ভাবুন তো, টেস্ট যদি চারদিনে হয় তাহলে কেপটাউন টেস্টের ফল কী হতো! নিশ্চিত ড্র। কারণ ইংল্যান্ডের দেওয়া ৪৩৮ রানের লক্ষ্যে ছুটে চতুর্থ দিন শেষে ২ উইকেটে ১২৬ করে প্রোটিয়ারা। আইসিসির নতুন পরিকল্পনা যদি ধরা হয়, তাহলে তো ম্যাচটি ওখানেই শেষ। কিন্তু ৫ দিনের টেস্টের উত্তেজনা দেখুন। ম্যাচ গড়াল শেষদিনের শেষ ঘণ্টা পর্যন্ত। তাতে ইংল্যান্ডে জিতবে না দক্ষিণ আফ্রিকা হার রুখবে, সেই রোমাঞ্চে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তামাম ক্রিকেটপ্রেমীদের। এমন অবস্থায়, ম্যাচ যখন প্রায় ড্র করে ফেলছিল প্রোটিয়ারা তখন ইংল্যান্ডের ‘মহানায়ক’ বেন স্টোকস এলেন। খেলার আর ১২ ওভার বাকি, চার ওভারেই প্রোটিয়াদের শেষ তিন উইকেট তুলে নিলেন তিনি, এর মধ্যে পরপর দু’বলে। খেলার ৮.৪ ওভার বাকি থাকতে ম্যাচ জিতে নিল ইংল্যান্ড। সিরিজে ফিরল সমতা। টেস্ট ৪ দিনে হলে এই নাটক কি দেখা হতো? এটাই আসলে পাঁচ দিনের টেস্টের রোমাঞ্চ। যেখানে শেষ ঘণ্টা পর্যন্ত জয়-পরাজয়ের পাল্লা দুলতে থাকে কোনো কোনো ম্যাচে। তাই কেপটাউন টেস্টে আইসিসির পরিকল্পনা জোর ধাক্কা খেল বলাই যায়।
টেস্ট ক্রিকেট যদি চার দিনে নেমে আসে তবে অনেক সিরিজের সঠিক ফল-ই যে বেরোবে না। তাই রোমাঞ্চকর একটি ম্যাচ শেষে আইসিসির পরিকল্পনার বিরুদ্ধেই কথা বললেন দুই দলের অধিনায়ক ফ্যাফ ডু প্লেসিস ও জো রুট এবং ম্যাচসেরা বেন স্টোকস। শচিন টেন্ডুলকার বিরাট কোহলি, হাশিম আমলা, রিকি পন্টিং, নাথান লায়নদের সঙ্গে যোগ দিলেন তারা। ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয় ও অ্যাশেজে সমতা আনা তারকা স্টোকস নিজেকে সময়ের সেরা ম্যাচ উইনার হিসেবে অন্যন্য উচ্চতায় তুলছেন। তার মুখে টেস্টটা পাঁচদিনে থাকুকÑ কথাটা সত্যিই মানায়। কেপটাউন টেস্টকে সামনে টেনে স্টোকস জানান, ‘যখন কোনো লম্বা সিরিজে প্রথম ম্যাচগুলোয় ফলাফল হয় তখন সিরিজটি খুব জমে ওঠে। বাকি ম্যাচগুলো নিয়ে বড় পরিকল্পনা করা যায়। এজন্যই ৫ দিনের টেস্ট থাকা উচিত। এটা ক্রিকেটের সেরা ফরম্যাট। আর এই রকম ম্যাচগুলোর কারণে ক্রিকেটের কথা মানুষ মনে রাখে। অনেক ম্যাচের মতো এই ম্যাচটিও আমরা অনেকদিন মনে রাখব। দক্ষিণ আফ্রিকাও মনে রাখবে। গ্রেট ম্যাচের তালিকায় এর নাম উঠতেই পারে।’
অথচ এমন টেস্টের শেষদিন অর্থাৎ পঞ্চম দিন সকালে দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট কর্র্তৃপক্ষ ৪ দিনের টেস্টে সহমত জানিয়ে বিবৃতি দেয়। কিন্তু দিন শেষে প্রোটিয়া অধিনায়ক ডু প্লেসি জানিয়ে দেন তার চিন্তাটা এমন না, ‘পাঁচদিনের টেস্টের দারুণ ভক্ত আমি। দেখবেন ক্রিকেটের গ্রেট যত ড্র, সব পাঁচদিন শেষে হয়েছে। বুঝতে পারছি অনেক ম্যাচ পঞ্চম দিনে গড়ায় না বলে অর্থ নষ্ট হয়। তবুও বলব আমি নিজে অনেক রোমাঞ্চকর ম্যাচের সাক্ষী যেগুলো পঞ্চম দিনে গড়িয়েছিল। টেস্ট ৪ দিনে হলে এই ম্যাচে ফলাফল অসম্ভব ছিল। পাঁচ দিনের খেলাই আসলে টেস্টকে আলাদা করেছে। এটা এভাবেই থাকা উচিত।’
ইংল্যান্ড অধিনায়ক জো রুট কেপটাউনে শেষ দিনের রোমাঞ্চ জিতে ৪ দিনের টেস্টের ওকালতকারীদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, ‘অনেকে হয়তো মনে করছেন ৪ দিনের টেস্ট হতে পারে। কিন্তু তারা কি চান এইরকম (কেপটাউন টেস্টের পঞ্চম দিন) একটি দিন হারাতে? আমার বিশ্বাস কেউই চান না। এটাই আসলে টেস্ট ক্রিকেট। একদম লেজে চলে যাওয়া এবং অসাধারণ একটা শেষ।’
আর সব ক্রিকেটারদের মতো ভারতীয় গ্রেট শচিন টেন্ডুলকারও ৫ দিনের টেস্টের পক্ষে। ‘রক্ষণশীলতা এবং টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা থেকে আমি বলব, কোনোভাবেই যেন পাঁচ দিনের ক্রিকেট-কাঠামোর পরিবর্তন করা না হয়। এত বছর ধরে যেভাবে টেস্ট ক্রিকেট খেলা হয়ে এসেছে, সে ভাবেই চলুক।’ সুন্দর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন নিজের মতামতের, ‘একটা দিন কমানো হলেই ব্যাটসম্যানদের ধারণা হয়ে যাবে এটা সীমিত ওভারের ক্রিকেটেরই অংশ। একজন ব্যাটসম্যান যদি দ্বিতীয় দিন লাঞ্চ পর্যন্ত ব্যাট করে, তার মনে হবে, খেলার তো আর মাত্র আড়াই দিন বাকি। সে কথা মাথায় রেখেই চালিয়ে ব্যাট করতে চাইবে। তখন ওদের কাছ থেকে টেস্টের মেজাজে ব্যাটিং দেখা বা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এতে করে টেস্টের আসল রূপ হারিয়ে ফেলতে পারি আমরা।’
