আ.লীগ-বিএনপির চেয়েও নেতা বেশি জাপায়

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২০, ০৩:১০ এএম

প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিতে (জাপা) পদের ছড়াছড়ি। দলের মধ্যে বিভেদ মেটাতে এবং প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে এরশাদ নিজেই পদের সংখ্যা বাড়ানোর সংস্কৃতি চালু করেন। চেয়ারম্যানের ক্ষমতাবলে তিনি নিজের ইচ্ছেমতো পদ সৃষ্টি করতেন এবং সে পদে নিজের ইচ্ছেমতো নেতা নিয়োগ দিতেন। এমনকি তার সময়ে পদ সৃষ্টি ও বিলুপ্তি এবং সে পদে নিয়োগ ও অব্যাহতির ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। এমনও হয়েছে, সন্ধ্যায় নিয়োগ দিয়ে মাঝরাতে ওই নেতাকে আবার অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

এই পদের ছড়াছড়ির কারণে জাতীয় সংসদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও মানেনি জাপা। দেশে সাধারণত দলীয় প্রধানই সংসদীয় দলের প্রধান হন। কিন্তু জীবদ্দশায় এরশাদ দলের প্রধান ছিলেন এবং তার স্ত্রী রওশন এরশাদকে সংসদীয় দলের প্রধান, অর্থাৎ বিরোধী দলের নেতা বানিয়েছেন। এরশাদের মৃত্যুর পর সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার পদ নিয়ে আবারও বিবাদ দেখা দেয়। রীতি অনুযায়ী দলের চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরের বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার কথা থাকলেও সে পদে বসানো হয় সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদকে। সর্বশেষ নবম কাউন্সিলের মাধ্যমে জিএম কাদের পুনরায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও এখনো সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা দলের আলংকারিক ‘চিফ পেট্রন’ পদধারী রওশন এরশাদই।

এ নিয়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ দলের সিনিয়র নেতারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, জাপায় যত পদ ও নেতা, দেশের সবচেয়ে বড় দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেও এত পদ ও নেতা নেই। এমনকি বিএনপিতেও এত পদ নেই।

এসব নেতা বলেন, চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতাবলে এরশাদ ইচ্ছেমতো পদের সংখ্যা বাড়িয়ে নেতাদের নিয়োগ দিতেন। এজন্য তিনি দলের শীর্ষনেতৃত্ব প্রেসিডিয়াম সদস্যদের সঙ্গেও আলোচনা করতেন না। সর্বশেষ ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে এরশাদ কো-চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করে ছোট ভাই জিএম কাদেরকে এ পদে নিয়োগ দেন। এতে ক্ষুব্ধ রওশন এরশাদকে শান্ত করতে তিন মাস পর তাকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করেন এরশাদ। গত ২৮ ডিসেম্বর নবম কাউন্সিলে এরশাদের পথ অনুসরণ করে রওশন এরশাদের জন্য আরেকটি আলংকারিক পদ ‘প্রধান পৃষ্ঠপোষক’ তৈরি করা হয়।

দলের নেতারা জানান, এরশাদের পদ বৃদ্ধির সংস্কৃতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। দলের মধ্যে দেবর-ভাবির পুরনো দ্বন্দ্ব নিরসনে এবং নিজের ক্ষমতা দেখাতে এরশাদের মৃত্যুর পর পদ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে নবম কাউন্সিল থেকে দলের মধ্যে পদের ছড়াছড়ি চলছে। ঠিক এই মুহূর্তে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের মোট পদ কতÑ তা জানেন না অনেক প্রেসিডিয়াম সদস্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রেসিডিয়াম সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, এরশাদ ও রওশন এরশাদ এবং এরশাদের মৃত্যুর পর জিএম কাদের ও রওশন এরশাদের দ্বন্দ্ব মেটাতেই দল ব্যস্ত। পদ বাড়ছে। নেতা বাড়ছে। কিন্তু দলীয় কাজ হচ্ছে না। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই মুহূর্তে দেশে যেকোনো রাজনৈতিক দলের চেয়ে জাপায় পদ ও নেতা বেশি। দলে বর্তমানে সভাপতিমণ্ডলীর পদ ৪১। এর মধ্যে নাম ঘোষণা করা হয়েছে ৩৭ জনের। অথচ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যের সংখ্যা ১৭। বিএনপিতে এই পদই নেই। এর সমান্তরাল স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা ১৯। জাতীয় পার্টিতে যুগ্ম মহাসচিবের সংখ্যাও ওই বড় দুই দলের চেয়ে বেশি। দলে এই সংখ্যা ১৬ জন। অথচ আওয়ামী লীগে ৪ জন ও বিএনপিতে মাত্র ৭ জন। দুই দলের কোনোটাতেই কো-চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত মহাসচিব পদ নেই। কিন্তু জাপায় কো-চেয়ারম্যান ৮ জন ও অতিরিক্ত মহাসচিব ৮ জন। এমনকি এই দলে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান পদও রয়েছে। রওশনপন্থিদের সামলাতে সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে রওশনপন্থি এক নেতাকে। এছাড়া বর্তমানে ভাইস চেয়ারম্যান ৪১ জন। এর মধ্যে নাম ঘোষণা করা হয়েছে ৩৭ জনের।

এসব বিষয়ে দলের অনেক শীর্ষ নেতা মুখ খোলেননি। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলে এখনো রওশন ও জিএম কাদের গ্রুপের দ্বন্দ্ব অব্যাহত রয়েছে। কোনো বিষয়ে কথা বলে কারও বিরাগভাজন হতে চান না তারা।

এ বিষয়ে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও যুব সংহতির সভাপতি আলমগীর সিকদার লোটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, জিএম কাদের ও রওশন এরশাদ আলোচনার মাধ্যমে সবকিছু করতে পারেন। সেটাই দলের জন্য মঙ্গলকর। তাদের দ্বন্দ্বের কারণে দলের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। লোকজন নানা কথাবার্তা বলেন। এসব শুনতে ভালো লাগে না।  এই নেতা আরও বলেন, এমনও নেতাদের বিভিন্ন শীর্ষ পদে বসানো হচ্ছে, যারা আদৌ রাজনীতি বোঝেন না। দলের জন্য কোনো অবদান নেই। এমনটা হলে দলত্যাগী নেতাকর্মী হারাবে।

এমন অবস্থার মধ্যে গতকাল দলের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের পার্টির নবম জাতীয় কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত এবং গঠনতন্ত্রের ধারা ১২ এর ৩ উপধারা মোতাবেক জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে আরও ৮ জন উপদেষ্টা, ৩৭ জন ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৪ জন যুগ্ম মহাসচিবের নাম ঘোষণা করেন। ইতিপূর্বে ৯ জন উপদেষ্টার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি ২০ জন উপদেষ্টার মধ্যে রয়েছেন অধ্যক্ষ রওশন আরা মান্নান এমপি (কুমিল্লা), একেএম মোস্তাফিজুর রহমান (কুড়িগ্রাম), মো. সেলিম উদ্দিন (সিলেট), অ্যাডভোকেট হাসান সিরাজ সুজা (মাগুরা), মো. নোমান (লক্ষ্মীপুর), মি. সোমনাথ দে (বাগেরহাট), এমএম নিয়াজ উদ্দিন (গাজীপুর), আশরাফ উদ দৌলা (কুড়িগ্রাম), এমএ কুদ্দুস খান (ঝালকাঠি), মাহমুদুর রহমান মাহমুদ (লক্ষ্মীপুর), অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা (বি.বাড়িয়া), মো. লুৎফর রহমান চৌধুরী (গাইবান্ধা), এমএ তালহা (নাটোর), দেলোয়ার হোসেন (দিনাজপুর), মো. নুরুল ইসলাম মিলন (কুমিল্লা), অ্যাডভোকেট গিয়াস উদ্দিন (সিলেট), অ্যাডভোকেট একরামুল হক (চাঁপাইনবাবগঞ্জ), সরদার শাহজাহান (পাবনা), মো. আতাউর রহমান সরকার (গাইবান্ধা) এবং মো. জহিরুল আলম রুবেল (ঢাকা)।

গতকাল কেন্দ্রীয় কমিটির ৪১ জন ভাইস চেয়ারম্যানের মধ্যে পার্টি চেয়ারম্যান ৩৭ জন ভাইস চেয়ারম্যান ও ১৬ জন যুগ্ম মহাসচিবের মধ্যে ১৪ জন যুগ্ম মহাসচিবের নাম ঘোষণা করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে এ কথাও বলা হয়, জাতীয় পার্টির ২৯৯ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যান্য পদে নিয়োগের জন্য পার্টি চেয়ারম্যান ২০ জানুয়ারি থেকে আগ্রহী প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করবেন।

পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি এরশাদ, জিএম কাদের ও রওশন এরশাদ পরিবারের সদস্যদের এসব পদে নিয়োগ দিয়েছেন। সর্বশেষ গত বুধবার স্ত্রী শেরিফা কাদেরকে উপদেষ্টা বানালেন জিএম কাদের। স্ত্রী ছাড়াও বোন ও ভাগ্নিকে উপদেষ্টা পদে জায়গা দিয়েছেন। এর পাল্টা রওশন এরশাদ ছেলে সাদ এরশাদকে কো-চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দিয়েছেন। অথচ গতকাল সেই সাদ এরশাদকেই যুগ্ম মহাসচিব করে ১৪ যুগ্ম মহাসচিবের নাম ঘোষণা করেছেন জিএম কাদের।

এসব পদের বাইরে গত বুধবার রওশন এরশাদ আরও ১৬ নেতাকে বিভিন্ন পদে পদোন্নতি দেন। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রওশন এরশাদ বলেছেন, সম্মেলনে অর্পিত দায়িত্ব ও প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সংগঠনের কার্যক্রম গতিশীল করার স্বার্থে এই পদায়ন করা হলো। সেখানে রওশন এরশাদ তার ছেলে রাহগির আল মাহি সাদ এরশাদ ও দলের পুরনো নেতা এমএ ছাত্তারকে কো-চেয়ারম্যান করেন। এছাড়া ১১ জনকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ প্রেসিডিয়ামে অন্তর্ভুক্ত করেন। তবে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের কার্যালয়ে বিবৃতিতে এ পদোন্নতিকে বিভ্রান্তিকর আখ্যা দিয়ে তা প্রচার না করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। এর আগে গত ২৮ ডিসেম্বর জাপার কেন্দ্রীয় সম্মেলনের পর ৮ জন কো-চেয়ারম্যান ও ৩৭ জন প্রেসিডিয়াম সদস্যের নাম ঘোষণা করা হয়। তাতে রওশনের তালিকায় থাকা নেতাদের নাম ছিল না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত