সরকারের কার্যকর উদ্যোগের অভাবে ফের বড় পতনে পড়েছে পুঁজিবাজার। বিদেশিদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিক্রিচাপে গতকাল রবিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ৭৬ শতাংশ শেয়ারের দাম কমেছে। এতে এক দিনে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স হারিয়েছে ৫৯ পয়েন্ট। সূচকটি নেমেছে ৪৪০০ পয়েন্টে, যা সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ। দরপতনের সঙ্গে সঙ্গে লেনদেন পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে।
এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর প্রায় ৮০ পয়েন্ট হারায় ডিএসইর প্রধান সূচক। ২০১৯ সালে সূচকটি ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট হারিয়েছে। আর ২০১৮ সালে সূচকের পতন হয়েছিল ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। চলতি বছরের শুরুর সপ্তাহের চার কার্যদিবসে সামান্য ঊর্ধ্বগতিতে ৪০ পয়েন্ট যোগ হলেও গতকাল ৫৯ পয়েন্ট হারিয়েছে সূচকটি। ২০১৬ সালের ২৭ জুন ডিএসইর এ সূচকটি ৪৪১২ পয়েন্টে ছিল। বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির চাপে সদ্য চালু হওয়া সেরা ৪০ কোম্পানি নিয়ে তৈরি সিডিএসইটি সূচকটিও ১৮ পয়েন্ট হারিয়েছে। সূচক পতনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে স্কয়ার ফার্মা, ব্র্যাক ব্যাংক, অলিম্পিক, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন, রেনেটা, সিটি ব্যাংক ও আইসিবি।
২০১৮ ও ১৯ সালে টানা দরপতনের পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন অংশীজনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে বিভিন্ন উদ্যোগের দাবি জানানো হয়। তারা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিক বৈঠকে ব্যাংক খাতের প্রভাবে পুঁজিবাজারে বিদ্যমান তারল্য সংকট নিরসন, ভালো শেয়ারের জোগানসহ সুশাসন নিশ্চিতের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা দূর করার প্রস্তাব দিলেও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টো রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির পুঞ্জীভূত আয় সরকারি কোষাগারে নেওয়ার মতো কিছু সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এক অঙ্কের সুদহার কার্যকরে ব্যর্থতা, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়াসহ ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বল অবস্থান পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের নিট মুনাফা কমে যাওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের অবসায়নের কারণে এনবিএফআইগুলো আমানত প্রত্যাহারের ধারাবাহিক চাপে রয়েছে। ফলে এই প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজার থেকে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। তারল্য সংকট মেটাতে কিছু ব্যাংকও লোকসানে শেয়ার বিক্রি করছে। আবার ফ্রন্টিয়ার মার্কেটের বেশ কয়েকটি তহবিল অবসায়নে যাওয়ায় বিদেশিরাও পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।
গতকালও শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউজগুলো থেকে বিক্রিচাপ এসেছে। এদিন ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ২৯২ কোটি টাকা, যার ৭০ শতাংশ এসেছে শীর্ষ ১০ ব্রোকারেজ হাউজ থেকে। শেয়ার বিক্রির চাপ সবচেয়ে বেশি এসেছে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজ থেকে। এ প্রতিষ্ঠানের মোট লেনদেনের ৬৪ শতাংশ এসেছে শেয়ার বিক্রি থেকে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিক্রি ছিল আইডিএলসি সিকিউরিটিজের। এ প্রতিষ্ঠানটি গতকাল ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকার নিট বিক্রি করেছে। এ ছাড়া লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ, ব্র্যাক ইপিএল, এমটিবি, ইবিএল, ইউনাইটেড ফিন্যান্সিয়াল ট্রেডিং ও ইউনাইটেড সিকিউরিটিজ থেকে বিক্রিচাপ বেশি আসে।
বিদেশি ও ব্যাংকসহ স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আসা এ বিক্রিচাপ সামাল দিতে পারছে না বাজার। বর্তমান লেনদেনে ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বেশি থাকলেও গত দুই বছরের লোকসানে নতুন বিনিয়োগের সামর্থ্য তাদের নেই বললেই চলে। মার্জিন ঋণে শেয়ার কেনা বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই ফোর্সড সেলে (বাধ্যতামূলক বিক্রি) গত দুই বছরে বাজার ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। লেনদেন তলানিতে নেমে আসায় অধিকাংশ ব্রোকারেজ হাউজ দৈনন্দিন খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। আর সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবিকে বারবার তহবিল দেওয়া হলেও তা পুঁজিবাজারের বিনিয়োগে কাজে লাগাচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে আইসিবিও নিয়মিত বড় অঙ্কের শেয়ার বিক্রি করছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারের উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখছেন না খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) কর্মকর্তারা।
ডিএসইতে গতকাল ৩৫৪টি সিকিউরিটিজের লেনদেন হয়, যার মধ্যে ২৬৯টির দর কমে, ৫২টির বাড়ে ও অপরিবর্তিত ছিল ৩৩টির। ভ্রমণ, পাট ও খাদ্য খাত ছাড়া অবশিষ্ট সব খাত বাজার মূলধন হারিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে সিরামিক, বস্ত্র, জীবন বীমা, ট্যানারি, তথ্যপ্রযুক্তি ও জ্বালানি খাত। গতকাল এসব খাতের বাজার মূলধন কমেছে ১ দশমিক ৬ থেকে ৩ দশমিক ২ শতাংশ। তবে সূচকে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাংক, প্রকৌশল, এনবিএফআই ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাত এক থেকে দেড় শতাংশ পর্যন্ত দর হারিয়েছে।
