রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকের ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে কানাডায় পালিয়ে গেছেন জাহাজভাঙা শিল্পের ব্যবসায়ী গাজী বেলায়েত হোসেন মিঠু ওরফে জি বি হোসেন। বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ৩০০ কোটি টাকার এই ঋণ দেওয়া হয়েছিল ১২টি কোম্পানির নামে। এসব ঋণ নেওয়ার জন্য বেলায়েত বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও গুলশান শাখার তৎকালীন ম্যানেজারসহ কয়েক কর্মকর্তাকে বিশাল অঙ্কের ঘুষ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিস্তারিত তথ্য না দিতে পারলেও দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, এ জালিয়াতির নেপথ্যে কারিগর বেলায়েত। বাংলাদেশি ও কানাডীয় পাসপোর্টের অধিকারী বেলায়েতের বিরুদ্ধে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তিনি বিদেশে চলে যেতে সমর্থ হন। বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার এই কাহিনী কোনো থ্রিলার সিনেমার চিত্রনাট্য নয়; কিংবা বিতর্কিত ব্যবসায়ী বেলায়েতও এ ধরনের অপরাধের বড় কোনো উদাহরণ নন। নানারকম জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে লাখো-হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করার ভূরি ভূরি উদাহরণের মধ্যে বেলায়েত একটি নাম মাত্র।
২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি নামের চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসে। চারটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থাই এখন চরম খারাপ। একটি বিলুপ্তের পথে, বাকি তিনটিও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এই চার প্রতিষ্ঠান দখল করে নেওয়ার কারিগর প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদার। এসব ঘটনা ঘটানোর সময় পি কে হালদার প্রথমে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স এবং পরে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। এসব কাজে তাকে সব ধরনের সমর্থন ও সহায়তা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এই দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখের সামনেই সবকিছু ঘটেছে। তার বিদেশযাত্রায়ও নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তিনিও ঠিকই দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন। ২৭৫ কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সব মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন এই ব্যাংকার।
বিতর্কিত ব্যাবসায়ী জি বি হোসেন কিংবা বিতর্কিত ব্যাংকার পি কে হালদারের মতো জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের আরও অনেক উদাহরণই আছে দেশে। ক্রিসেন্ট গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও হলমার্ক গ্রুপের মতো বড় বড় শিল্পগ্রুপের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ খেলাপি ও ঋণ জালিয়াতির ঘটনাও সবার জানা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৬৯ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়া ঋণের মোট পরিমাণ এখন ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ২০০৯ সালের শুরুতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়ে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত প্রায় ১১ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫ গুণেরও বেশি। এর সঙ্গে অবলোপন করা ঋণ যোগ করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি। আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে আরও প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি ঘোষণা করা যাচ্ছে না। যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে, সবমিলিয়ে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা!
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, আমানতকারী ও রাষ্ট্রের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অনাদায়ী হওয়ার ঘটনা বহু আগেই বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। অপরাধের বিচার না হওয়ায় সবাই অনিয়মে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে এবং এমন জালিয়াতি একটি প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। প্রকৃতঅর্থে সরকারের পক্ষ থেকে এসব অপরাধ শক্ত হাতে দমন করার সময়ও আগেই পেরিয়ে গেছে। এখন জরুরি পদক্ষেপ না নিলে আর্থিক খাতকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে, যার পরিণতি হবে ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী, নন-পারফর্মিং লোন বা এনপিএল অনুপাত ২ শতাংশের নিচে রাখতে হয়, যা বাংলাদেশ কখনোই অর্জন করতে পারেনি। দেশে এখন এনপিএল অনুপাত ১২ শতাংশের মতো। বিশেষজ্ঞরা খেলাপি ঋণ আদায় ও আর্থিক খাতের দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া দুই দশক আগে থেকেই দাবি রয়েছে ঋণখেলাপি ট্রাইব্যুনাল গঠনের। দেশে ‘দেউলিয়া আইন ১৯৯৭’ এবং ‘অর্থঋণ আদালত আইন-২০০৩’ থাকলেও আইনের প্রয়োগ ও কার্যকারিতা নেই। আর্থিক খাতের দেউলিয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে অনাদায়ী ঋণ আদায় করা না গেলে অর্থনীতি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে তেমনি সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও আরও চাপে পড়বে।
