দেশ রূপান্তরকে ঢাকা উত্তরের দুই মেয়রপ্রার্থী

প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে মেয়র হতে চাই না

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২০, ০১:৫৪ এএম

পোশাকশিল্প ব্যবসায়ীদের নেতা আতিকুল ইসলামের ওপরই ঢাকা সিটি করপোরেশনের উত্তরের মেয়র পদের লড়াইয়ে আস্থা রেখেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। উত্তরের মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির উপনির্বাচনে মেয়র হন তিনি। নির্বাচন সামনে রেখে সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন আতিকুল ইসলাম। জানিয়েছেন, মাত্র নয় মাস নগরবাসীর সেবার সুযোগ পেয়ে এক দিনও বসে থাকেননি। আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখেও ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন। বলেছেন নগরবাসী তাকে ফের মেয়র নির্বাচিত করলে কী কী করতে চান সেসব কথা। বলেছেন, ১৩ বার বিজিএমইএ নেতা হয়েছেন ভোটের মাধ্যমেই। সেসব ভোট নিয়ে প্রশ্ন ছিল না। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে মেয়রও হতে চান না। সাক্ষাৎকারে দেশ রূপান্তরের বিভিন্ন প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দিয়েছেন আতিকুল ইসলাম

দেশ রূপান্তর : ২০১৪ সাল থেকে নির্বাচনগুলো কোনো না কোনো বিতর্কে জড়িয়ে সমালোচনা তৈরি করছে। এবার কেমন নির্বাচন হবে মনে করছেন?

আতিকুল ইসলাম : আমি কিন্তু বিজিএমইএতে ১৩টা নির্বাচন করেছি। সেখানে নির্বাচনের মতো নির্বাচন হয়েছে। আপনারা জানেন বিজিএমইএ নির্বাচন কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। আমি ১৩টাতে জিততে পেরেছি। নির্বাচনে জিতেই এই জায়গায় এসেছি। তাই আমি মনে করি নির্বাচনে অবশ্যই প্রতিপক্ষ থাকবে। ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন হবে। সবাই আসবে। যাকে খুশি তাকে ভোট দেবে। সেই প্রত্যাশাই করব। আমি মনে করি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সবাই চায়। আমি কোনো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে মেয়র হতে চাই না। 

দেশ রূপান্তর : নির্বাচিত হলে এবং কোন কাজটা করলে নিজেকে সফল মেয়র মনে করবেন?

আতিকুল : এটি অপরিকল্পিত ঢাকা। সুস্থ, সবল, গতিময় আধুনিক ঢাকা করতে পারলে আমি নিজেকে মেয়র হিসেবে সফল মনে করব। এজন্য গত নয় মাস মেয়রের দায়িত্বে থাকলেও আমি আসলে ওয়ার্মআপ করেছি। এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগামী ৫ বছর টেস্ট খেলব। নয় মাসে যে কাজগুলো করেছি এগুলো দিয়েই আমি মনে করি ৫ বছরের টেস্ট খেলতে পারব। 

দেশ রূপান্তর : নগরবাসী আপনাকে কেন ভোট দেবে?

আতিকুল : ঢাকার নাগরিকরা দেখেছেন গত নয়টি মাস আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরে চ্যালেঞ্জ যেগুলো ছিল তা বাস্তবায়নে এক দিনও বসে থাকিনি। সবাইকে নিয়ে কাজ করেছি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরে একটি চ্যালেঞ্জ এলো সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী আবরার মারা গেল। এর প্রতিবাদে ছাত্র আন্দোলন শুরু হলো। আমি ছাত্রদের সিটি করপোরেশনে নিয়ে এসে বুঝিয়েছি। তারা বলল, আমরা বিআরটিএ চেয়ারম্যানের সঙ্গে, পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে মিটিং করতে চাই। আমি সবাইকে নিয়ে একটি টেবিলে বসে মিটিং করেছি। তারপর তারা সেই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয়। সেটা শেষ করতে না করতেই গুলশানে আগুন। সেটা শেষ করতে না করতেই ডেঙ্গু মশা। সুতরাং চ্যালেঞ্জের সময় আমি ঘরে বসে থাকিনি। আমি বিজিএমইএর ফরমাল প্রেসিডেন্ট ছিলাম। আপনারা দেখেছেন যে ব্যবসা বাংলাদেশ থেকে চলে যাচ্ছিল সেই ব্যবসা ফিরিয়ে এনেছি। গার্মেন্টস শিল্পের কোনো শ্রমিক বেকার হয়নি। ২০১৩ সালের এপ্রিলে সাভারে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর গোটা দেশ যখন শোকে বিহ্বল, স্তম্ভিত, তখন বিজিএমইএ সভাপতি হিসেবে দিনের পর দিন আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম। আমি সবক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি। আমি মনে করি নগরবাসী সেটা বিবেচনা করবে। যে একটি দিনও বসে থাকিনি, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করেছি। তাই আমাকে ভোট দেবে।  

দেশ রূপান্তর : মশা মোকাবিলায় আপনার নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে?

আতিকুল : ঢাকা শহরের মশা এক দিন বা দুই দিনে হয়নি। মশা নিধনে যে সিস্টেম আছে তাও চলবে না, ঢেলে সাজাতে হবে। এজন্য মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে। সিটি করপোরেশন সনাতনী যে পদ্ধতিতে মশার ওষুধ দিচ্ছে তাতে কাজ হচ্ছে কি না তা তো এক মাস পরপর চেক করা হচ্ছে না। আমরা কি কোয়ালিটি কন্ট্রোল করতে পারছি? কোনো কিছুই করছি না। সিটি করপোরেশনে কোনো কীটতত্ত্ববিদও নেই। আমি দায়িত্ব ছেড়ে আসার আগে বলে এসেছি এখানে কীটতত্ত্ববিধ নিয়োগ করতে হবে। মশা নিধনে অবশ্যই একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে, জনগণকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। মেয়র হলে কীটতত্ত্ববিদ নিয়োগ দেব এবং তাদের সাজেশনে কাজ করব।

দেশ রূপান্তর : বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অতীতে দেখেছি সব মেয়র ব্যর্থ্য হয়েছেন। নির্বাচিত হলে সফল হবেন?

আতিকুল : বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অতীতে কেউ সফল হতে পারেনি বলে আমি পারব না কথাটা ঠিক নয়। কাউকে না কাউকে পারতে হবেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও আমাদের সনাতনী ব্যবস্থা রয়েছে। মূলত সুইপিং সিস্টেমে আমাদের রাস্তাঘাট ঝাড়ু দিতে হবে। সুইপিং করলে সুবিধা দুটো ময়লাও উঠে যায়, সঙ্গে সঙ্গে ধুলোও সাকিং পদ্ধতিতে উঠে যায়। আমরা অলরেডি দুটো সুইপিং মেশিন এনেছি। আগামী জুনের মধ্যে আরও ১২টি সুইপিং মেশিন যুক্ত হবে। আমিনবাজারের ল্যান্ডফিল্ডটাও আনহেলদি। ঢাকা সিটির কোথাও স্বাস্থ্যসম্মত ল্যান্ডফিল্ড নেই। ময়লা কালেক্ট করে সেই ময়লা সারকুলেট করে ভালো একটি ইকোনমি দাঁড় করানো সম্ভব। নেদারল্যান্ডসে ময়লার গাড়ি দেখেছি গোল্ড কালার। আমি জিজ্ঞেস করলাম গোল্ড কালার কেন? তারা বলল ময়লা তো আসলে গোল্ড। আর আমরা মনে করছি ময়লা আমাদের জন্য অভিশাপ। ময়লা কিন্তু অভিশাপ নয়। আমরা ঠিকমতো ম্যানেজ করতে পারলে এই ময়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারব।

দেশ রূপান্তর : ঢাকায় খেলার মাঠ সংকট। এই সংকট দূর করতে নতুন কোনো পদক্ষেপ নেবেন?

আতিকুল : আমরা টাউন প্ল্যানারদের সঙ্গে কথা বলছি কোথায় বাজার হবে, কোথায় স্কুল হবে, কোথায় খেলার মাঠ হবে এগুলো নিয়ে। যেসব নতুন ওয়ার্ড হয়েছে এবং আরও যেগুলো হবে সেগুলো এভাবেই সাজানো হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : ফুটপাত দখলমুক্ত করতে নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে?

আতিকুল : ফুটপাতে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা হচ্ছে। ফুটপাতের মধ্যে বছরের পর বছর অবৈধভাবে স্থায়ী-অস্থায়ী দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেরও অফিস করা হচ্ছে ফুটপাতে। ফুটপাতের মধ্যে ঘরবাড়ি উঠিয়েও ব্যবসা করছে কেউ কেউ। আছে পারমানেন্ট স্ট্রাকচারও। যারা এসব করছে তাদের আমার ম্যাসেজ হলো ফুটপাত দখলমুক্ত হবেই। কারণ ফুটপাত যত বেশি ক্লিন করব জনগণ তত বেশি ফুটপাত দিয়ে হাঁটবে। আমরা দেখছি বিভিন্ন ধরনের ফেরিওয়ালা এই ফুটপাতে বসে ব্যবসা করছে। দেখুন ফেরিওয়ালারাও কিন্তু আমাদের দেশের জনগণ। তারা আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা কলকাতার আদলে পরিকল্পনা নিয়েছি। সেখানে একটি ফুটপাতের নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দিষ্ট সময়ে হকারদের বসতে সিটি করপোরেশন থেকে কার্ড দেওয়া হয়। আমরা টেস্ট কেস হিসেবে সেরকম কিছু চালু করব। একটি ফুটপাতে একটি পরিবার চার ঘণ্টা বসতে পারবে। আমরা এ নিয়ে নগরবিদদের সঙ্গে কথা বলেছি; বলেছি কোন ফুটপাত বেশি চালু থাকে বের করতে। সেখানে হকাররা বসবে। কোনো চাঁদা দেওয়া লাগবে না। ফলে চার ঘণ্টায় যে আয় হবে তাতে ওই হকারের অনেক বেশি আয় হবে। মেয়র হিসেবে যেই আসুক না কেন, ফুটপাত আমাদের দখলমুক্ত রাখতে হবে জনগণের জন্য। আর হকারদের জন্য দুই-তিনটা রোড প্ল্যান করে কার্ড দিয়ে হকার বসাব।

দেশ রূপান্তর : সিটি করপোরেশন ভবনে ডিজিটাল হতে কতদিন লাগবে?

আতিকুল : ঢাকা সিটি করপোরেশনে ফেইস টু ফেইস গিয়ে কাউকে ট্যাক্স দিতে হবে না। সবাই একটি ডাটাবেজের মাধ্যমে ঘরে বসে সিটি ট্যাক্স দিতে পারবেন। প্রত্যেকটি এলাকার চার্ট দিয়ে দেব। সেই সিস্টেম আমরা তৈরি করে ফেলেছি। এটি ডিজিটাল পদ্ধতি।  

দেশ রূপান্তর : কাউন্সিলরদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণের কোনো উপায় বের করেছেন?

আতিকুল : দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা হয়েছে। আমি বলেছি, এক বছর পর আমি যেমন আমার আয়-ব্যয়ের হিসাব দেব, যারা কাউন্সিলর থাকবে তাদেরও হিসাব দিতে হবে। সিটি করপোরেশনের সব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকেই জবাবদিহির মাধ্যমে চলতে হবে। গডফাদার হওয়া যাবে না। 

দেশ রূপান্তর : প্রয়াত মেয়র আনিসুল হককে নিয়ে কিছু বলবেন?

আতিকুল : আনিস ভাইয়ের অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করতে চেষ্টা করছি। আপনারা জানেন ঢাকার ইউলুপগুলো তিনি শুরু করে গেছেন, আমি চালিয়ে যাচ্ছি। তার একটা কাজও বন্ধ হয়নি। তিনি যেগুলো বলেছেন, ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন সেগুলো আমাদেরও সমাপ্ত করার ইচ্ছে আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত