সরকারি চাকরির কোটা পদ্ধতিতে আবারও সংস্কার আনা হচ্ছে। অষ্টম গ্রেডের শূন্যপদে জনবল নিয়োগ মেধার ভিত্তিতে নাকি পুরাতন কোটার ভিত্তিতে হবে সেই সিদ্ধান্ত হবে মন্ত্রিসভা বৈঠকে। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি আজ সোমবার অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভা বৈঠকের এজেন্ডায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে এ বৈঠক হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি শাখার যুগ্ম সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অষ্টম গ্রেডের কোটা পদ্ধতি সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব আমরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছি।’
প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির শূন্যপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি বাতিল করার ১৫ মাস পর এ সংস্কার আনা হচ্ছে। শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির কোটা পদ্ধতি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রিসভা। তার এক দিন পর সরকারি চাকরির কোটা
পদ্ধতি বাতিল করার পরিপত্র জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরিপত্র অনুযায়ী নবম গ্রেড (আগের প্রথম শ্রেণি) এবং দশম থেকে ১৩তম গ্রেডে (আগের দ্বিতীয় শ্রেণি) মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ করা হবে।
সরকারি চাকরিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের ২০টি স্কেল। আগে সরকারি চাকরিতে শ্রেণির ভিত্তিতে হলেও ২০১৫ সালের পে-স্কেলের পর গ্রেডের ভিত্তিতে মর্যাদা নির্ধারিত হয়। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) আওতায় বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যাডার কর্মকর্তারা নবম গ্রেডে চাকরিতে যোগদান করেন। আর নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা দশম থেকে নিম্নতম বিভিন্ন গ্রেডে যোগদান করেন।
ক্যাডার কর্মকর্তারা নবম গ্রেডে যোগদান করে পদোন্নতির মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে প্রথম গ্রেডে উন্নীত হতে পারেন। কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কিছু কারিগরি পদ রয়েছে। এসব পদগুলো শুরুই হয় অষ্টম গ্রেড থেকে। ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর মন্ত্রিসভা দুটি সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথম সিদ্ধান্তটি ছিল নবম গ্রেড (পূর্বতন প্রথম শ্রেণি) এবং দশম থেকে ১৩তম গ্রেডের (পূর্বতন দ্বিতীয় শ্রেণি) পদে সরসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ করা হবে। দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি ছিল এসব গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি বাতিল করার।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৮ সালে তাড়াহুড়ো করে মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। সেই সময় নবম গ্রেড বা তার পরের গ্রেডগুলো বিবেচনায় ছিল। কিন্তু অষ্টম গ্রেডেও যে সরাসরি নিয়োগ হয় তা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম। ওই সময় ভুল করে আমরা নবম গ্রেড বা প্রথম শ্রেণি এবং দশম থেকে ত্রয়োদশ গ্রেড বা দ্বিতীয় শ্রেণির পদগুলোর কোটা বিলুপ্তির প্রস্তাব দিয়েছিলাম। নবম গ্রেডের স্থলে অষ্টম গ্রেডের কথা বলা হলেই আজ নতুন করে কোনো সংস্কার প্রস্তাব আনতে হতো না।
পাবলিক সার্ভিস কমিশনের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরি থেকে কোটা তুলে দেওয়ার পাঁচ মাস পর আমরা অষ্টম গ্রেডের সমস্যার কথা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানাই। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিষয়টি মন্ত্রিসভায় তুলতে প্রায় এক বছর সময় নিল। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি পরিবর্তন সরকারের নীতিনির্ধারণী বিষয়। ১৯৯৬ সালের রুলস অব বিসনেস অনুযায়ী যেকোনো নীতি গ্রহণ বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভার অনুমোদন গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে কোটা ব্যবস্থা চালু হয়। ২০১৮ সালে এ কোটা পদ্ধতি সংস্কার করার আগে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৫৫ শতাংশ নিয়োগ হতো অগ্রাধিকার কোটায়। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটায়, ১০ শতাংশ মহিলা, ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ১০ শতাংশ জেলা কোটা। বাকি ৪৫ শতাংশ নিয়োগের বিধান ছিল মেধায়।
তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতেও কোটা পদ্ধতি রয়েছে। তবে সরকার এ ক্ষেত্রে কোনো সংস্কার আনেনি। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে মেধাবীদের কোনো স্থানই নেই। কারণ শতভাগ নিয়োগ হয় বিভিন্ন কোটায়। এই শ্রেণির চাকরিতে অনাথ ও প্রতিবন্ধী কোটা ১০ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা ৩০, মহিলা ১৫, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫, আনসার ও ভিডিপি সদস্য ১০ এবং জেলা কোটা ৩০ শতাংশ।
প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির কোটা পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ^বিদ্যালয়ে আন্দোলন হয়। কিছুদিন বিরতি দিয়ে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তা শেষ পরিণতি পায়। তাদের দাবির মুখেই ওই বছর ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের মাঠে ফিরে আসে। একপর্যায়ে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনা, সংস্থার বা বাতিলের সুপারিশ করার জন্য সচিব কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি তাদের প্রতিবেদনে কোটা বাতিলের বিষয়ে বিভিন্ন যুক্তি-প্রমাণ তুলে ধরে। এ কমিটির সুপারিশ অনুমোদন করে কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রিসভাস
