মামলার অভিযোগপত্র অনুমোদন

মিজান ব্যাগে ভরে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেন বাছিরকে

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২০, ০১:০৮ এএম

পুলিশের সাময়িক বরখাস্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের কাছ থেকে বাজারের ব্যাগে করে দুই দফায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক (সাময়িক বরখাস্ত) খন্দকার এনামুল বাছির। এর মধ্যে গত বছরের ১৫ জানুয়ারি নেন ২৫ লাখ টাকা ও ২৫ ফেব্রুয়ারি নেন ১৫ লাখ টাকা, যা অর্থপাচার আইন ও ১৯৪৭ সালের দুদক আইনে অপরাধ। ডিআইজি মিজান ও বাছিরের বিরুদ্ধে দুদকের করা মামলার অভিযোগপত্রে এসব কথা বলা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত করেন দুদক পরিচালকশেখ মো. ফানাফিল্যা। গতকাল রবিবার কমিশনের সভায় এ অভিযোগপত্র অনুমোদন দেওয়া হয়, যা শিগগিরই আদালতে দাখিল করা হবে। মিজান ও বাছির দুজনই দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মিজানুর রহমান গত বছরের ১৫ জানুয়ারি বাজারের একটি ব্যাগে করে কিছু বইসহ ২৫ লাখ টাকা বাছিরকে দেওয়ার জন্য এনেছেন মর্মে রমনা পার্কে পরস্পর আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে তারা রমনা পার্ক থেকে বেরিয়ে শাহজাহানপুরে বাছিরের কাছে টাকাসহ ব্যাগটি হস্তান্তর করেন। বাছির ব্যাগটি নিয়ে বাসার দিকে চলে যান। একইভাবে মিজান ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি শপিংব্যাগে ১৫ লাখ টাকা এনেছেন মর্মে রমনাপার্কে একত্রিত হয়ে আলোচনা করেন। তারা একত্রে পার্ক থেকে বেরিয়ে শান্তিনগর এলাকায় বাছিরের কাছে ১৫ লাখ টাকাসহ ব্যাগটি হস্তান্তর করেন। বাছির ব্যাগটি নিয়ে চলে যান। মিজানের দেহরক্ষী হৃদয় হাসান ও আর্দালি সাদ্দাম জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তারা মিজানকে টাকার ব্যাগ বাছিরের কাছে হস্তান্তর করতে দেখেছেন এবং পরস্পরের কথাবার্তা শুনেছেন। বিভিন্ন তারিখে তাদের কথোপকথন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাছির তার ছেলেকে কাকরাইলে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল থেকে আনা নেওয়ার জন্য মিজানের কাছে একটি গাড়ি দাবি করেছেন। বিষয়টি বাছির স্বীকার করে বিভাগীয় তদন্ত কমিটির কাছেও বক্তব্য দিয়েছেন। মিজান অবৈধ পন্থায় অর্জিত ৪০ লাখ টাকা অসৎ উদ্দেশ্যে বাছিরকে ঘুষ হিসেবে দিয়েছেন। বাছির সেটা গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে অবৈধ পন্থায় পাওয়া ৪০ লাখ টাকার অবস্থান গোপন করেছেন, যা দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা ও অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনেও অপরাধ।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘মিজান ও বাছির উভয়ে বেআইনিভাবে দুটি পৃথক সিম ব্যবহার করে একে অপারের সঙ্গে টেলিকমিউনিকেশনসহ খুদে বার্তা গ্রহণ ও প্রেরণ করেছেন মর্মে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এছাড়া ‘মিজান অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বাছিরের সঙ্গে ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত কথোপকথন সংরক্ষণ করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তদন্তকালে বিশেষজ্ঞ মতামত, প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের বক্তব্য, অডিও রেকর্ডে উভয়ের কথোপকথন ও পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি পর্যালোচনা করে প্রমাণিত হয় যে, অভিযোগের দায় থেকে বাঁচার জন্য মিজান অসৎ উদ্দেশ্যে উৎকোচ বা ঘুষ দিয়ে বাছিরকে প্রভাবিত করেছেন।

২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর ডিআইজি মিজানের অবৈধ সম্পদ অর্জন সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় বাছিরকে। অনুসন্ধান চলা অবস্থায় গত ৯ জুন ডিআইজি মিজান ওই অনুসন্ধান থেকে বাঁচতে এনামুল বাছিরকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেন বলে দেশ রূপান্তরসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর আসে। এর পরপরই দুদকের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি করা হয়। অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর গত ১৩ জুন পরিচালক ফানাফিল্যাহর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করে দুদক। গত ১৭ জুলাই ডিআইজি মিজান ও এনামুল বাছিরকে আসামি করে মামলা করে দুদক। গত ২২ জুলাই বাছিরকে গ্রেপ্তার করে দুদক। তার আগে ১ জুলাই হাইকোর্টে আগাম জামিন আবেদন করেন মিজান। হাইকোর্ট আবেদন নাকচ করে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। ২৫ জুলাই ডিআইজি মিজানকে সাময়িক বরখাস্তের প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রায় একই সময়ে বাছিরকেও সাময়িক বরখাস্ত করে দুদক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত