ইজতেমা শব্দের অর্থ সমবেত করা, সমাবেশ, সম্মেলন। ধর্মীয় কোনো কাজের জন্য অনেক মানুষকে একত্রিত করা। পরিভাষায় ইজতেমা বলা হয়, কোনো কাজের গুরুত্ব বোঝানো, কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ব্যাপকভাবে এর প্রচার-প্রসারের জন্য বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। তাবলিগ জামাতের সাথীরা নিজেদের কর্মতৎপরতা পর্যালোচনার জন্য, নিজের আমল-আখলাক ও জ্ঞানকে বাড়ানোর জন্য, বিভিন্ন স্থানে ও দেশে কীভাবে তাবলিগের কাজ পরিচালিত হয় তা জানার জন্য, নতুন সাথীদের কাজে অংশগ্রহণের জন্য নিজ নিজ জেলা অথবা মারকাজে সপ্তাহান্তে উপস্থিত হয়ে নিজেদের কর্মতৎপরতা পর্যালোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করেন। এরই বৃহৎ রূপ হলো বর্তমানের বিশ্ব ইজতেমা। আজ ফজরের নামাজের পর আম বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে বিশ্ব ইজতেমার আনুষ্ঠানিকতা। অবশ্য বুধবার বাদ জোহর থেকেই মাঠে খিত্তাওয়ারি বয়ান ও তালিম চলছে। অতীতের ধারাবাহিকতায় আজ ইজতেমা মাঠে স্মরণকালের বৃহৎ জুমার জামাত অনুষ্ঠিত হবে।
তাবলিগ মূলত প্রচারের কাজ। দ্বীনের দাওয়াত মুসলিম সমাজের ঘরে ঘরে পৌঁছানোই তাদের মূল লক্ষ্য। তবে তাবলিগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারের দিক দিয়ে তারা একেবারে প্রচারবিমুখ। নেতৃত্ব পর্যায়ের লোকদের তাবলিগের লোকেরা মুরব্বি বলে। পরামর্শমূলক প্রক্রিয়ায় চলে দাওয়াতে তাবলিগের কাজ। কে নেতা আর কে কর্মী, কার কী অবদান, কার গুরুত্ব কতখানি, কে আগে, কে পরে, কার নাম প্রকাশ পেয়েছে, কার নাম প্রকাশ পায়নি- এসব বিষয়ে তারা অনেকটাই নির্মোহ।
আধুনিককালের এই প্রচারসর্বস্বতার জোয়ারের মাঝেও তাদের এই অবস্থানটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এটা প্রতিষ্ঠালিপ্সা, খ্যাতি লিপ্সা ও প্রচারসর্বস্বতার বিরুদ্ধে একটি জোরালো প্রতিবাদও বটে। তাবলিগ জামাত যত দিন তাদের এই অবস্থানটি আন্তরিকভাবে ধরে রাখতে পারবে, ততদিন মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকবে। তাবলিগের মুরব্বিরা রেডিও-টিভিতে ইজতেমার কর্মসূচির কোনো ফুটেজ বা আখেরি মোনাজাত সরাসরি সম্প্রচারে অনুমতি দেন না। এমনকি মাঠের ভেতরে ক্যামেরা নিয়ে যাওয়া নিষেধ। তারপরও গণমাধ্যমগুলো যথেষ্ট আন্তরিকভাবেই ইজতেমার নিউজ কভার করে থাকে।
তাবলিগ শব্দের অর্থ পৌঁছে দেওয়া। ইসলামের দাওয়াত আপামর জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাবলিগের মূল লক্ষ্য। এটাকে তাবলিগের পরিভাষায় বলা হয়- নবীওয়ালা কাজ। আসলে নবী-রাসুলরা জগৎবাসীর কাছে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালার হুকুম, শাশ্বত জীবন বিধান পদ্ধতির বাণীসমূহ পৌঁছে দেওয়ার কাজই করে গেছেন যুগে যুগে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এ কাজের সফল পরিসমাপ্তি দিয়ে গেছেন। এ সম্পর্কে মানবতার নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে ইরশাদ করেন, ‘আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা দুটি জিনিস আঁকড়ে ধরবে, ততক্ষণ তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। একটি হলোÑ আল্লাহর কিতাব (কোরআন), অন্যটি আমার সুন্নত (হাদিস)। তাবলিগের সাথীরা কোরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী বাস্তবজীবন পরিচালিত করার দাওয়াত নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে যান। মানুষকে ইসলামি শরিয়া তথা কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের মাধ্যমে সঠিক আকিদায় পরিচালিত হওয়ার আহ্বান জানান।
সে হিসেবে বলা চলে, তাবলিগ জামাত নতুন কোনো মতাদর্শ নয়। এটা শুরু হয় সাধারণ মানুষের নৈমিত্তিক জীবনধারায় ধর্মের অনুশীলনকে সুচারুভাবে প্রতিফলিত করার লক্ষ্য নিয়ে। ইসলামের শিক্ষা শুধু বইপুস্তকে পড়া ও ওয়াজ-নসিহত শোনার মাধ্যমে নয়, বরং জীবনাচরণের ক্ষেত্রে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার একটি পদ্ধতিমাত্র। আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া এই দল ইসলামের দাওয়াত নিয়ে চলে যায় গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, দেশ থেকে দেশান্তরে। তারা মানুষকে দ্বীনের নসিহত শোনায় না, বরং তারা প্রতিমুহূর্তের জীবনাচরণে দ্বীনের চর্চা করে। শুধু বাহ্যিকভাবে নয়, পূর্ণ আন্তরিকতার সঙ্গে। তাদের লক্ষ্য থাকে আত্মসংশোধন ও আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি লাভ। অন্যকোনো লক্ষ্য এর মধ্যে সম্পৃক্ত হয় না- এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটাই তাবলিগ জামাতের মূল দর্শন। তাবলিগের সাথীরা তপস্যা, সাধনা ও ধ্যান করে কিছু বনে নতুন চেহারায় সমাজে এসে কিছু করেন না। তারা চেষ্টা করেন সমাজের ভেতরে থেকে কিছু অর্জন করতে। তাবলিগে তারা মানুষকে শেখাতে যান না, নিজেরা শিখতে যান
তাবলিগি সাথীরা নিত্যনৈমিত্তিক জীবনাচরণের ক্ষেত্রে কতগুলো চমৎকার বিষয় অনুশীলন করে থাকেন। সেগুলো শুধু আত্মিক নয়, সামাজিকও। সংক্ষিপ্ত পরিসরে এর বিশদ বিবরণ দেওয়া মুশকিল। তারপরও বলা যায়, আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্য মানুষের কল্যাণে মনকে আত্মনিবেদিত করে তোলা, শ্রদ্ধা ও বিনয়ের সঙ্গে মানুষের কাছে সত্যের দাওয়াত পৌঁছানো, পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে চলতে শেখা, নিজস্ব নেতৃত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে সুশৃঙ্খল জীবনযাপন ইত্যাদি অনুসরণীয় শিক্ষা। তাবলিগে যেতে হয় নিজের পয়সা নিয়ে, কোনো দান-খয়রাত গ্রহণ করার সুযোগ নেই। মনের ভেতরে অন্যের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার বাসনাকে অংকুরেই বিনাশ করে দেওয়া হয়। তাদের শেখানো হয়, ‘সওয়াল না করা, সওয়ালের বাহানা না করা।’ তাবলিগে যেকোনো ধরনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজ শুধু যে নিষিদ্ধ বলে করা হয় না, তা নয়। এখানে মনমানসিকতাটাই তৈরি করা হয় সেভাবে। এই যে নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহতায়ালার কাছে আত্মনিবেদন ও বিচরণ, এটা সমাজ জীবনের শান্তি প্রতিষ্ঠার এক মহান শিক্ষা। এ শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে পারলে মানবসমাজের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হবে তা অনেকটা জোর গলাতেই বলা যায়। বিশ্ব ইজতেমার প্রারম্ভে এমন প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। বিশ্ব ইজতেমা সফল হোক, তাবলিগ তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাক এই কামনা রইল।
লেখক : মুফতি ও ইসলাম বিষয়ক লেখক
