৪৮ বছর আগে ব্যবসার কাজে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার হাবিবুর রহমান। তখন তার বয়স ছিল ৩০ বছর। ঘরে স্ত্রী ও চার সন্তান। কিন্তু সেই যে তিনি গিয়েছিলেন, এরপর গত প্রায় চার যুগেও আর তার খোঁজ মেলেনি। হাবিবুরের পথ চেয়ে চেয়ে প্রায় ২০ বছর আগে মারা গেছেন তার স্ত্রী জয়গুন নেছা। তবে হাবিবুরের অবর্তমানে চার সন্তানকে যথাসাধ্য মানুষ করেছেন জয়গুন নেছা। তাদের চার ছেলের দুজন দেশে এবং দুজন বর্তমানে সপরিবারে যুক্তরাজ্য প্রবাসী। হাবিবুরের ছেলেরা ইতিমধ্যে বিয়ে করেছেন, আছে নাতি-নাতনিও। হাবিবুরের ছেলে, নাতি-নাতনি, এমনকি নাতবউও তার হারিয়ে যাওয়ার গল্প বারবার শুনেছেন। আর মনে মনে অপেক্ষা করেন হয়তো একদিন তিনি ফিরে আসবেন। অবশেষে অভাবনীয়ভাবে তাদের পরিবারে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এনে দিয়েছে ফেইসবুক। ফেইসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া একটি ভিডিও ক্লিপের সূত্রে হাবিবুর রহমানকে ফিরে পেয়েছে তার স্বজনরা। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাবিবুর রহমান এখন ছেলে-নাতি, নাতনির কোলে ফিরেছেন।
হাবিবুর রহমানের ছেলে জালাল উদ্দিন (৫০) জানান, বিয়ানীবাজারের মাথিউরার বেজগ্রামে তাদের বাড়ি। ১৯৭২ সালে তার বাবা হাবিবুর রহমান ব্যবসার কাজে চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। হাবিবুর রহমানের বেশ জমিজমা ছিল। স্বামীর রেখে যাওয়া সেই সম্পদ দিয়েই চার ছেলেকে বড় করেছেন জয়গুন নেছা। জালাল উদ্দিন জানান, তার মা জয়গুন নেছা ২০০০ সালে মারা গেছেন। জালাল উদ্দিন ও তার বড় ভাই সাহাব উদ্দিন (৬০) দেশেই থাকেন। তাদের অপর দুই ভাই মাহতাব উদ্দিন (৫৮) ও আলীম উদ্দিন (৪৮) সপরিবারে যুক্তরাজ্যে থাকেন। সাহাব উদ্দিনের বড় ছেলে তাহির হোসেনও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে যুক্তরাজ্যে থাকেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে হাবিবুর রহমানের নাতি তাহির হোসেনের স্ত্রী ফেইসবুকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক বৃদ্ধের ভিডিও দেখতে পান। বিষয়টি তিনি স্বামীকে জানিয়ে বাংলাদেশে পরিবারের স্বজনদের কাছে ভিডিওটি পাঠান। সেই ভিডিওর সূত্র ধরে জালাল উদ্দিন গত শুক্রবার সকালে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। সেখানে ওই বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলেন। কথা বলে জালাল উদ্দিন নিশ্চিত হন, এই বৃদ্ধ ব্যক্তিই তার হারিয়ে যাওয়া বাবা হাবিবুর রহমান। এরপর হাসপাতালে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। জালাল উদ্দিন আরও জানান, তার বাবা জানিয়েছেন তিনি চট্টগ্রামে গিয়ে অসুস্থ হয়ে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। স্ত্রী জয়গুন নেছার নাম ছাড়া আর কোনো কিছুই তার মনে ছিল না।
জালাল উদ্দিন আরও জানান, তার বাবা হাবিবুর রহমানকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করান রাজিয়া বেগম (৫০) নামে এক নারী। ওই নারী তাদের জানিয়েছেন, হাবিবুর রহমান প্রায় ১২ বছর ধরে মৌলভীবাজারের শাহাবুদ্দিন মাজার এলাকায় বসবাস করতেন। মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হাবিবুরকে দেখাশোনা করতেন রাজিয়া বেগম। সম্প্রতি হাবিবুর গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে তিনি ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে আসেন। হাসপাতালে হাবিবুরের পাশের শয্যায়ই ছিলেন বিয়ানীবাজারের আরেক রোগী। তারা হাবিবুরের নিঃসঙ্গ জীবনের কথা শুনে একটি ভিডিও রেকর্ড করে তা ফেইসবুকে দেন। এরপরই অনেকটা সিনেমার কাহিনীর মতো হাবিবুর ফিরে পেয়েছেন তার স্বজনদের।
