শেয়ারবাজারে নীতিনির্ধারণে জোর দিন

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২০, ১১:১৫ পিএম

২০১০ সালে ধসের পর এখন সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় শেয়ারবাজার।  কেবল গত এক বছরের ব্যবধানে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন কমেছে প্রায় লাখ কোটি টাকা।  শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংকটের নেপথ্যে সরকারের নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতাকে দায়ী করে আসছিলেন পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা। সেসব আলোচনা-সমালোচনা আমলে না নিয়ে নানা বাগাড়ম্বর চালিয়ে গেলেও বাজারের মোড় ফেরাতে পারেনি তারা। এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে যে, সরকারের নীতিনির্ধারণী ভুলেরই মাশুল দিচ্ছে পুঁজিবাজার। ২০১০ সালের বড় পতনের পর পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করতে নীতিনির্ধারকরা মিলে যেসব উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তার বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্তই এখন উল্টো ফল দিচ্ছে। এ কারণে লাগাতার পতন থেকে বাজার টেনে তোলা যাচ্ছে না। পুঁজিবাজারে ধসের সঙ্গে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিসহ অন্যান্য অনেক কার্যকারণ যুক্ত থাকে। কিন্তু বাজার পরিচালনায় নীতিনির্ধারণী ভুলের দায়িত্বহীনতা ও ব্যর্থতা ক্ষমা করা যায় না।    

শুক্রবার দেশ রূপান্তরে ‘ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল দিচ্ছে পুঁজিবাজার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে করণীয়সহ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে ‘পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা ও করণীয়’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন জমা দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।  এতে বাজার পতনের জন্য যে ১৬টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্তকে দায়ী করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে উঠে আসে, গত বছরখানেক ধরে ধারাবাহিকভাবে পড়তে থাকা বাজার টেনে তোলার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ৮-৯ বছর আগে নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা, টাকার অবমূল্যায়ন, টানা দরপতনের সঙ্গে ফোর্সড সেলের কারণে বাজারে ক্রেতাশূন্যতা দেখা দিয়েছে।  বাজারের এমন পড়তি সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার কথা থাকলেও উল্টো তারাও শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে।  এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকঋণে ৯ শতাংশ সুদহার কার্যকরের প্রভাব।  ব্যাংকের মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কায়ও এ খাতের শেয়ারের বিক্রির চাপ বেড়েছে।

পুঁজিবাজারের লাগাতার ধসের নেপথ্যে ভূমিকা রাখা নীতিনির্ধারণী ভুলগুলোকে চিহ্নিত করে সামনে নিয়ে আসা নিঃসন্দেহে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে, এই প্রতিবেদেনে বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ৩০ দফা সুপারিশও করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো স্থিতিশীলতা ফেরাতে প্রভিডেন্ট ও পেনশন ফান্ড রেগুলেটর গঠন করে এই দুই তহবিলের বিপুল অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা, গ্রামীণফোনের সঙ্গে বিটিআরসির কর-সংক্রান্ত জটিলতা দূর করা, ম্যানিপুলেশন ও ইনসাইডার ট্রেডিং বন্ধ করা, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূলধনের ২৫ শতাংশ বিনিয়োগ নিশ্চিত করা,  বীমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম ও লাইফ ফান্ডের একটি অংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা। এ ছাড়া পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করা ও উন্নয়নের সুপারিশের মধ্যে সরকারের বড় অবকাঠামো উন্নয়নে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের ব্যবস্থা জোরদারের কথাও বলা হয়েছে। এমতাবস্থায় এ কথা বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না যে, সবার আগে জরুরি অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সত্য স্বীকার করা এবং প্রয়োজনীয় ত্রুটিসমূহ সংশোধন করা।  তারপর যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে বাজারের উন্নয়নের সুপারিশগুলোর বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করতে হবে।   

সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরও বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে পুঁজিবাজারে।  দুই-তিন বছর ধরে যে ধারাবাহিক দরপতন চলছে তার অন্যতম মৌলিক কারণ হচ্ছে আমাদের চলতি হিসাবে ঘাটতি এবং ডলার বিক্রির মাধ্যমে মুদ্রাবাজার থেকে তারল্য প্রত্যাহার। ফলে ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট, গ্রামীণফোনের সঙ্গে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির দ্বন্দ্বের নেতিবাচক প্রভাবও বাজারে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে, এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে ব্যাংক খাত। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে।  পাশাপাশি ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণও অনেক বেড়ে গেছে।  কমেছে বেসরকারি ঋণের প্রবাহ। এমন এক পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের মতো উদ্বৃত্ত তারল্য নেই ব্যাংক খাতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের চরম আস্থাহীনতা। এসবও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ না আসার কারণ। সঙ্গে পুঁজিবাজারে সুশাসনের অভাব বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতাকে চরমে নিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে বলা হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সরকারি কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনা যায়নি। বেসরকারি খাতের ভালো কোম্পানিও বাজারে আসছে না ন্যায্যমূল্য, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার অভাবের কারণে। এ অবস্থায় স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও স্বাধীন পরিচালক পদে সৎ, যোগ্য ও দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগের মধ্য দিয়ে সুশাসন ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।  তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন পরিপালনের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে কারসাজিসহ যেকোনো ধরনের অপরাধের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে যাবে।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত