পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা ইরানের

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২০, ০১:৪৬ এএম

ইরানের কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সুলেইমানি যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যেই পরমাণু চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তেহরান আর পারমাণবিক কর্মসূচিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, মজুদ, গবেষণা ও উন্নয়ন সীমিত রাখার শর্ত মেনে চলবে না। গত রবিবার ইরানের পার্লামেন্টে এক বৈঠকের পর চুক্তি থেকে সরে আসার ওই ঘোষণা আসে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁখো এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এক যৌথ বিবৃতি ইরানকে তাদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘উত্তেজনা প্রশমন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আমরা সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত।’

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করে ইরান। চুক্তির শর্ত ছিল, ইরান তাদের কর্মসূচিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি

সীমিত রাখবে এবং যে কোনো স্থাপনায় যে কোনো সময় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রতিনিধিদের পরিদর্শন করতে দেবে। ওই চুক্তি হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে তাদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেয়। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ওই চুক্তিকে ‘ত্রুটিপূর্ণ ও একপেশে’ আখ্যায়িত করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ২০১৮ সালের মে মাসে চুক্তি থেকে সরে যায়। ইরানের ওপর তখন নতুন করে অবরোধ আরোপ করা হয়।

চুক্তি অনুযায়ী ইরানকে ‘হেভি ওয়াটার রিয়েক্টর’ নতুন করে তৈরি করতে হয়। পরমাণু বোমার আরেকটি উপাদান প্লুটোনিয়াম পাওয়া যায় এই রিয়েক্টরে ব্যবহৃত জ্বালানি থেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিদর্শকরা চুক্তি অনুযায়ী এই রিয়েক্টর নিয়মিত পরিদর্শন করার কথা। ২০১৫ সালের আগে পরিশোধিত ইউরেনিয়ামের বিরাট মজুদ ছিল ইরানে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ হাজার সেন্ট্রিফিউজেস ছিল তাদের। ১০টি পরমাণু বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট এগুলো।

সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল, ইরান যদি খুব তাড়াহুড়ো করে কোনো পরমাণু বোমা বানাতে চায়, তাদের সময় লাগতে পারে দুই থেকে তিন মাস। তবে এখন যেহেতু আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের কারণে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি অনেক সীমিত, তাই বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেও ইরানের সময় লাগবে অনেক বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কমপক্ষে এক বছর। তবে ইরান যদি সব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ইউরেনিয়াম পরিশোধনের মাত্রা ২০ শতাংশে উন্নীত করে তাহলে ছয় মাস বা তারও কম সময়ের মধ্যে এটি করা সম্ভব।

এদিকে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে গত রবিবার রাতে ছয়টি রকেট আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে তিনটিই আঘাত হেনেছে বিদেশি দূতাবাস ও সরকারি ভবন অধ্যুষিত সুরক্ষিত গ্রিন জোনে। ইরাকি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বাকি তিনটি রকেট জাদরিয়া এলাকায় আঘাত হেনেছে। পুলিশের উদ্ধৃতি দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, এসব হামলায় অন্তত ৬ জন আহত হয়েছে। এ নিয়ে গত দুই মাসে ১৪তম বার যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটল। এ ছাড়া তৃতীয় আরেকটি রকেট গ্রিন জোনের বাইরে বসবাসরত এক পরিবারের বাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে চারজন আহত হয়।

সুলেইমানির জানাজায় ইমামতি করার সময় কাঁদলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। রবিবার তেহরানের স্থানীয় সময় সাড়ে ৯টায় এই জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এএফপি সুলেইমানির জানাজায় খামেনির ইমামতি করার এক ভিডিও প্রকাশ করেছে। ভিডিওতে দেখা গেছে জানাজা পড়ানোর সময় খামেনির চোখে পানি। অশ্রুভেজা চোখ নিয়ে তিনি ইমামতি করছেন।

জানাজায় খামেনির ইমামতি করার আগে বক্তব্য রাখেন সুলেইমানির মেয়ে জেইনাব। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জেনে রাখো বাবার শাহাদাতের ফলে গোটা বিশ্বের প্রতিরোধ ফ্রন্টের মধ্যে মানবিকতা আরও বেশি জাগ্রত হবে। এখন থেকে পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে তাদের স্বামী অথবা বাবার মৃত্যুর আশঙ্কায় প্রহর গুনতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গোটা বিশ্ব দেখছে ইরাক ও ইরানের মানুষ কীভাবে তাদের বীরের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। ইরানি ও ইরাকি জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু এই শাহাদাতের ঘটনা দুই জাতির মধ্যে বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করেছে, তারা চিরস্থায়ী বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে।’

সুলেইমানি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন হিজবুল্লাহ মহাসচিব নাসরুল্লাহ। গত রবিবার সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সুলেইমানি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার দায়িত্ব শুধু তেহরানের নয়। এই দায়িত্ব পুরো প্রতিরোধকামী ফ্রন্টের। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি হবে তাদের বিভিন্ন ঘাঁটি, যুদ্ধজাহাজ এবং সেনাসদস্যদের ওপর হামলা।’

রবিবার ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদেল আব্দুল মাহদি জানিয়েছেন, তার সরকারের আমন্ত্রণেই গত ৩ জানুয়ারি ভোরে বাগদাদে পৌঁছান জেনারেল সুলেইমানি। তিনি তেহরান-রিয়াদ উত্তেজনা নিরসন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। ওইদিন সাড়ে ৮টায় ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের কথা ছিল তার।

ইরাকের পার্লামেন্টে বাগদাদ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব সৈন্যকে বের করে দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাস হয়। ওই প্রস্তাব পাস হওয়ার পর বাগদাদের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

রবিবার সন্ধ্যায় ফ্লোরিডা থেকে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি যাওয়ার পথে প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিমান ‘এয়ারফোর্স ওয়ানে’ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প এ হুমকি দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘সেখানে আমাদের অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি বিমানঘাঁটি আছে। যা নির্মাণ করতে শত শত কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। এর মূল্য পরিশোধ না করা পর্যন্ত আমরা সেখান থেকে সরছি না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত