পুলিশ সপ্তাহের তৃতীয় দিনে গতকাল মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। বৈঠকে তারা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠক নিয়ে ফের আপত্তি তোলেন ও মামলার কার্যক্রম তদন্তে গঠিত কমিটি বাতিলের দাবি জানান। পাশাপাশি প্রত্যেক জেলায় পুলিশের একটি ডরমেটরি, হাসপাতাল ও স্কুল স্থাপনের দাবি জানানো হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে কর্মকর্তারা মাদকবিরোধী জাতীয় কমিটিতে পুলিশ মহাপরিদর্শকের নাম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত তা অন্তর্ভুক্তের দাবি জানান।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, তাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রায় দুই ঘণ্টা কথা বলেন। আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী স্বাগত বক্তব্য দেন। এরপর র্যাব মহাপরিচালক ড. বেনজীর আহমেদ, সিআইডিপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন এবং ১০ জন পুলিশ সুপারসহ ২০ কর্মকর্তা বক্তব্য রাখেন।
সভায় র্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, মানুষ আদালতের বারান্দায় বারান্দায় ঘোরে, বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। পুলিশের পক্ষে যথাসময়ে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হলেও মামলা ঝুলে থাকায় জনমনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, যা কি না পুলিশের ওপরই বর্তায়। ১৪ লাখ ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ৩৫ লাখে। এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি দরকার। এজন্য আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় জরুরি। মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দরকার প্রসিকিউশন ও জুডিশিয়ারি। এ দুটির কোনোটাই স্বরাষ্ট্রে নেই। তাহলে মামলাজট কমাতে রিভিউ কমিটির কাজটা কী? একজন ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিদিন ৩০০ মামলার শুনানি নেন। অ্যাডিশনাল এসপি অপারেশনাল ফোর্স হলেও কোনো গাড়ি নেই। সে কি বাবার জমি বিক্রি করে ডিউটি করবে? আইন বলছে, প্রথম সাক্ষী হাজির করলে টাকা পাবে। কিন্তু ফাঁকফোকরে সেটা সাক্ষী পাচ্ছে না। কিন্তু সাক্ষী হাজির করতে হয় পুলিশকে। আবার সাক্ষী নিরুৎসাহিত হলে দোষ যায় পুলিশের ওপর। মামলার আলামত ও জব্দ তালিকা কোথায় রাখব? নি¤œ আদালতে তো পিপি কিংবা কোর্ট সাব-ইন্সপেক্টরের কোনো কার্যালয় নেই। তাহলে এসব কোথায় রাখবে? অথচ এসবের ওপর অনেকের জীবন-মরণ নির্ভর করে। কিছু মিসিং হলে দায় কি তবে পুলিশের? এসবের সমাধান জরুরি।
র্যাব মহাপরিচালক আরও বলেন, একেকটা মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লাগে ১২-১৫ বছর। নিয়ম অনুযায়ী মামলার আলামত আদালত তার মালখানায় মজুদ রাখবে। কিন্তু কয়টা কোর্টের মালখানা আছে? পুলিশ হচ্ছে বাংলাদেশে ন্যাশনাল শক অ্যাবজরভার। যত দোষ পুলিশের ওপর চাপানো হয়। কিন্তু কাজের কাজ কারা করছে? গোড়ায় হাত না দিয়ে কমিটির পর কমিটি বানিয়ে কোনো লাভ হবে না। মাদকের মামলা, আইসিটি, নারী নির্যাতনের মামলার মেয়াদ নির্ধারিত। তাহলে আমাদের ওপর তো মামলা প্রলম্বিত হচ্ছে না। রায়ে কেন তবে দেরি হয়। মুলতবি মামলার অন্য গুরুত্ব আছে।
দেশে ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম বাড়ছে উল্লেখ করে বেনজীর আহমেদ বলেন, এক্ষেত্রে পুলিশের কাজ করার কোনো ক্ষমতা নেই। জনগণ মনে করে পুলিশ চাইলেই পারে। কিন্তু আইনের কারণে পুলিশ যে পারে না সেটা তো জনগণ বোঝে না। হয় আমাদের দেন নয় তো তাদেরই দেন, তবুও এ বিষয়টার নিষ্পত্তি হোক। পুলিশ হচ্ছে বেস্ট ল অ্যান্ড এজেন্সি ইন কান্ট্রি। যা বলবেন তাই করবে।
বৈঠকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রত্যেক জেলায় আইনশৃঙ্খলা কমিটি রয়েছে। কমিটির প্রধান জেলা প্রশাসক, এসপি সদস্য। ডিসি অনুপস্থিত থাকলে সভায় সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক। এতে এসপিরা বিব্রতবোধ করেন। এ কমিটিতে এসপিদের কর্র্তৃত্ব রাখার বিষয়ে নজর দেওয়ার অনুরোধ জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।
বৈঠকে সিলেটের এসপি মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘জেলায় ঝুলে থাকা মামলার কার্যক্রম তদারকে একটি কমিটি আছে। কিন্তু কমিটিতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম নেই। এ কমিটি বাতিল করলে ভালো হবে।’
কুমিল্লার এসপি সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মাদক নির্মূলে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। আইজিপি মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলো, মাদক বিস্তার প্রতিরোধের জাতীয় কমিটিতে তার নাম নেই। আমরা দ্রুত আইজিপির নাম অন্তর্ভুক্তের দাবি করছি।’
হবিগঞ্জের এসপি মোহাম্মদউল্লাহ বলেন, ‘পুলিশের জন্য প্রত্যেক জেলায় একটি ডরমেটরি স্থাপন করা দরকার।’ খুলনার এসপি একেএম শফিউল্লাহ বলেন, ‘পুলিশের জন্য প্রত্যেক জেলায় একটি করে হাসপাতাল ও স্কুল করলে উপকার হবে।’ সাতক্ষীরার এসপি মোস্তাফিজুর রহমান অ্যাডিশনাল এসপিদের নিজস্ব গাড়ির ব্যবস্থার কথা জানান। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক ও পরিচালক পদে পুলিশ থেকে প্রেষণে নেওয়ার দাবি জানান।
বৈঠকে আইজিপি মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে যত দিন যাচ্ছে তত পিছিয়ে যাচ্ছে। আগে ২৪ বছরে অ্যাডিশনাল আইজিপি হতে পারত, কিন্তু এখন ৩০ বছরেও পারে না। আমাদের সামনে এখন কী অবস্থাটা দাঁড়াচ্ছে। ৬০০ এসপি হয়ে গেছেন। এর মধ্যে অ্যাডিশনাল ডিআইজি হবেন মাত্র ১০৭ জন। বাকিরা কেউ হতে পারবেন না। তারপর ডিআইজি ৬৭ জন। অর্ধেকও ডিআইজি হতে পারবেন না। অ্যাডিশনাল আইজি ১৭ জন। তাহলে অবস্থানটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, যদি এ থেকে উত্তরণ ঘটানো না যায় তাহলে যে ব্যাচগুলো আসছে তারা তো এসপিই হতে পারবেন না। একটা কমিটি গঠন করে সমস্যা উত্তরণের ব্যবস্থা করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। র্যাব ডিজির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আইজিপি বলেন, ৩৫ লাখ মামলা কেন জমে আছে? আইন মন্ত্রণালয়কে যদি দায়িত্ব দেওয়া যায় তাহলে ঠিকমতো সমাধান করতে পারবে। কিন্তু যে রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়েছে, এসপি এবং ডিসির তো ৩৫ লাখ মামলা কমানোর কোনো সুযোগ নেই।
অপারেশনাল কর্মকর্তাদের গাড়ির বিষয়ে তিনি বলেন, আগে চারজন ফোর্স নিয়ে অ্যাডিশনাল এসপি মুভ করতে পারতেন। এখন যে গাড়ি দেওয়া হচ্ছে তা অপারেশনাল গাড়ি নয়। এখানে একজনের বেশি বসার অবস্থা থাকে না। আগের মতো অপারেশনাল গাড়ি সরবরাহের অনুরোধ জানান আইজিপি।
মাদকসংক্রান্ত জাতীয় কমিটিতে আইজিপি নেই, বিভাগীয় পর্যায়ে ডিআইজি তিন নম্বরে। জেলা পর্যায়েও একই অবস্থা। এ বিষয়গুলোরও সমাধান দাবি করেন বৈঠকে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা।
সিআইডির ডিআইজি শাহ আলম ফৌজদারি মামলায় যথাযথ সমন্বয়ের জন্য পুলিশের হাতে প্রসিকিউশন ফিরিয়ে আনার দাবি জানান এবং মেট্রোপলিটন থানাগুলোতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অফিসার ইনচার্জ হিসেবে নিয়োগের অনুরোধ করেন।
স্বরাষ্ট্র সচিব মোস্তফা কামাল বলেন, ‘পুলিশের ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। পুলিশের সুবিধা বাড়ানো মানে গণতন্ত্রের সুবিধা। মানুষ বিপদে পড়লে প্রথমে পুলিশের কাছে যায়। আমরা রাজনৈতিক সরকারের অধীনে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে কাজ করি। সংসদ সদস্যদের জবাবদিহিতা সংসদে, কিন্তু আমাদের জবাবদিহিতা জনগণের কাছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মামলা নিচ্ছেন না থানার ওসি। এজন্য এসপিসহ মামলার আসামি হয়ে ৩-৪ জন বিপদে আছেন। যদিও কোনো এসপি এমন নির্দেশনা দেন না। নির্ভয়ে পুলিশিং করতে হলে এসবের ব্যাপারে কথা বলতে হবে। বিচার বিভাগ, দুদক, তথ্য কমিশন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। আসলে সবাই স্বাধীন হলে রাষ্ট্র পরাধীন হয়ে যায়। সবার স্বাধীনতা ঠিক নয়। সেমিনার করে এ ব্যাপারে কথা বলতে হবে। সব দোষ কেন পুলিশের হবে। প্রত্যেকটা আইন করার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত-পা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। কাস্টমস একটা আইন করেছে। তার বিরুদ্ধে আমি কথা বললেও সেটা বলতে পারেন অর্ধেক পাস হয়ে গেছে। কোনো একটা অবৈধ জিনিস কারও হাতে থাকলে যেটার কাস্টমস ডিউটি দেওয়া হয়নি সেটা তালাশ করতে করতে মৃত্যু ঘটাতে পারবে। এটা কোন আইনে আছে? কোনো বিমানে যদি অবৈধ পণ্য থাকে তাহলে সেটা গুলি করে নামাতে পারবেন, এমন আইন। অথচ পুলিশ যখন আসামিকে ইন্টারগেট করা অবস্থায় মারা যায়, তখন পুলিশ দোষী হয়। এসব আসলে দেখা দরকার।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘দিন শেষে সবার নজর থাকে পুলিশ কী করেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী করল। বঙ্গবন্ধু পুলিশকে জনগণের পুলিশ হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। আমরা ধীরে ধীরে সেদিকেই যাচ্ছি। সেবার মান যাতে বৃদ্ধি পায় সেভাবে পুলিশকে গড়ে তোলা হচ্ছে। আপনাদের দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করেছি। তিনি রিভিউ কমিটি যুগোপযোগী করার নির্দেশনা দিয়েছেন। নতুন কিছু যোগ করা যায় কি না দেখা হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের যে কমিটি সেটা নিয়ে অধিদপ্তরকে বলব, পুলিশের আইজি, ডিআইজি, এসপিসহ বর্ডার গার্ডের চিফকেও কমিটিতে যেন নিয়ে আসা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে যদি অধিদপ্তর একাই কাজ করত তাহলে তো সুরক্ষা বিভাগের দরকার ছিল না। কাজ তো পুলিশ, র্যাব, বিজিবি করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আর্মির মেডিকেল কোরের মতো পুলিশের জন্যও মেডিকেল কোর করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আমাদের মধ্যে চিকিৎসকের খুব অভাব রয়েছে।’
গাড়ি সংকট নিরসনে অপারেশনাল কাজের উপযোগী নতুন গাড়ির মডেল রিকুইজিশন পাঠাতেও আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
