কামরাঙ্গীরচরের সেকশন বাসস্ট্যান্ডের পাশেই বুড়িগঙ্গা নদীর আদি চ্যানেল। এটি যেন ময়লা-আবর্জনার এক বিশাল ভাগাড়। লালবাগ এলাকায় উত্তপত্তিস্থল থেকে সেকশন পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে এই চ্যানেলটির চূড়ান্ত মৃত্যু ঘটেছে। এর পশ্চিম তীর ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে উঁচু উঁচু ভবন। বাসস্ট্যান্ড থেকে কালভার্ট ধরে সামনে এগিয়ে গেলে চরের মূল ভূখণ্ড। এটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে পড়েছে। কামরাঙ্গীরচর থানার পশ্চিম বড়গ্রাম, ইসলামনগর, আলীনগর, হুজুরপাড়া, পশ্চিম আশ্রাফাবাদ, পশ্চিম রসুলপুর, উত্তর রসুলপুর, দক্ষিণ রসুলপুর ও পূর্ব রসুলপুর এলাকা নিয়ে এ ওয়ার্ড গঠিত। বর্তমানে এখানকার মোট ভোটার সংখ্যা ৬৫ হাজার। তবে এলাকায় বাস করেন পাঁচ লাখের বেশি মানুষ, ২০১৩ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর গত সাত বছরেও যাদের ভাগ্যে জোটেনি কাক্সিক্ষত নাগরিক সেবা।
জানা গেছে, সাবেক সুলতানগঞ্জ ইউনিয়ন ভেঙে ২০১৩ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অন্তর্ভুক্ত হয় কামরাঙ্গীরচর থানা। ২০১৫ সালে প্রথম নির্বাচিত কাউন্সিলর পায় এই ওয়ার্ডবাসী। তবে এর মধ্যে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও আশানুরূপ উন্নতি হয়নি এলাকায়। গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, কামরাঙ্গীরচরের অন্য অংশের তুলনায় এই এলাকার রাস্তা বেশ প্রশস্ত। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশা, বিভিন্ন কারখানার মালবাহী ট্রাক, বালুর ট্রাক ও সিএনজি অটোরিকশাসহ নানা ধরনের যানবাহনের চাপে যানজট লেগে আছে। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে সড়কে বাতি লাগানো হলেও সেগুলো কাজে আসেনি। বেশিরভাগ লাইট বন্ধই থাকে। বেড়িবাঁধ সড়ক ধরে কামরাঙ্গীরচরে প্রবেশে বেশ কয়েকটি কালভার্ট থাকলেও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে প্রবেশের কালভার্ট মাত্র দুটি। দুটির অবস্থাই বেশ নড়বড়ে। ফলে দিন-রাতের ২৪ ঘণ্টাই সেতুতে যানজট থাকে চোখে পড়ার মতো।
রনি মার্কেট এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কামরাঙ্গীরচরের সমস্যার কইয়া শ্যাষ করার পারুম না। বেড়িবাঁধের সঙ্গে আরও কয়েকটি লিঙ্ক রোড দরকার। এইটা নাই বইল্যা এই ওয়ার্ডে ঢুকন-বাইর হওন ম্যালা কষ্ট।’ নাগরিক সমস্যার দিক থেকে ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড়
দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস সংকট। বিষয়টি নিয়ে প্রভাবশালী থেকে নিম্নবিত্ত সবাই নিজেদের অসহায়ত্ব স্বীকার করেছেন। জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে এই এলাকায় গ্যাসের সংযোগ দেয় তিতাস কর্র্তৃপক্ষ। দীর্ঘ এই সময়ে এলাকার জনসংখ্যা কয়েকগুণ বাড়লেও গ্যাস সরবরাহের উন্নতি ঘটেনি। ফলে দিন-রাতে দুই ঘণ্টার বেশি গ্যাস পাওয়া যায় না। গ্যাসের এমন ইঁদুর-বিড়াল খেলায় এলপি গ্যাস, কাঠের লাকড়ি ও কেরোসিন চুলার ওপর নির্ভর হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী।
হাসাননগর এলাকার এক গৃহিণী বলেন, ‘গ্যাসের আশায় থাকলে না খাইয়া থাকতে হয়। চুলা না জ্বালালেও বিল ঠিকই দিতাছি। চেয়ারম্যান-মেম্বর কেউ এই বিষয়ে দ্যাখে না।’
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাত হলেই কামরাঙ্গীরচরের অলিগলিতে বসে গাঁজা, ফেনসিডিল ও ইয়াবাসেবীদের আসর। উঠতি বয়সী কিশোর ও যুবকরা বেশি নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। কামরাঙ্গীরচরের রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণেরও অভিযোগ আছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় মাদক ব্যবসায়ীরা ঘুরে বেড়ালেও তাদের গ্রেপ্তার করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে দুই শতাধিক অবৈধ কারখানায় গ্যাস সংযোগ দিয়ে পুলিশ মাসোহারা নেয় বলেও ভাষ্য এলাকাবাসীর।
আগামী ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে সমর্থন পেয়েছেন বর্তমান কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন। বিএনপি থেকে সমর্থন পেয়েছেন কামরাঙ্গীরচর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. নাইম। নানা কারণে বিতর্কিত হোসেন কমিশনারকে দলীয় সমর্থন দেওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাকে ঠেকাতে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন আরও তিনজন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আমিনুল ইসলাম, কামরাঙ্গীরচর থানা আওয়ামী লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক সাইদুর রহমান রতন ও থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. সায়েম।
স্বতন্ত্র কাউন্সিলর প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ নেতা সাইদুর রহমান রতন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। তিনি কাউন্সিলর হয়ে আমাদের দলের অনেক নেতাকে অপমান করেছেন। তার কারণে কামরাঙ্গীরচরের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে। আমরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় স্বয়ং এমপি কামরুল সাহেব পুলিশ দিয়ে হয়রানি করছেন।’
দলের মধ্যে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা বিতর্ক ও দলীয় বিভক্তি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে কেরানীগঞ্জের উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ মনোনয়ন চেয়ে পাননি। আমি কাজ করেছি এমপি কামরুল ইসলামের পক্ষে। এজন্য শাহীন চেয়ারম্যানের লোকজন আমার বিরুদ্ধে সব ধরনের অপপ্রচার চালায়। আমার ওয়ার্ডে একটি ডোবা ছিল, সেটি উদ্ধার করে আমি ঈদগাহ করেছি। এটাও অনেকের চক্ষুশূল হওয়ার কারণ। এটি ইউনিয়নের অংশ ছিল। আমি স্কুল, কলেজ ও খেলার মাঠ করেছি। আগামীতে নির্বাচিত হতে পারলে রাস্তা প্রশস্ত করার কাজ করব। এলাকায় প্রচুর বৃক্ষ রোপণ করব।’
অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মো. নাইম বলেন, ‘গতবারও আমি নির্বাচন করেছিলাম, সেবার ব্যাপক সাড়াও পেয়েছি। কিন্তু দল নির্বাচন বর্জন করায় তারা জিতে গেছে। সুষ্ঠু ভোট হলে আমি অবশ্যই জিতব ইনশাআল্লাহ। তবে এখন পর্যন্ত যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে সুষ্ঠু ভোটের আশা করা যায় না। আমার লোকদের ফোন দিয়ে হোসেনের লোকজন হুমকি দিচ্ছে। তারা বের হতেই চাচ্ছেন না।’
