পুলিশ সপ্তাহের দরবার

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিস্মিত প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২০, ০৩:২১ এএম

গত বছরের পুলিশ সপ্তাহে পুলিশ সদস্যদেরকে দেওয়া বহু প্রতিশ্রুতি বিগত এক বছরেও বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রবিবার রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে দরবারে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে কেন প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হয়নি তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবের কাছে জানতে চান। একই সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালনকালে কোনো পুলিশ সদস্য মারা গেলে বা আহত হলে এককালীন অনুদান বাড়িয়ে সরকারি অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো করে এক সপ্তাহের মধ্যে গেজেট আকারে প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। দরবারে উপস্থিত থাকা একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানান।

তারা আরও জানান, দরবারে প্রধানমন্ত্রীকে পুলিশ সদস্যরা বলেন, তারা চাকরিকালে দুর্ঘটনায় আহত হলে ১ লাখ টাকা এবং নিহত হলে ৫ লাখ টাকা এককালীন অনুদান পান। অথচ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আহত হলে ৪ লাখ এবং নিহত হলে ৮ লাখ টাকা এককালীন অনুদান পান। পুলিশ সদস্যরা নিজেদের বঞ্চিত দাবি করে সরকারি অপরাপর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো তাদের এককালীন অনুদান বাড়ানোর দাবি জানান। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পুলিশের জন্য এই ভাতা আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটা কেন হয়নি তা আমার জানা নেই।’ তবে অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মতো পুলিশের আহত ও মৃত্যুকালীন ভাতা সমান করে এক সপ্তাহের মধ্যে সেটা গেজেট আকারে প্রকাশের নির্দেশ দেন।

দরবারে পুলিশ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীকে জানান, অন্য সরকারি কর্মকর্তারা সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়াও বছরে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি ভোগ করতে পারেন এবং সাধারণ ও সরকারি ছুটি, নির্বাহী আদেশে ছুটিসহ তারা বছরে প্রায় ১২০ দিন বিভিন্ন ছুটি ভোগ করেন। কিন্তু পুলিশ প্রশাসনে সার্বক্ষণিক দায়িত্বের কারণে এসব ছুটি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা এক্ষেত্রে ছুটি ও সুবিধা দাবি করেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি শুধু পুলিশকে এজন্য ‘কম্পেনসেশন অ্যালাউন্স’ দেব। সরকারি অন্য কোনো দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই সুবিধাপ্রাপ্ত হবে না।’

দরবারে প্রধানমন্ত্রীকে বলা হয়, পুলিশের পোশাকি ভাতা ও যাতায়াত ভাতাসহ বিভিন্ন বিশেষ ভাতা ১৯৮৫ সালের নির্ধারিত হারে দেওয়া হয়। যা বর্তমান বাজারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তারা এই ভাতা যুগোপযোগী হারে বাড়ানোর দাবি জানান। তখন প্রধানমন্ত্রী পোশাকি ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা বর্তমান বাজারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করা হবে বলে জানান।

গত বছরের পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হওয়া দরবারে পুলিশ সদস্যদের জন্য আজীবন দুই সদস্যের রেশন দেওয়া, বিদ্যমান বিশেষ ভাতা যৌক্তিক পর্যায়ে উন্নীতকরণ, বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাকাডেমি ও মিরপুর পুলিশ স্টাফ কলেজসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত/পদায়িতদের জন্য শর্তসাপেক্ষে ৩০ শতাংশ প্রশিক্ষণ ভাতা দেওয়া, প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম গাড়ি সেবা নগদায়নের সুবিধা ও বিভিন্ন ভাতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু এক বছরেও ওইসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। এ নিয়ে পুলিশ সদস্যরা গতকালের দরবারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের অনুযোগ তুলে ধরেন। তখন এসব দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং এসব যৌক্তিক প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন।

প্রধানমন্ত্রীকে বলা হয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের পাশে কয়েকটি ২০ তলা ভবন নির্মাণ করছে। সেগুলো পুলিশের জন্য চাওয়া হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা তো আগে বিষয়টি আমাকে জানাওনি। তোমরা তো চাইতেও পার না। এসব ভবনগুলোতে যে ফ্ল্যাট হবে সেগুলো যাতে পুলিশ সদস্যরা বরাদ্দ পায় সে বিষয়টি আমি গণপূর্ত বিভাগকে বলব। তোমাদের এলাকায় হওয়া (রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স সংলগ্ন) ভবনগুলোতে তোমরাই থাকবে।’ পরে প্রধানমন্ত্রী পুলিশের জন্য কমিউনিটি ব্যাংক চালু, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালকে আধুনিকায়ন, পুলিশে ক্যাডার ও নন ক্যাডার পদ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টি তুলে ধরেন। এ সময় উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান।

পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, গত বছর প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপিত প্রস্তাবনার কয়েকটির কিছু অগ্রগতি হলেও তার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। অনেকগুলো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন পেলেও মন্ত্রণালয়ে এসে থমকে গেছে। এসব প্রস্তাব বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-২ শাখা যাচাই-বাছাই করছে। কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত বা গুরুতর আহত সদস্যদের এককালীন অনুদান বৃদ্ধির খসড়া নীতিমালা অনুমোদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর গত ৮ এপ্রিল চূড়ান্ত সংশোধন করে নীতিমালা প্রণয়নে অনুরোধ করা হয়। নিহত পুলিশ সদস্যদের পারিবারিক রেশন সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাবের আলোকে দুষ্কৃতকারীদের হামলায় নিহত ২৮ জনের পরিবারকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে নিহতরা এ সুবিধা পাননি। পরে গত ২ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ে ফের প্রস্তাব পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। আর পুলিশ এককভাবে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব দিলেও সেটি গ্রহণ করা হয়নি। তবে সবকটি বাহিনীর জন্য মেডিকেল কলেজ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

‘মুজিববর্ষের অঙ্গীকার পুলিশ হবে জনতার’ স্লোগানে এবারের পুলিশ সপ্তাহ শুরু হয়েছে গতকাল রবিবার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর গতকাল দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে দরবার শুরু হয়। পরে পৌনে দুই ঘণ্টাব্যাপী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দরবারে বসেন পুলিশ দস্যরা। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। দরবারে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারদের পক্ষে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজা আক্তার, পরিদর্শকদের পক্ষে পুলিশ পরিদর্শক নাজমুল আলম, এসআইদের (উপপরিদর্শক) পক্ষে এসআই সৃষ্টি রাণী দত্ত, নায়েকদের পক্ষে নায়েক সাইফুল ইসলাম এবং কনস্টেবলদের পক্ষে কনস্টেবল লাকী খাতুন বক্তব্য দেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত