রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের গাজীরঘাটে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে একটি অনুমোদনহীন ডোলার (কিচেন র্যাক) কারখানা। কারখানাটির বড় বড় চুলায় দিনরাত পুড়ছে গ্যাস। আগুনের তাপে লোহা গলিয়ে তৈরি হচ্ছে বাসাবাড়িতে ব্যবহারের জন্য ডোলা। কারখানাটিতে কর্মরত শ্রমিকরা জানান, অননুমোদিত এই কারখানায় দিনরাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০ ঘণ্টাই কাজ চলে। দীর্ঘ এই সময়ে যত গ্যাস পোড়ানো হয় তার সবই আসে তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে। তবে শুধুমাত্র এই একটি কারখানাই নয়, এ রকম দুই শতাধিক অননুমোদিত ডোলার কারখানা রয়েছে কামরাঙ্গীরচরজুড়ে। যার সবকটিতেই অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে প্রতিদিন মূল্যবান রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সম্পদ গ্যাস পোড়ানো হচ্ছে বলে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই গড়ে ওঠা অননুমোদিত কারখানাগুলো বিশেষ কম্প্রেসার সিস্টেম ব্যবহার করে বাসাবাড়ির বৈধ লাইনে থাকা গ্যাসও টেনে নিচ্ছে নিজেদের সরবরাহ লাইনে। এতে করে তিতাসের বৈধ সংযোগ রয়েছে এমন বাসাবাড়িতে গ্যাস পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি থেকে বাঁচতে রান্নার কাজে লাকড়ি, কেরোসিন চুলা ও এলপি গ্যাস এখন প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে কামরাঙ্গীরচরবাসীর। তিতাসের গ্যাস না পেলেও ঠিকই বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডোলার কারখানা ছাড়াও কামরাঙ্গীরচরে ব্যাটারি তৈরির কারখানা এবং বিস্কুট-রুটির বেকারিসহ চারশোর বেশি অননুমোদিত কারখানা রয়েছে। যার প্রতিটিতে রয়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। এই অবৈধ গ্যাস সংযোগকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কয়েক নেতা, পুলিশ ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সমন্বয়ে বড় একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে এলাকাবাসীর ভাষ্য। আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারাও দেশ রূপান্তরের জিজ্ঞাসায় বিষয়টি স্বীকার করে পরস্পরের ওপর দোষ চাপিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে প্রথম গ্যাস সংযোগ পান কামরাঙ্গীরচরবাসী। এরপর দীর্ঘ ২২ বছরে এলাকায় জনসংখ্যা, বাসাবড়ি ও কলকারখানা বাড়লেও নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ রয়েছে। সরকার ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ রেখেছে তিতাস গ্যাস কর্র্তৃপক্ষ। এ পরিস্থিতিতে সংযোগ না পেয়ে আবাসিক ভবনে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করেছেন বাসিন্দারা। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই এলাকার যত্রতত্র গড়ে ওঠা চারশোর বেশি কারখানায় ঠিকই মিলেছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। এর মধ্যে কামরাঙ্গীরচরের নয়াগাঁও এলাকায় পলাশ, ছোটলাল মিয়া, হাবীব, ভাগিনা মনির, মোস্তাক, জুয়েল, কালাম, রফিক, টিপু, সবুজ, আকরাম, আনোয়ার, আইয়ুব আলী, বেলায়েত, দুলাল, ফারুক, জয়নাল, মহিউদ্দিন, নান্টু, পারভেজ, রাকীব, রুবেল, সাগর, শফিক ও আজীমের ডোলার কারখানা রয়েছে। এছাড়া রক্সি মাঠ সংলগ্ন এলাকায় তাহের, তারেক এবং নার্সারি গলিতে মিলন, কালাম ও টিপুর কারখানা রয়েছে। এর বাইরে খোলামোড়া ঘাট, ঝাউলাহাটি, গাজীরঘাট ও আলীনগর এলাকায়ও রয়েছে ছোট-বড় বেশ কিছু ডোলার কারখানা। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব কারখানা বিশেষ কম্প্রেসার সিস্টেম ব্যবহার করে বাসাবাড়ির বৈধ লাইনে থাকা গ্যাস টেনে নিচ্ছে তাদের অবৈধ সরবরাহ লাইনে। এতে একই সময়ে কারখানার চুলায় গ্যাস মিললেও বাসাবাড়ির চুলায় গ্যাস থাকে না। ফলে কামরাঙ্গীরচরবাসীর ভোগান্তি এখন চরমে উঠেছে।
অননুমোদিত কারখানায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিতে গড়ে ওঠা চক্রের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৫ ও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের যোগসাজশ আছে বলে এলাকাবাসীর ভাষ্য। এমনকি তিতাস গ্যাসের ঠিকাদারও এই কাজে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নুরে আলমের প্রভাব খাটিয়ে তার ভাগিনা পরিচয়ে শাকিল ও মাসুদ নামে দুই ব্যক্তি অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেন। এজন্য প্রতি মাসে কারখানাগুলো থেকে নির্দিষ্ট হারে টাকা আদায় করেন তারা। তবে মাসুদ ও শাকিল নামে তার কোনো ভাগিনা নেই বলে দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেছেন কাউন্সিলর নুরে আলম। গ্যাসের অবৈধ সংযোগের সঙ্গে তার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও এই কাউন্সিলরের ভাষ্য। অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে কারখানা থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধেও। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার নিজের বাসায়ই গ্যাস পাই না। আপনি চাইলে দেখতে পারেন। কামরাঙ্গীরচরে যাই হোক, সবাই আমার নামে দোষ দেন। পুলিশ ও কয়েকজন নেতা আছে তারা এই বিষয়টি দেখেন।’
অবৈধ গ্যাস সংযোগ ব্যবহারকারী বেশ কয়েকজন কারখানা মালিকও পুলিশকে চাঁদা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। আমিনুল ইসলাম নামে এক কারখানা মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার বাণিজ্যিক লাইন দিচ্ছে না। এতে বাধ্য হয়ে অবৈধ সংযোগে কারখানা চালাচ্ছি। এমনিতে ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়। তার ওপর পুলিশ, অমুক নেতা, তমুক নেতাকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে। এতে আমাদের লাভের চেয়ে ক্ষতিই হচ্ছে বেশি।’
তিতাস গ্যাসের ঠিকাদার মুজিবুল হক রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কামরাঙ্গীরচরের গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ এখন ঠিকাদারের হাতে নেই। রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ মিলে বিষয়টি দেখে। পুলিশের লোকজন টাকা খেয়ে এসব ঠিক রাখে।’
অবৈধ গ্যাস সংযোগে পুলিশের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কামরাঙ্গীরচর থানার ওসি মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কামরাঙ্গীরচর একটি অপরাধপ্রবণ এলাকা। পুলিশের কাজ গ্যাসের লাইন দেখভাল করা নয়। এটা তিতাসের কাজ। তিতাস গ্যাস কর্র্তৃপক্ষ লাইন বন্ধ করলে আমরা কী করতে পারি?। আমি চাই এসব সংযোগ বন্ধ হোক।’
কামরাঙ্গীরচর এলাকাটি তিতাসের মেট্রো ঢাকা বিপণন বিভাগ-৫-এর অধীনে পড়েছে। অবৈধ গ্যাস সংযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিভাগটির উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী অশোক কুমার গোলদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এ পর্যন্ত ৬ বার অভিযান চালিয়েছি। আমি নিজেই গিয়েছিলাম সেখানে। আমাদের কাছে তথ্য আছে, লাইন কাটার পর পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতারা সেগুলো আবার ঠিক করে দেয়। খুব দ্রুত আমরা আবারও অভিযান পরিচালনা করব। তবে পুলিশ যদি সহযোগিতা না করে তাহলে এটা টেকসই হবে না।’
