দেশ-বিদেশের লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লির ইবাদত-বন্দেগি, জিকির-আসকার আর ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনিতে গতকাল শনিবার মুখর ছিল কহর দরিয়াখ্যাত গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগপাড়ের ইজতেমা ময়দান। আজ রবিবার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। ইজতেমার মুরব্বি মেজবাহ উদ্দিন জানিয়েছেন, বেলা ১১টার দিকে আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হতে পারে। তাবলিগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় মুরব্বি কাকরাইল মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা জুবায়ের আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করবেন।
প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাত শেষে মুসল্লিরা ইজতেমা মাঠ ছেড়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে ১৭ জানুয়ারি। ১৯ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমার শেষ পর্ব। ২০১৪ সাল থেকে দুই পর্বে ইজতেমার আয়োজন শুরু হয়।
আয়োজকরা জানান, রাজধানীর কাকরাইল জামে মসজিদে প্রথম বিশ্ব ইজতেমা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে। এরপর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামে ও ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৬৬ সাল থেকে টঙ্গীর তুরাগতীরে ইজতেমার আয়োজন করা হচ্ছে। এবার হচ্ছে ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমা।
আখেরি মোনাজাত ও প্রস্তুতি : আয়োজকরা জানিয়েছেন, ইজতেমা ময়দানে বিদেশি নিবাসের পূর্ব পাশে স্থাপিত বিশেষ মঞ্চ থেকে আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করা হবে। এতে প্রায় ৩০ লাখ দেশি-বিদেশি মুসল্লি অংশ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মোনাজাতের আগে হেদায়াতি বয়ান অনুষ্ঠিত হবে।
আখেরি মোনাজাতে শরিক হতে এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক নারী টঙ্গীর আশপাশের এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন। অনেকে বিভিন্ন মসজিদ ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে উঠেছেন।
বয়ানে যা বলা হয় : গতকাল বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় দিনে দেশ-বিদেশ থেকে আসা মুরব্বিরা তাবলিগের ছয় ওছুলের মধ্যে দাওয়াতে দীনের মেহনতের ওপর গুরুত্বারোপ করে বয়ান করেন। তারা বলেন, দুনিয়া হচ্ছে ধোঁকার ঘর, এ দুনিয়া হচ্ছে ধোঁকার জীবন। মিছে এ দুনিয়ার আরাম-আয়েশের কথা ভুলে গিয়ে আখেরাতের কথা চিন্তা করুন। দুনিয়ার আমল ছাড়া আখেরাতে খালি হাতে যাওয়া যাবে না। আমাদের সবার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ইহলৌকিক ও পারলৌকিক শান্তির জন্য আমাদের দীনের পথে সময় লাগাতে হবে। ইসলামকে সঠিকভাবে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে।
বয়ান করেছেন যারা : গতকাল বাদ ফজর ভারতের মাওলানা আবদুর রহমান, বাদ জোহর ভারতের মাওলানা ঈসমাইল গোধরা, বাদ আসর ভারতের মাওলানা শায়খ জোহায়রুল হাসান ও বাদ মাগরিব ভারতের মাওলানা ইবরাহিম দেওলা বয়ান করেন। এ ছাড়া আলেম-ওলামাদের উদ্দেশে বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ইবরাহিম দেওলা, আরবের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ভারতের মাওলানা আকবর শরিফ ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বয়ান করেন ভারতের মাওলানা আহমদ লাট।
আরও পাঁচ মুসল্লির মৃত্যু : গত শুক্রবার বিকেল থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত ইজতেমায় আসা আরও পাঁচ মুসল্লি মারা গেছেন। এ নিয়ে এবারের ইজতেমায় ৯ মুসল্লির মৃত্যু হলো। ইজতেমা ময়দানে পুলিশ কন্ট্রোল রুমের মিডিয়া সেন্টারে দায়িত্বরত গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) উপকমিশনার মো. মনজুর রহমান জানান, শুক্রবার বিকেলে রাজশাহীর চারগাছ থানার বনকিশোর এলাকার আবদুর রাজ্জাক (৬৭) ও রাতে কুমিল্লার দেবীদ্বার থানার ডিমলা এলাকার তমিজ উদ্দিন (৬৫) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থানার বড়তোল্লা এলাকার মো. শাহজাহান (৬০) মৃত্যুবরণ করেন। গতকাল সকালে মারা গেছেন বরিশালের গৌরনদী থানার খালিজপুর এলাকার আলী আজগর (৭০) ও নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার দক্ষিণ কলাবাগান এলাকার মো. ইউসুফ আলী মেম্বার (৪৫)। বিভিন্ন অসুস্থতাজনিত কারণে তারা মারা গেছেন। ফজরের নামাজের পর তাদের মধ্যে দুজনের জানাজা হয়।
যৌতুকবিহীন ৯৬ বিয়ে : তিন বছর বন্ধ থাকার পর ইজতেমা মাঠে গতকাল বাদ আসর ৯৬ জোড়া বর-কনের যৌতুকবিহীন বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আয়োজক কমিটির সদস্য হাজি রেজাউল করিম জানান, পারস্পরিক সম্মতিতে বরেরা মূল বয়ান মঞ্চের সামনে উপস্থিত হন আর কনেরা নিজ গৃহে অবস্থান করেন। শরিয়ত মেনে তাবলিগের রেওয়াজ অনুযায়ী বিয়ে শেষে মুসল্লিদের মাঝে খুরমা খেজুর বিতরণ ও দোয়া করা হয়। এ ছাড়া সকালে ইজতেমা ময়দানের উত্তর-পশ্চিম পাশে বিদেশি মেহমানদের কামরায় কালেমা পড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন গাজীপুরের গাছা এলাকার রতন বসাক।
বিদেশি মুসল্লি : জিএমপির উপকমিশনার মনজুর রহমান জানান, গতকাল দুপুর পর্যন্ত বিশ্বের ৬৩টি দেশের ১ হাজার ৯২৩ জন মুসল্লি ইজতেমা ময়দানে এসে পৌঁছেছেন। আখেরি মোনাজাতের আগে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আয়োজকদের ধারণা।
খোলা আকাশের নিচে মুসল্লিরা : বৃহস্পতিবার বিকেলের আগেই ইজতেমা মাঠ লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লিতে পূর্ণ হয়ে যায়। এরপরও মাঠের দিকে ছুটছেন তারা। গতকাল বিকেলেও বাস, ট্রাক, ট্রেন, নৌকা, লঞ্চ, রিকশা-ভ্যানে করে মুসল্লিদের আসতে দেখা গেছে। এখন তারা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নিচ্ছেন। তুরাগ নদের পূর্ব ও পশ্চিমপাড়, মহাসড়কসহ টঙ্গী শহরের প্রতিটি অলিগলি এখন জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে।
অসুস্থ হয়ে পড়ছেন মুসল্লিরা : কনকনে শীতের প্রকোপে ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বিভিন্ন রোগে আক্রান্তরা ফ্রি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে ভিড় করছেন। এ ছাড়া রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে রান্না ও খাওয়াদাওয়া করায় অনেকে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
পুলিশি তৎপরতা : জিএমপি কমিশনার মো. আনোয়ার হোসেন জানান, আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে গতকাল দুপুর থেকে নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। প্যান্ডেলের ভেতর ও বাইরে মুসল্লিবেশে রয়েছেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। এ ছাড়া ইজতেমা ময়দানের সব প্রবেশপথে সিসিটিভি ক্যামেরা ও বিভিন্ন পয়েন্টে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দেওয়া লাখো মুসল্লি আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে ইজতেমাস্থলে আসেন। এ জন্য মুসল্লিদের চলাচলের সুবিধার জন্য আজ ভোর ৪টা থেকে টঙ্গীমুখী সব রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হবে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকামুখী গাড়িগুলো এ ছাড়া গাজীপুর চৌরাস্তা ও কোনাবাড়ি, ঢাকা বাইপাস সড়কের ভোগড়া, শাখা রোড বোর্ডবাজার, মীরেরবাজার থেকে আসা প্রতিটি সড়ক ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়া হবে। ঢাকার মহাখালী থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ময়মনসিংহমুখী যান চলাচলও বন্ধ থাকবে। মোনাজাতের পর মুসল্লিরা ময়দান থেকে যাওয়ার পর পুনরায় যানবাহন চলাচল উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
বিকল্প রাস্তা ও পার্কিং : ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে বিকল্প রাস্তা ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গাজীপুর জেলা তথ্য কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন জানান, ভিভিআইপি, ভিআইপি, পদস্থ কর্মকর্তাসহ দেশি-বিদেশি লাখো মুসল্লি আখেরি মোনাজাতে অংশ নেবেন। গাজীপুর চান্দনা চৌরাস্তা থেকে হাজার হাজার মুসল্লি হেঁটে ইজতেমা ময়দানে যাতায়াত করবেন বিধায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত রবিবার ভোর থেকে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া কালীগঞ্জ-টঙ্গী মহাসড়কের মাজুখান ব্রিজ থেকে স্টেশনরোড ওভারব্রিজ পর্যন্ত ও কামারপাড়া ব্রিজ থেকে মুন্নু টেক্সটাইল মিল গেট পর্যন্ত সড়কও বন্ধ থাকবে। গাজীপুর পুলিশ বিভাগ বিশ্ব ইজতেমার মুসল্লিদের সুবিধার্থে যান চলাচলের নির্ধারিত রুট ও পার্কিংয়ের নির্দেশনা দিয়েছে।
হাজার হাজার মৌসুমি ব্যবসায়ী : ইজতেমা ঘিরে আশপাশের এলাকায় হাজার হাজার মৌসুমি ব্যবসায়ী পসরা সাজিয়ে বসেছেন। টঙ্গীবাজার, হোন্ডা রোড, কামারপাড়া স্টেশন রোড, আবদুল্লাহপুর, সুøইসগেট এলাকায় হাজার হাজার দোকান বসিয়েছেন তারা।
আকাশছোঁয়া মূল্য : ইজতেমা ঘিরে টঙ্গীর বিশাল এলাকা পরিণত হয়েছে কাঁচাবাজারে। তবে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। মুসল্লিরা বাধ্য হয়েই বেশি দামে এসব জিনিসপত্র কিনছেন।
হারানো ও প্রাপ্তি : ইজতেমা মাঠের পশ্চিম পাশে হারানো ও প্রাপ্তি সেন্টার খোলা হয়েছে। ময়দানে কেউ কিছু হারালে ও কিছু পাওয়া গেলে সেখান থেকে তথ্য প্রদান করা হচ্ছে।
মোবাইল চার্জ ঘণ্টায় ২০ টাকা : ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের জন্য মোবাইল চার্জের একাধিক দোকান খোলা হয়েছে। সেখানে প্রতি ঘণ্টা ২০ টাকায় চার্জ দেওয়া যাচ্ছে। মুন্নু টেক্সটাইল মিলে স্থাপিত মোবাইল চার্জের দোকানি আনোয়ার হোসেন জানান, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে মুন্নু মিল মাঠে মোবাইল চার্জের দোকান দিয়েছি।
ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প : মুন্নু মিল মাঠে সিটি করপোরেশন, হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ, ইবনে সিনা, র্যাব, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, টঙ্গী ওষুধ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি, গ্রামীণফোন, ড্যাব, ইউনানি আয়ুর্বেদিক, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনসহ অর্ধশতাধিক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ফ্রি চিকিৎসা দিচ্ছে। ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের শেষ দিন পর্যন্ত এ সেবা চলবে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভগের কন্ট্রোল রুম জানিয়েছে, গতকাল দুপুর পর্যন্ত টঙ্গী আহসানউল্লাহ মাস্টার জেনারেল সরকারি হাসপাতাল ও পাঁচটি ক্যাম্পে প্রায় তিন হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি ও একজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
বিশেষ ট্রেন সার্ভিস : মুসল্লিদের সুবিধার্থে ১৯টি বিশেষ ট্রেন ও সব আন্তঃনগর ট্রেনের টঙ্গী স্টেশনে যাত্রাবিরতির ব্যবস্থা করেছে রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ।
