ডা. সারওয়ারকে হত্যাচেষ্টা

জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা পায়নি পিবিআই

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২০, ০২:০৭ এএম

ঢাকার উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরে নিজ বাসায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি ও ছায়ানটের নির্বাহী সভাপতি ডা. সারওয়ার আলীকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা পায়নি উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তারা এ হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে গতকাল বুধবার পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি। এ

ঘটনায় ডা. সারওয়ারের করা মামলায় তদন্তে নামা পিবিআই বলছে, ওই বাসায় দুর্বৃত্তদের ফেলে আসা ফোন ও ব্যাগের সূত্র ধরেই তদন্ত চলছে। মামলার এক আসামি ও সারওয়ারের গাড়ির আগের

চালক নাজমুলকে গ্রেপ্তার করতে পারলে এ বিষয়ে জানা যাবে। বাড়ির দারোয়ান হাসান ও বাদীর বর্তমান গাড়িচালক হাফিজকে গ্রেপ্তারের পর দুদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলানো হচ্ছে। নাজমুলের সঙ্গে ওই বাসার দারোয়ান হাসানের যোগাযোগ ছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। আর বিষয়টি ব্যক্তিগত পূর্বশত্রুতা থেকে পরিকল্পিতভাবে হতে পারে। তবে এ ঘটনায় মামলার বাদী ডা. সারওয়ারের ভাষ্য, পূর্বশত্রুতায় এমন হামলা হতে পারে বলে আমি মনে করি না। নাজমুলের সঙ্গে জঙ্গিসম্পৃক্ততা থাকতে পারে।

গত রবিবার রাতে উত্তরায় নিজ বাসায় ঢুকে ডা. সারওয়ার আলীকে দুর্বৃত্তরা হত্যাচেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় ডা. সারওয়ার নিজেই বাদী হয়ে তার ব্যক্তিগত গাড়ির সাবেক চালক নাজমুল ও বাসার দারোয়ান হাসানের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত চার-পাঁচজনের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা করেছেন। এজাহারভুক্ত আসামি হাসান ও বাদীর বর্তমান গাড়িচালক হাফিজকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা দুদিনের রিমান্ডে রয়েছে। নাজমুলকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত রবিবার রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে সারওয়ার আলীর মেয়ের তিনতলার ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা। দুজন দুর্বৃত্ত মেয়ের স্বামীকে চাপাতির মুখে জিম্মি করে সারওয়ার কোথায় জানতে চায়। চারতলায় জানানোর পর একজন দুর্বৃত্ত ওপরে চলে যায়, একজন তিনতলাতেই থাকে। চারতলার ফ্ল্যাটে কলিংবেল বাজানোর পর ডা. সারওয়ার দরজা খোলেন। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিচে ফেলে চাপাতি ধরে এক দুর্বৃত্ত। সেটা দেখে সারওয়ারের স্ত্রী চিৎকার দিয়ে এগিয়ে এলে তাকেও ভয় দেখানো হয়। চেঁচামেচি শুনে মেয়ে বেরিয়ে আসেন। এই ফাঁকে ওই দুর্বৃত্তকে ধাক্কা দিয়ে বের করে ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দেন সারওয়ার। তিনতলার হামলাকারীও চারতলায় চলে আসে। চিৎকার শুনে দোতলার ভাড়াটিয়া ও চারতলা থেকে সারওয়ার আলীর ছেলে ছুটে আসেন। ভাড়াটিয়া একজন দুর্বৃত্তকে জাপটে ধরেন। তার ছেলে অন্যজনকে টুল দিয়ে মারার চেষ্টা করলে একজন পালিয়ে যায়। এরই ফাঁকে অন্যজন গা-ঝাড়া দিয়ে ছুটে বাইরে চলে যায়। ভাড়াটিয়াদের একজন হামলার বিষয়টি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে জানান। পুলিশ আসার আগেই দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। তাদের ফেলে যাওয়া ব্যাগ থেকে সাতটি চাপাতি, ব্লাড প্রেশার মাপার একটি যন্ত্র, স্কচটেপ, রশি ও কিছু ওষুধ পেয়েছে পুলিশ।

ডা. সারওয়ারকে হত্যাচেষ্টার ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন কুমার সাহা। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নাজমুলের ফেলে যাওয়া মোবাইল ফোন ও ব্যাগের সূত্র ধরে তদন্ত চলছে। ওই বাসার দারোয়ান হাসানের সঙ্গে নাজমুলের সম্পৃক্ততার বিষয়টি আমরা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছি।’ কোন উদ্দেশ্যে হামলা করা হয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উদ্দেশ্যে কী ছিল তা এখন পর্যন্ত পরিষ্কার হওয়া যায়নি। আরও সময় লাগবে।’

এ মামলার বিষয়ে পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, নাজমুলকে গ্রেপ্তারে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি দুয়েক দিনের মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। তারা কোন উদ্দেশ্যে ওই বাসায় হামলা করে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নাজমুলের সঙ্গে ডা. সারওয়ার আলীর দ্বন্দ্বের বিষয়টি জানা গেছে।

পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) বিশেষ পুলিশ সুপার বশির আহমেদ বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষে এ বিষয়ে জানানো হবে। এ জন্য দুয়েক দিন সময় লাগবে।’

মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. সারওয়ার আলী গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার একটা আশঙ্কা এটি ডাকাতির চেষ্টা নয়, কারণ তারা টাকা-পয়সা, সোনার গহনা এগুলো কিছুই চায়নি এবং তারা বাড়ি তছনছও করেনি।’ তিনি বলেন, ‘নাজমুলের ব্যাগে যে ধরনের অস্ত্রপাতি পাওয়া গেছে, চাপাতি, আইপট, টিভি ক্যামেরার স্ট্যান, ক্যামেরা এগুলো সাধারণত জঙ্গিরা ব্যবহার করে বলে জানি। আমি নিজে যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা, আমার স্ত্রী যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা, আমি মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘরের ট্রাস্টি, ছায়ানট করি, জঙ্গিরা তো এগুলোকে শত্রু মনে করে। সেই কারণে আমার আশঙ্কা যে আমার ওপর এটি জঙ্গি আক্রমণ হতে পারে।’

নাজমুলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দারোয়ান স্বীকার করেছে ঘটনার দিন রাত সাড়ে ৮টা থেকে সে আমার বাসার নিচতলায় অবস্থান করছিল। টেলিভিশন দেখছিল। যে ব্যাগ পাওয়া গেছে সেটি নাজমুল আমার দারোয়ানের কাছে রাখতে দিয়েছিল। তবে আমাদের বাসার ভেতরে যে আসছিল সে নাজমুল নয়।’ তিনি বলেন, ‘বছরখানেক আগে মাস চারেকের জন্য নাজমুল আমার গাড়ি চালিয়েছিল। আমার স্ত্রীর সঙ্গে বেয়াদবি করার কারণে তাকে বাদ দিই। কিন্তু স্ত্রীর ওপর হামলা হয়নি। সুতরাং ওই কারণে যে নাজমুল এটা করেছে তা আমার মনে হচ্ছে না। একজন ড্রাইভার আইপড নিয়ে আসবে কেন? আমার আশঙ্কা নাজমুলের সঙ্গে জঙ্গি সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।’

তবে পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এ ঘটনা জঙ্গি হামলা বলে মনে হচ্ছে না। ব্যক্তিগত পূর্বশত্রুতার কারণে পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হতে পারে। সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশও মনে করছে, এটি জঙ্গি হামলা নয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত