কোরআন তিলাওয়াতে অশ্রুসিক্ত হতেন মহানবী (সা.)

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২০, ১১:২১ পিএম

কোরআনের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর সম্পর্ক গভীর। তিনি কোরআন তিলাওয়াত করতেন। অন্যের তিলাওয়াত শুনতেন। আবার অনেক সময় নিজে তেলওয়াত করে অন্যদের শোনাতেন। তিলাওয়াতের সময় তিনি অশ্রুসিক্ত হতেন। গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে যেতেন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আপনি সুবিন্যস্ত ও স্পষ্টভাবে কোরআন আবৃত্তি করুন।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত : ৪)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও অন্যান্য সাহাবি ও তাবেয়ি মুফাসসিররা বলেছেন, তারতিল মানে কোরআনকে ধীরে ধীরে, শান্তভাবে, স্পষ্ট করে ও টেনে টেনে পড়া। যেন তা বোঝা ও তার অর্থ চিন্তা করা সহজ হয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৪/৪৩৫-৪৩৬)

মহানবী (সা.) এভাবেই কোরআন তিলাওয়াত করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) কোরআন তিলাওয়াত করলে ধীরে ও টেনে তিলাওয়াত করতেন, ফলে সুরাটি যতটুকু লম্বা তার চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘ হয়ে যেত।’ (মুসলিম, হাদিস : ৭৩৩)

মহানবী (সা.) এর কোরআন তিলাওয়াত

আনাস (রা.) মহানবী (সা.)-এর তিলাওয়াতের পদ্ধতি সম্পর্কে বলেন, তার কিরাত ছিল ধীর ও দীর্ঘায়ত।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯২৫) উম্মে সালামাহ (রা.) রাসুল (সা.)-এর কিরাত পদ্ধতি সম্পর্কে বলেন, তিনি প্রত্যেক আয়াতে থামতেন। (একসঙ্গে কখনো দুই আয়াত তিলাওয়াত করতেন না।) (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৬/৩০২)

ইমাম হাফস (রহ.)-কে রাসুল (সা.)-এর কিরাত পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘তোমরা তার মতো তিলাওয়াত করতে পারবে না।’ প্রশ্নকারীরা তবু একটু তিলাওয়াত করতে অনুরোধ করেন। তখন তিনি খুব ধীরে ধীরে তিলাওয়াত করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৬/২৮৮, মাজমাউয যাওয়াইদ : ২/১০৮)

নামাজে দীর্ঘক্ষণ তিলাওয়াত করতেন

হুজাইফা (রা.) বলেন, ‘এক রাতে আমি (তাহাজ্জুদের নামাজে) নবী (সা.)-এর সঙ্গে নামাজে দাঁড়ালাম। তিনি সুরা বাকারাহ শুরু করলেন। আমি ভাবলাম তিনি হয়তো ১০০ আয়াত পাঠ করে রুকুতে যাবেন। কিন্তু তিনি ১০০ আয়াত পার হয়ে গেলেন। আমি ভাবলাম তিনি হয়তো এই সুরা শেষ করে রুকু করবেন। কিন্তু তিনি সুরা নিসা শুরু করে পুরোপুরি পাঠ করলেন। এরপর তিনি সুরা আলে ইমরান শুরু করে শেষ করলেন। তিনি ধীরে ধীরে টেনে টেনে তিলাওয়াত করলেন। যখন তাসবিহের উল্লেখ আছে এমন আয়াত পড়ার সময় তিনি তাসবিহ পাঠ করছিলেন। যখন কোনো প্রার্থনার উল্লেখ আছে এমন কোনো আয়াত পাঠ করছিলেন, তখন তিনি প্রার্থনা করছিলেন। আবার আশ্রয় চাওয়ার উল্লেখ আছে এমন আয়াত আসলে তিনি আশ্রয় প্রার্থনা করলেন ...।’ (মুসলিম, হাদিস : ৭৭২) ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রমজানের প্রতি রাতেই জিবরিল (আ.) তার সঙ্গে দেখা করতেন এবং তারা পরস্পর কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। (বুখারি, হাদিস : ৬)

সাহাবাদের তিলাওয়াত শুনে কাঁদতেন তিনি

মহানবী (সা.) সাহাবাদের মুখে তিলাওয়াত শুনতেন। তখন তিনি অশ্রুসিক্ত হতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, একদিন নবী (সা.) আমাকে বললেন, ‘তুমি আমাকে তিলাওয়াত করে শোনাও।’ বললাম, আমি আপনাকে তিলাওয়াত করে শোনাব অথচ আপনার ওপরই এটি অবতীর্ণ হয়েছে!? তিনি বললেন, ‘আমি অন্যের তিলাওয়াত শুনতে পছন্দ করি’। অতঃপর আমি তাকে সুরা নিসা পড়ে শোনাতে লাগলাম। যখন আমি ‘ফাকাইফা ইজা জি’না বিকা... (অর্থ অতএব কেমন হবে যখন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং তোমাকে উপস্থিত করব তাদের ওপর সাক্ষীরূপে? (আয়াত : ৪১)-এ পৌঁছলাম, তিনি বললেন, ব্যস, যথেষ্ট হয়েছে। তখন আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার চোখ থেকে অঝোর ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে।’ (বুখারি, হাদিস : ৫০৫০; মুসলিম, হাদিস : ১৯০৩)

কল্পনাশক্তি আল্লাহর বড় নেয়ামত। কোরআনে কারিমের আলো পেতে হলে, উপকৃত হতে হলে কোরআনের আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করা দরকার। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘এক কল্যাণময় গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি। যাতে মানুষ তার আয়াতগুলো অনুধাবন করে এবং বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা সাদ, আয়াত : ২৯)

আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘তাহলে কি তারা কোরআন নিয়ে গভীর করে ভাবে না? নাকি তাদের হৃদয় তালাবদ্ধ?’ (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত : ২৪)

মাঝেমধ্যে কোরআনের তিলাওয়াত শোনা উপকারী। সৌদি আরবের ইমামরা আজাব-জাহান্নাম-কেয়ামত প্রভৃতি আয়াত এলে কম্পিত সুরে বেশ দরদ-ব্যথা নিয়ে তিলাওয়াত করেন আর তাদের চোখও অশ্রুসিক্ত হয়। আমরাও তাদের তিলাওয়াত শুনে দুই ফোঁটা তপ্ত অশ্রু ঝরালে আল্লাহর দরবারে অবশ্যই কবুল হবে।

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মুমিন তো তারাই যাদের হৃদয় কম্পিত হয়, যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয় এবং যখন তাদের কাছে তার আয়াত পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ইমান বৃদ্ধি করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপরই নির্ভর করে। (সুরা আনফাল, আয়াত : ০২)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত