দুই দফা বড় ধরনের ধসের পর তৃতীয় ধসের মুখে দেশের পুঁজিবাজার। গত দুই বছর ধরে টানা পতনে রয়েছে এই বাজার। পতনের তীব্রতা চলতি বছর আরও বেড়েছে। ২০১৮ সাল থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স পয়েন্ট হারিয়েছে ৩২ শতাংশ। অধিকাংশ শেয়ারের ক্রেতা না থাকায় প্রতিদিনই দাম কমছে। এতে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। তবে ডিএসই বেহাল অবস্থায় থাকলেও এ সময় অন্যান্য দেশের পুঁজিবাজার ভালো অবস্থায় রয়েছে। টানা পতনের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ বাজারে পরিণত হয়েছে ডিএসই।
১৯৯৬ সালের পর ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ফের ধসের মধ্যে পড়ে ডিএসই। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে সৃষ্ট ধসের প্রভাব ছিল ২০১২ সাল পর্যন্ত। এ সময়ে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটি প্রায় ৫০ শতাংশ হারায়। পরবর্তী সময়ে ডিএসইতে প্রায় শতাধিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়। স্টক এক্সচেঞ্জটির বাজার মূলধনে যোগ হয় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এ সময় নতুন নতুন আইন তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান সিকিউরিটিজ আইনও সংশোধন হয়। এতে করে সাময়িক স্থিতিশীলতা এলেও ২০১৮ সাল থেকে ফের পতনের মধ্যে পড়ে পুঁজিবাজার, সেই ধারা এখনো রয়েছে।
২০২০ সালের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে টানা চার দিনের পতনে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক হারিয়েছে ৫ শতাংশের বেশি পয়েন্ট। বিদেশি ও স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির পাশাপাশি মার্জিন ঋণে কেনা
শেয়ার ফোর্সড সেলের (বাধ্যতামূলক বিক্রি) আওতায় চলে আসায় সামনের দিনগুলোতে পতনের তীব্রতা আরও বাড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে ডিএসইতে যখন দুই বছর ধরে পতন চলছে, একই সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পুঁজিবাজার রয়েছে ঊর্ধ্বমুখী। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ২০১৮ সালের পর থেকে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের সেনসেক্স সূচক বেড়েছে ২২ শতাংশ। দুই বছর পতনের পর পাকিস্তানের করাচি স্টক এক্সচেঞ্জের কেএসই ১০০ সূচক গত চার মাসে ৪২ শতাংশ বেড়েছে। শ্রীলঙ্কার কলম্বো স্টক এক্সচেঞ্জের অল শেয়ার প্রাইস সূচকও পতনের ধারা কাটিয়ে গত বছরের মে মাস থেকে ঊর্ধ্বগামী রয়েছে। গত দুই বছরে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের ওঠানামা হলেও বড় পতন রোধ করতে পেরেছে। ২০১৮ সালে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতির পর এখন কিছুটা সংশোধনের ধারায় রয়েছে ভিয়েতনামের হ্যানয় স্টক এক্সচেঞ্জ ইক্যুয়িটি সূচক। তবে এ সংশোধনও সহনীয় মাত্রায় রয়েছে। গত এক বছর ধরেই স্থিতিশীল রয়েছে থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন স্টক এক্সচেঞ্জ।
গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক ১০০ ও ডাও জোনস সূচক বেড়েছে যথাক্রমে ১৬ ও ৩৩ শতাংশ। এছাড়া দেশটির পুঁজিবাজারের এসঅ্যান্ডপি-৫০০ সূচক বেড়েছে ১৪ শতাংশ। ২০১৮ সালের পতনের পর গত বছর থেকেই সূচক পুনরুদ্ধার হচ্ছে চীনের সাংহাই কম্পোজিট স্টক মার্কেটে। একই অবস্থায় রয়েছে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের এফটিএসই-১০০ সূচকও। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইউরোপের প্রায় সব দেশের স্টক এক্সচেঞ্জের সূচকের উন্নতি দেখা গেছে। এ সময়ে চীনের সাংহাই শেনঝেন সিএসআই-৩০০ সূচকও বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার স্টক মার্কেটও এখন ঊর্ধ্বগামী রয়েছে। জাপানের নিক্কেই সূচকও বেড়েছে। তবে ডিএসইর তুলনা হতে পারে ওমান স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে। গত পাঁচ বছর ধরেই এই স্টক এক্সচেঞ্জের এমএসএম-৩০ সূচক ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী রয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাজারের বর্তমান দুরবস্থার প্রধান কারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা। আর এই আস্থাহীনতা এসেছে সুশাসন, প্রয়োজনীয় নজরদারি ও অপরাধের যথাযথ শাস্তির অভাবে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় এমনটি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাজারের গভীরতা বাড়াতে এক যুগেরও বেশি সময়ে বারবার সময় নির্ধারণ করেও রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আনার কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অথচ বাজারে গতি আনতে এটি ছিল সবচেয়ে কার্যকর উপায়। উল্টো মানহীন কোম্পানির আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) এনে বাজারকে বড় ক্ষতির মুখে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক খাতের সংকট, পিপলস লিজিংয়ের অবসায়নে পুরো এনবিএফআই খাতে বিপর্যয়কর অবস্থা ও গ্রামীণফোনের সঙ্গে বিটিআরসির দ্বন্দ্ব বড় প্রভাব ফেলছে বাজারে। এর মধ্যে বিদেশিদের টানা শেয়ার বিক্রির চাপে আরও সংকটে পড়ে বাজার। স্কয়ার ফার্মা, গ্রামীণফোন, ব্র্যাক ব্যাংকের মতো ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানি টানা দর হারাচ্ছে। গতকাল বুধবার পর্যন্ত ৮০ শতাংশের বেশি শেয়ারের দর কমে গেছে। ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক নেমে এসেছে ৪২২৮ পয়েন্টে। এতে সূচকটি ফিরে গেছে ২০১২ সালের অবস্থানে। এ অবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ হয়েও বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ পুঁজিবাজারে পরিণত হয়েছে ডিএসই।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ৭ লাখ ১৮ হাজার বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব কমে গেছে। বর্তমানে যে বিও রয়েছে, তার মধ্যে ৫৫ শতাংশে কোনো শেয়ার নেই। শুধু এক বছরেই ৩০ হাজারের বেশি সক্রিয় বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার ছেড়ে গেছেন।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছর একমাত্র বীমা ছাড়া বাকি খাতগুলো বাজার মূলধন হারিয়েছে। গত দুই বছরে ডিএসই তার বাজার মূলধন হারিয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। বড় পতনের কারণে ২০১৯ সালে সিমেন্ট খাত ৩৩ শতাংশের বেশি বাজার মূলধন হারিয়েছে। আগের বছরও এ খাতটি প্রায় ২৪ শতাংশ বাজার মূলধন হারায়। ২০১৮ সালে এনবিএফআই খাত প্রায় ২২ শতাংশ দর হারানোর পরও গত বছর ২৪ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়েছে। ২০১৮ সালে ব্যাংক খাত ২১ শতাংশ বাজার মূলধন হারায়। খাতটি গত এক বছরে আরও ১০ শতাংশ দর হারিয়েছে। গত দুই বছরে টেলিযোগাযোগ খাত ৩০ শতাংশের বেশি দর হারিয়েছে। ২০১৮ ও ১৯ সালে সেবা ও নির্মাণ খাত যথাক্রমে ২০ দশমিক ৫ ও ২৩ শতাংশ দর হারিয়েছে। ২০১৮ সালে তুলনামূলক কম দর হারালেও গত বছর প্রকৌশল খাত ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ দর হারিয়েছে। এছাড়া খাদ্য ও আনুষঙ্গিক, জ্বালানি, সিরামিক অন্যান্য খাতও বড় আকারের বাজার মূলধন হারিয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিএসই এখন মৃতপ্রায়। এর কারণ হলো, গত দশ বছরে প্রাইমারি মার্কেটে যেসব কোম্পানি এসেছে সেগুলো আইপিওতে যে আয় দেখিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তা ধরে রাখতে পারেনি। সেকেন্ডারি মার্কেটে এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীরা বিপুল লোকসানে পড়েছেন। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে বিপুল পরিমাণের মন্দঋণ সৃষ্টি হয়েছে, যার কারণে খাতটির মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যেহেতু পুঁজিবাজারে ব্যাংক খাত সবচেয়ে বড় মূলধনী খাত, তাই এ খাতটির বিপর্যয়কর অবস্থা পুঁজিবাজারে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। আমাদের চলতি হিসাবে ঘাটতিও বেড়েই চলেছে। এসবের প্রভাবই পড়ছে বাজারে।
মিজানুর রহমান বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এসইসি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। নজরদারিতে ব্যর্থ হয়েছে। ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ ও ম্যানেজমেন্টের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্টক এক্সচেঞ্জটির ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। লোকবল নিয়োগে তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আইপিওতেও যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেনি তারা।
