত হয়েছে ৪৮৭ জন, গুম ও নিখোঁজের শিকার হয়েছেন ১৩ জন। ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৪১৩ জন। ২০১৮ সালে ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৭১৩টি। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছেন ৪৩ জন বাংলাদেশি, ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪ জন। এসব সংখ্যার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং নৈতিক অধঃপতনের চিত্র ফুটে উঠেছে। পাশাপাশি রাজনীতিতেও একটা নীতিহীনতার নজির স্থাপিত হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন করে আর ২০১৯ সালব্যাপী তার পক্ষে সাফাই গেয়ে সরকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবনমনের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

একদিকে উন্নয়নের সূচকের বৃদ্ধি, অন্যদিকে মানবিক মূল্যবোধের অবনতি নিয়ে ২০১৯ সাল তো একরকম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে গেল। কিন্তু যে পদচিহ্ন রেখে গেল তা কিন্তু আশঙ্কার। বিগত বছরের কৃষি, শিল্প ও ব্যাংক খাতের সংকটের সঙ্গে নতুন বছরের শুরুতেই বিদ্যুৎ নিয়ে নতুন ঘোষণা জনসাধারণের মনে ব্যয় বৃদ্ধির আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য গণশুনানিতে জানতে চাওয়া হয়েছিল কোনো কোম্পানি মুনাফা করলে সে কি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে পারে? বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কর্তাব্যক্তিরা এ প্রশ্নের যথাযথ উত্তর না দিলেও সবাই জানে যে যথাসময়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্ত আসবে। শুধু তা-ই নয়, মন্ত্রিসভার সভা শেষে ঘোষণা এসেছে যে, এখন থেকে বছরে একাধিকবার গ্যাস, বিদ্যুৎসহ জ্বালানির দাম বাড়ানো যাবে। ২০১৯ সাল জুড়ে যে মানুষ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আগুনে জ্বলেছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর নতুন ঘোষণাটি কি তারা নববর্ষের উপহার হিসেবে পেল?

লেখক

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

rratan.spb@gmail. com

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত