মোনেমের শক্ত হাতে পোক্ত কাঠামো

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২০, ১২:৪৭ এএম

বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে সবচেয়ে বড় ভূমিকা আবদুল মোনেম লিমিটেডের। ১৯৫৬ সালে গড়ে ওঠা কোম্পানিটির কর্ণধার আবদুল মোনেম এর হাতে নির্মিত হয়েছে দেশের বড় বড় অবকাঠামো, ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন নানা খাতে। উন্নয়নের পথে তার যাত্রাকালের বিবরণ তুলে ধরেছেন আলমগীর হোসেন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজেশ্বরের কিশোর আবদুল মোনেম যখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তার হাতে আসে নগদ ৭০ টাকা। ওই টাকা নিয়েই গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। সিদ্ধান্ত নেন, জীবনে যা-ই করি না কেন, সেরাটাই করব, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে করব। যাদের সততা ও নিষ্ঠা নেই, তারা সফল হতে পারেন না। এমন ভাবনার মধ্যেই সরকারের একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে সেকশন অফিসারের চাকরি নেন মোনেম। পরে তা ছেড়ে দেন তিনি, নিজেই শুরু করেন নির্মাণ ব্যবসা।

১৯৫৬ সালে আবদুল মোনেম এএমএল সিভিল কনস্ট্রাকশন কোম্পানি গঠন করেন। নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা ও যথাসময়ে সরবরাহে শুরু থেকেই সুনাম অর্জন করে কোম্পানিটি। শুরুতে তার ব্যবসার কোনো চলতি মূলধন ছিল না। তবে সেরাটা করার স্বপ্ন, সঙ্গে সততা ও নিষ্ঠাই তাকে মূলধনের সংকট উতড়াতে সাহায্য করেছে। জীবনের এই অমূল্য পূঁজির ওপর ভর করে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প গ্রুপে পরিণত হয়েছে ৬০ বছর আগে মোনেমের শক্ত হাতে শুরু হওয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি। গত কয়েক দশক ধরে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন কাজে সামনে থেকে ভূমিকা রেখেছে গ্রুপটি। পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, বিভিন্ন সেতু নির্মাণ, জয়দেবপুর-এলেঙ্গা মহাসড়ক চারলেনে উন্নীতকরণসহ দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে পথপ্রদর্শক তিনি।   

দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে আবদুল মোনেম গ্রুপ। বর্তমানে পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া নির্মাণ, জয়দেবপুর-এলেঙ্গা মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত করার মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে গ্রুপটি। এছাড়া, ৪৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে খুলনা-মোংলা হাইওয়ে নির্মাণ, ৪২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ভাটিয়াপাড়া-গোপালগঞ্জ-মোল্লাহাট সড়ক, গড়াই সেতু, মাওনা সেতু, গুলশান-বনানী সেতু, বনানী ফ্লাইওভার, লালন সেতুর এপ্রোচ সড়কসহ অসংখ্য অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করেছে আবদুল মোনেম কনস্ট্রাকশন। 

দেশি কোম্পানি হিসেবে বাড়তি সুবিধা হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা ঠিকাদারদের সঙ্গে পাল্লা করে অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে তারা। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে খুলনা-মোংলা হাইওয়ে প্রজেক্ট, পদ্মা বহুমুখী সেতু এপ্রোচ সড়ক পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সার্ভিস এরিয়া-২ নির্মাণের কাজ পান আবদুল মোনেম।

কেবল রাস্তাঘাট ও সেতু নির্মাণই নয়, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উন্নয়ন, ত্রিবেণী নামে পরিচিত ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে এসএম বারাক অ্যান্ড দামাল কোট নির্মাণ, গাবতলী, মহাখালী ও সায়দাবাস বাস টার্মিনাল নির্মাণ করেছে আবদুল মোনেম কনস্ট্রাকশন।

পর্যায়ক্রমে তার ব্যবসা সম্প্রসারিত হতে থাকে। কোকা-কোলা, ফানটা, স্প্রাইট, ইগলু চিনি, আইসক্রিম, ইগলু মিল্ক, ডেইরি, পরিবেশবান্ধব পাউরুটি, আর্থিক সেবা, আইটি সার্ভিস, এনার্জি। পর্যায়ক্রমে এএমএল মাল্টি ডিসিপ্লিনারি বিজনেস গ্রুপে রূপ নেয়। ১৯৬৪ থেকে ইগলু আইসক্রিম যাত্রা শুরু করে। ১৯৮২ থেকে এএম বেভারেজ, ২০০৪ থেকে ইগলু ডেইরি লিমিটেড, ২০০৬ থেকে ইগলু সুগার, ২০১১ থেকে এএম অটো ব্রিকস স্থাপন করে আবদুল মোনেম গ্রুপ।

যাত্রা শুরুর পর থেকে এএমএল কনস্ট্রাকশন গত ছয় দশক ধরে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা ও আইডিবির মতো বড় সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ইগলু আইসক্রিম ইউনিট প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই দেশের মানুষের মন জয় করে নেয়। এএম বেভারেজ ইউনিটের অধীন এএমএল কোকা-কোলা ব্র্যান্ডের কোকা-কোলা, ফান্টা ও স্প্রাইট বোতলজাত করে আসছে। আইসক্রিমের পাশাপাশি দুগ্ধজাত ও খাদ্যপণ্যে বাজারের চাহিদা পূরণে যাত্রা শুরু করে ইগলু ডেইরি ও ইগলু ফুডস লিমিটেড। এএমএলের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ইগলু ফুডস লিমিটেড হিমায়িত খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বিতরণ করে আসছে। ড্যানিশ বাংলা ইমালশন লিমিটেড (ডিবিইএল) আবদুল মোনেম ও ডেনমার্কের ইএনএইচ ইঞ্জিনিয়ারিং এ/এসের একটি যৌথ উদ্যোগ। সড়ক ও বিমান ঘাঁটি পথ নির্মাণে স্বয়ংক্রিয় ও অত্যাধুনিক উপায়ে বিটুমিন ইমালশান উৎপাদন করছে ডিবিইএল। মেঘনা নদীর তীরে ১ দশমিক ৭৩ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এএম এনার্জি লিমিটেড। আবদুল মোনেমের আরেকটি ব্যবসায়িক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে নোভাস ফার্মাসিউটিক্যালস। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে পরিবেশবান্ধব ইট তৈরি করতে রয়েছে এএম অটো ব্রিকস। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার চরবাউশিয়ায় আবদুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশের প্রথম বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল।

বেসরকারি খাতে শিল্প স্থাপন, পণ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে আবদুল মোনেম লিমেটেড (এএমএল)। এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি ‘রাষ্ট্রপতি শিল্প উন্নয়ন পুরস্কার ২০১৪’ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সম্প্রতি ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মোনেম ও উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এস এম মহিউদ্দীন মোনেমের হাতে এ পুরস্কার তুলে দেন। এ বছর বৃহৎ শিল্প বিভাগ ও হাইটেক বিভাগে পুরস্কার অর্জন করে আবদুল মোনেম।

‘টাচিং লাইভস, বিল্ডিং ক্যাপাবিলিটিস’-এ স্লোগান নিয়ে দেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সফলভাবে চালিয়ে যাচ্ছে কোম্পানিটি। ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দেশ ও সমাজের জন্য বিভিন্ন সেবামূলক কাজও করছে তারা।

দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে নেতৃত্ব দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৫৭ সালে এএমএল কনস্ট্রাকশন দিয়ে যাত্রা শুরু করে এ গ্রুপ। তার পর থেকে একে একে গড়ে তোলা হয় বিভিন্ন শিল্পকারখানা। সফলভাবে ব্যবসায়ী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক গ্রুপে পরিণত হয়েছে কোম্পানিটি। বর্তমানে এ গ্রুপে ১০ হাজার দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। এএমএল কনস্ট্রাকশন আবদুল মোনেম গ্রুপের সবচেয়ে বড় অঙ্গপ্রতিষ্ঠান।

যাত্রা শুরুর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে স্থাপন করা হয় আলাদা শিল্প ইউনিট। এর মধ্যে ১৯৮২ সালে আইসক্রিম ইউনিট, একই বছরে বেভারেজ ইউনিট, ২০০০ সালে ম্যাঙ্গো পাম্প প্রসেসিং, ২০০৪ সালে ইগলু ফুডস, ড্যানিস বাংলা ইমালশন, সিকিউরিটি ও ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইগলু ডেইরি প্রোডাক্টস, ২০০৭ সালে সুগার রিফাইনারি ও এম এনার্জি, ২০০৮ সালে নোভাস ফার্মাসিউটিক্যালস, ২০১০ সালে এ এম অ্যাসফল্ট অ্যান্ড রেডিমিক্স, ২০১২ সালে এএম অটো ব্রিকস, ২০১৪ সালে এএম ব্র্যান্ড অয়েল কোম্পানি এবং ২০১৫ সালে আবদুল মোনেম ইকোনমিক অঞ্চল নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয় কোম্পানির চেয়ারম্যান ও এমডি মো. আবদুল মোনেমের নেতৃত্বে।

চেয়ারম্যান জানান, এএমএল কনস্ট্রাকশন গত ৫৬ বছরে বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো বড় ও সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ইগলু আইসক্রিম ইউনিট প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই দেশের মানুষের মন জয় করে নেয়। এএম বেভারেজ ইউনিটের অধীন এএমএল কোকা-কোলা ব্র্যান্ডের কোকা-কোলা, ফান্টা ও স্প্রাইট বোতলজাত করে আসছে।

ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর-১ মঈনউদ্দিন মোনেম জানান, আইসক্রিমের পাশাপাশি দুগ্ধজাত ও খাদ্যপণ্যে বাজারের চাহিদা পূরণে যাত্রা শুরু করে ইগলু ডেইরি ও ইগলু ফুডস লিমিটেড। এএমএলের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ইগলু ফুডস লিমিটেড হিমায়িত খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বিতরণ করে আসছে। ড্যানিশ বাংলা ইমালশান লিমিটেড (ডিবিইএল) আবদুল মোনেম ও ডেনমার্কের ইএনএইচ ইঞ্জিনিয়ারিং এ/এসের একটি যৌথ উদ্যোগ। সড়ক ও বিমান ঘাঁটি পথ নির্মাণে স্বয়ংক্রিয় ও অত্যাধুনিক উপায়ে বিটুমিন ইমালশান উৎপাদন করছে ডিবিইএল। ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর-২ মহিউদ্দিন মোনেম বলেন, প্রতি বছর দেশে প্রায় ১.২ মিলিয়ন টন চিনির প্রয়োজন। এ চিনির বেশিরভাগই পরিশোধ করছে আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেড (এএমএসআরএল)। এটি দেশের একমাত্র সুগার রিফাইনারি, যা আইএসও ২২০০০-২০০৫ সনদ পেয়েছে।

মেঘনা নদীর তীরে ১.৭৩ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এএম এনার্জি লিমিটেড। আবদুল মোনেমের আরেকটি ব্যবসায়িক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে নোভাস ফার্মাসিউটিক্যালস। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে পরিবেশবান্ধব ইট তৈরি করতে রয়েছে এএম অটো ব্রিকস। সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার চরবাউশিয়ায় আবদুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত