বিশ্বের অভিজাত ব্যক্তিত্বদের প্ল্যাটফর্ম টেডে নিজের অভিজ্ঞতা ও স্বপ্নের কথা জানালেন রূপায়ণ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান-২ মাহির আলী খাঁন রাতুল। গতকাল রাজধানীর রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে ‘টেডএক্স গুলশান’ শিরোনামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উদ্ভাবনী আবাসন ব্যবসার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য দেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম টেড বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের নিয়ে এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করে। সেখানে তারা বক্তা হিসেবে অংশ নিয়ে নিজের কর্মজীবনে বিভিন্ন বাধা টপকে শীর্ষে ওঠার গল্প তুলে ধরেন। জানান ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের কথা। তাদের কথা শুনে অনুপ্রাণিত হন বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষ, স্বপ্ন দেখেন শত বাধা ডিঙে বড় হওয়ার, মহৎ হওয়ার। বলিউডের নায়ক শাহরুখ খান, হলিউডের নায়ক আরনল্ড শোয়ার্জনেগার, হলিউডের ফিল্মমেকার মর্গান স্পাউরলক, তিন বছরেই বিলিয়নিয়ার বনে যাওয়া ডেনিয়েল এলাইসহ বিশ্বের নামকরা ব্যক্তিত্বরা এই প্ল্যাটফর্মে বক্তব্য দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ‘টেডএক্স’ নামে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করে, যেখানে ওই দেশে নানা খাতে প্রতিষ্ঠিতদের বক্তা হিসেবে বেছে নেয়। গতকাল আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পোপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও মাহির আলী খাঁন রাতুল ছাড়াও অক্সফোর্ড স্কলার ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি ববি হাজ্জাজ, ইউএন গ্লোবাল কম্প্যাক্ট বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ তামজিদ উর রহমান, বলিউড তারকা মোহাম্মদ আলী শাহ, কাজী আইটি সেন্টারের সিইও জারা মাহবুব, ক্যানসারবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হক, সহজের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিহা এম কাদের, টেন মিনিট স্কুলের সিইও আয়মান সাদিক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস অব এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক ড. ক্যাথেরাইন লি, রহিমআফরোজ বাংলাদেশ লিমিটেডের গ্রুপ পরিচালক নিয়াজ রহিম, বিবি প্রোডাকশনস ফ্যাশনের প্রতিষ্ঠাতা বিবি রাসেল, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআইয়ের পলিসি অ্যাডভাইজার আনির চৌধুরী ও ইনচানটেড ইভেন্টস অ্যান্ড প্রিন্টসের প্রতিষ্ঠাতা সুসান খান মঈন স্পিকার হিসেবে বক্তব্য দেন। এ সময় টেডএক্স গুলশানের প্রেসিডেন্ট আশফাক জামান উপস্থিত ছিলেন।
মাহির আলী খাঁন রাতুল বলেন, ‘আমি এমন আবাসন নিয়ে একটি বিষয় তুলে ধরতে চাই, যা আমাদের কাছে খুব বেশি পরিচিত নয়। আবাসন কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সহমর্মিতার বন্ধন স্থাপন করছে।’
‘১৫ বছর বয়সে আমি আমার বাবার কোম্পানিতে কাজ শুরু করি। মূলধারার আবাসন ব্যবসার মডেল আমাকে কখনই টানতে পারেনি। এই ব্যবসার সঙ্গে নৈতিকতার বিষয় সম্পৃক্ত। জমির মালিকরা বেশি দাম হাঁকান, ডেভেলপাররা দেয়ালের ওপর খোল তৈরি করে তথাকথিত “হোম” নির্মাণে গুরুত্ব দেন। আমি আমার কর্মযাত্রায় কখনো এ ধরনের কোনো চিন্তা করার কথা ভাবিনি।’ যোগ করেন তিনি।
রাতুল বলেন, ‘আমরা যখন আবাসন বা রিয়েল এস্টেটের কথা বলি, তখন আমাদের সামনে অ্যাপার্টমেন্টের ছবি ভাসে, যেখানে একটি পরিবার বাস করে বা আমরা বিলাসবহুল, গুরুত্বপূর্ণ লোকেশন ও সহজ যাতায়াতের কথা ভাবি। এটা আমার কাছে এমন যে আমরা বাংলাদেশে বসে হলিউডের সিনেমা দেখছি। কিন্তু বাস্তবে আমাদের রয়েছে ঢালিউডের সিনেমা।’
তিনি আরও বলেন, আর্থিক কারণ ও সামাজিক মর্যাদায় মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করার কারণে আবাসন বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
রাতুল বলেন, মানুষ তার জীবনের প্রায় পুরো সঞ্চয়ই আবাসনে বিনিয়োগ করে। এটিই তার শেষ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। বৃদ্ধ বয়সে যখন কাজ করার মতো শক্তি থাকে না, তখন হয় সে তার বাড়ি ভাড়া দিয়ে টাকা আয়ের মাধ্যমে বাকি জীবন কাটানোর চিন্তা করে, না হয় সে নিজে বসবাস করে ভাড়ার টাকা সাশ্রয় করে। দুর্ভাগ্যবশত যখন তার শেষ সম্বলটি অন্যরা ‘দখল’ করে নেয়, তখন তার আত্মহত্যার কথা শুনতে হয় আমাদের।
তিনি জানান, আবাসন বাংলাদেশের সমাজ রূপান্তরে বড় ভূমিকা রাখছে। একুশ শতকে যখন আমাদের জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার থাকার কথা, তখন বাংলাদেশে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিয়ের ঘটনা ঘটছে, যা রাজধানী ঢাকাতেও হচ্ছে। আমরা উত্তরায় একটি প্রকল্প করছি। সেখানে অনেক ভূমি মালিকের ক্ষেত্রে দেখেছি যে তারাও পারিবারিক বিয়ে করেছেন।
মাহির বলেন, বেশির ভাগ বিয়েই হচ্ছে পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও সহযোগীদের মধ্যে। ছেলেমেয়েরা ছোট থাকতেই তাদের অভিভাবকরা ‘চুক্তি’ করে রাখছেন যে তাদের সন্তানদের মধ্যে ভবিষ্যতে বিয়ে হবে। এ ধরনের বিষয় ভবিষ্যতে বহুবিবাহ বাড়াতে ভূমিকা রাখে। কারণ, অশিক্ষিত ও সুবিধাবঞ্চিত এসব জনগোষ্ঠী নিজেদের ওই বিয়ের কথা গোপন রাখে। তারা গোপন বিয়ের মাধ্যমে তৃতীয় পক্ষের কাছে জমি বিক্রি করে দ্বিগুণ অর্থ হাতিয়ে নেয়। পরে তারা আবার তাদের উত্তরসূরিদের মাধ্যমে জমি ফেরত দাবি করে। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, জমির পূর্ণ মালিকানা পেতে তখন উত্তরসূরিকে আবারও টাকা দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তাই স্থাবর সম্পত্তির ওপর সামাজিক মর্যাদা ও বিয়ের যোগ্যতা নির্ভর করে। তাদের কাছে শিক্ষা বা শিক্ষিত মানুষের কোনো মূল্য নেই।
‘আমার মনে একটি প্রশ্ন জাগে, সরকার শিক্ষায় এত ভর্তুকি দেওয়ার পরও শিশুরা কেন শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে, বিশেষ করে গ্রামের শিশুরা। একবার “আপন নিবাসে” গিয়ে দেখি সবাই নারী। কিছু গবেষণার পর জানতে পারি, দেশের বেশির ভাগ বৃদ্ধাশ্রমেই নারী বেশি। হয় আর্থিক সংকটে তাদের ছেলেরা তাদের ফেলে দিয়েছে, না হয় তাদের দায়িত্ব কেউই নিতে চায়নি। জমি ভাড়া নিয়ে যে নারী বৃদ্ধাশ্রমটি পরিচালনা করছিলেন, তাকে জমির মালিক তা ছেড়ে দিতে বলেছেন। তার অসহায় কথা শুনে মনে হয়েছে, তাদের জন্য আল্লাহ হয়তো কিছু করবেন।’ যোগ করেন রাতুল।
এসব সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এ জন্য এ খাতে নারী ও যুবদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি। এ খাতে এখন যুবাদের অংশগ্রহণ ২ শতাংশের কম, নারী রয়েছেন ১ শতাংশেরও কম। তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সম্ভাবনাময়দের বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণসহ প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময় করা হবে। যুব ও নারীদের কাছে আমাদের গল্প পৌঁছাতে টেড ও টেডএক্স ব্যবহার করব।’
তিনি বলেন, এই শিল্পের আরও রূপান্তর দরকার, প্রয়োজন ভিন্ন ধরন ও প্রবণতা। উদ্ভাবন, লিঙ্গবৈচিত্র্য ও যুবদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে পুরনো জঞ্জাল দূর করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় এখনই। উদ্ভাবনী বিপ্লবে আরও বেশি যুবা দরকার এ খাতে।
