এসইসির দৌড়ঝাঁপে ঘুরছে সূচক

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২০, ০১:৫৪ এএম

ক্রেতাসংকটে পড়ে পুঁজিবাজারে বড় দরপতন হচ্ছে। বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির চাপ, মার্জিন ঋণে কেনা শেয়ারের ফোর্সড সেল ও স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তায় পুঁজিবাজার যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে। লাখ লাখ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে বাজার ত্যাগ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। নিজেদের সামর্থ্যরে মধ্যে থাকা বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পরও বাজারে কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে না। উল্টো নিয়মিত বড় ধরনের পতনে বিব্রত অবস্থায় রয়েছেন কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। চলতি বছরের মাত্র ১২ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটির প্রায় ৭ শতাংশ পতন হয়েছে।

বাজারের অব্যাহত পতন ঠেকাতে অর্থমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, শীর্ষস্থানীয়  ব্রোকার ও স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদের সঙ্গে বারবার বৈঠক করেও কোনো সুফল পায়নি এসইসি। সবশেষে বাজারে ক্রেতা আনতে প্রধানমন্ত্রীর দারস্থ হয়েছেন কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। পুঁজিবাজারের উন্নয়নের জন্য সরকারের সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস পেয়েছে এসইসি। ২০১০ সালের ধসের পর ২০১১ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বাজারের পতন ঠেকাতে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করে বর্তমান কমিশন। এতে সাময়িক স্থিতিশীলতা এলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজারের মন্দাবস্থা রয়েই গেছে। যদিও এ সময়ে বাজারের প্রভাব রাখা ব্যাংক, মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে সব ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৮ সাল থেকেই পুঁজিবাজারে মন্দা চলছে। মূলত ব্যাংকব্যবস্থায় তারল্য সংকটের প্রভাবে পুঁজিবাজারে পতনের ধারা তৈরি হয়। বিদেশিদের পাশাপাশি স্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সে সময় শেয়ার বিক্রি করে চাপ তৈরি করে। এতে অধিকাংশ শেয়ারের দর কমে গিয়ে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটি ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পয়েন্ট হারায়। পরের বছর একই ধারার পতনে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটি ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারায়। টানা দুই বছরের পতনে পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ভীতসন্ত্রস্ত বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই পুঁজি হারিয়ে বাজার ত্যাগ করেন। আর বাজারে থেকে যাওয়া বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশা করছিলেন, নতুন বছর ২০২০ সালে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ও এক অঙ্কের সুদহারকে কেন্দ্র করে আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি হয়। যার প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। গ্রামীণফোনের সঙ্গে সরকারের বিবাদের বড় প্রভাবও পড়ে। একই সময়ে ফ্রন্টিয়ার মার্কেটের কিছু ফান্ড অবসায়নের কারণে বিদেশিদের একটি অংশ বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে বাজার থেকে। এসব কারণেই মন্দাবাজার আরও তলানিতে ঠেকছে।

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিংয়ের অবসায়নও বড় ধরনের ধাক্কা দেয় পুঁজিবাজারকে। পরিচালকদের বেনামি ঋণ, অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অনিয়মে পুরো এনবিএফআই খাতে অস্থিরতা দেখা দেয়। আমানতকারীরা এসব প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত ফেরত নেওয়ার চাপ দিতে থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে কিছু এনবিএফআই পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। ফলে পুঁজিবাজারে বিক্রিচাপ আরও বাড়ে। বিভিন্ন জায়গা থেকে শেয়ারের বিক্রিচাপ এলেও পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকায় ধারাবাহিক দরপতনের কবলে পড়ে বাজার। সূচক ফিরে যায় সাড়ে চার বছর আগের অবস্থানে।    

বাজারের এমন নাজুক পরিস্থিতিতে সব উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দারস্থ হয়েছেন এসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন। ১৬ জানুয়ারির ওই বৈঠকে পুঁজিবাজারকে বিকশিত করার লক্ষ্যে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে মতামত দেয় এসইসি। স্বল্পমেয়াদি কিছু সিদ্ধান্তের মধ্যে পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, মার্চেন্ট ব্যাংক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণসুবিধার বিষয়টি বিবেচনা, আইসিবির বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়ানো এবং মানসম্মত আইপিও বৃদ্ধির জন্য বহুজাতিক ও সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে এসইসি। এর আগে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিক বৈঠকেও এসব বিষয় কার্যকরে এসইসি ও অন্যান্য অংশীদার মতামত দিয়েছিলেন। কিন্তু তা বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। অবশ্য এবার প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন এসইসির মতামত বাস্তবায়নে। এর ফলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

গত সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রথম তিন দিনই বাজারে পতন দেখা দেয়। তবে পরবর্তী দুদিন সরকারি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের খবরে বাজার পরিস্থিতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এতে সপ্তাহ শেষে সূচকের বড় পতন ঠেকানো গেছে। গত সপ্তাহ শেষে ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৭৭ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটি ৪৭ পয়েন্ট কমে ৪১৪৯ পয়েন্টে নেমে আসে। আগের সপ্তাহে এ সূচকটি কমেছিল ২৬২ পয়েন্ট। সূচক পতনের পাশাপাশি গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনও কমে যায় ১৬ শতাংশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত