লালদীঘি হত্যাকান্ডে ৫ পুলিশের মৃত্যুদন্ড

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২০, ০২:৩১ এএম

৩২ বছর আগে ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভার আগে গুলি চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। দণ্ডিতরা সবাই পুলিশের সদস্য ছিলেন। গতকাল সোমবার বিকেল ৩টায় বিভাগীয় বিশেষ জজের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ ইসমাইল হোসেন চার আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন।

দণ্ডিতরা হলেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালি থানার তৎকালীন প্যাট্রল ইন্সপেক্টর গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল (জেসি মণ্ডল), সাবেক কনস্টেবল মোস্তাফিজুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, মো. আবদুল্লাহ এবং মমতাজউদ্দিন। তাদের মধ্যে প্রথমজন পলাতক।

‘চট্টগ্রাম গণহত্যা’ নামে পরিচিত এ ঘটনার চার বছর পর ১৯৯২ সালে আইনজীবী শহীদুল হুদা আদালতে চট্টগ্রামের সাবেক পুলিশ কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদাসহ ৪৬ জনকে আসামি করে মামলা করেন। অভিযোগপত্রভুক্ত আট আসামির মধ্যে মীর্জা রকিবুল হুদাসহ তিনজন এরই মধ্যে মারা গেছেন।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি লালদীঘি ময়দানে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গুলি চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যা ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় হওয়া মামলায় আদালত পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারায় প্রত্যেকের আরও ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

তিনি জানান, ওইদিন সমাবেশে যাওয়ার পথে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালালে ২৪ জন নিহত এবং আহত হন দুই শতাধিক মানুষ। বিচারক ঘটনাটিকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের এই কৌঁসুলি আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর হলেও মামলার রায়ে আমি সন্তুষ্ট। এতদিনের পরিশ্রমের ফসল এটি। আজ রায় ঘোষণার পর ভালো লাগছে কারণ এই রায়ের সঙ্গে ৩২ বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা নিহত ২৪ জনের পরিবারের আবেগ জড়িত রয়েছে।’

মামলার অন্যতম সাক্ষী ও প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবী শম্ভুনাথ নন্দী বলেন, ‘ঘটনার দিন সে সময়ের বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা আসছেন শুনে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। তাকে বহনকারী ট্রাক যখন এগিয়ে আসছিল তখন ওয়্যারলেস সেটে তৎকালীন সিএমপি কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদার নির্দেশে পুলিশ ট্রাক লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। খুনিদের লক্ষ্য ছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ রায়ের মাধ্যমে আমরা কলঙ্কমুক্ত হলাম।’

গতকাল দুপুর ২টার আগে কড়া পুলিশি নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে চার আসামিকে আদালতে আনা হয়। রায় ঘোষণার পর তাদের প্রিজনভ্যানে তোলা হয় ৩টা ৪০ মিনিটে। আসামিদের আদালতে নিয়ে আসা এক পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কারাগার থেকে নিয়ে আসার সময় চার আসামির কেউ কারও সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। প্রিজনভ্যান থেকে নামার সময় খুব তাড়াহুড়ো করে নামতে চেয়েছেন। তবে রায় ঘোষণার সময় তাদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।’

সেদিন যা ঘটেছিল : আদালতে সাক্ষীদের দেওয়া জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে লালদীঘি ময়দানে ছিল আওয়ামী লীগের জনসভা। জনসভায় যোগ দিতে ঢাকা থেকে এসেছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। বিমানবন্দর থেকে ট্রাকে চড়ে তিনি নেতাকর্মীর বহর নিয়ে সভাস্থলে যাওয়ার পথে কোতোয়ালি মোড়ের কাছে এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে পুলিশ। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন নেতাকর্মীরা। অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। এ সময় চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী ও দলীয় নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনার চারপাশে মানববেষ্টনী তৈরি করে আদালত ভবনে নিয়ে গিয়ে তার প্রাণ রক্ষা করেন। সেদিন পুলিশের গুলিতে মারা যান ২৪ জন। কিন্তু তাদের কারও লাশ ফেরত পায়নি পরিবার। সবাইকে ওই রাতে বলুয়ারদীঘিপাড় শ্মশানে পুলিশ পাহারায় পুড়িয়ে ফেলা হয়।

সেদিন যারা প্রাণ হারান : সেদিন গুলিতে নিহত ২৪ জন হলেন মোহাম্মদ হাসান মুরাদ, সীতাকুণ্ড থানা ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন শামীম, ছাত্রনেতা স্বপন কুমার বিশ্বাস, এথেলবার্ট কিশোর গোমেজ, স্বপন চৌধুরী, অজিত সরকার, ক্ষেতমজুর নেতা রমেশ বৈদ্য, বদরুল আলম, হোটেল শ্রমিক জিকে চৌধুরী, ছাত্রলীগ নেতা সাজ্জাদ হোসেন, আবদুল মান্নান, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন, বিকে দাশ, পঙ্কজ বৈদ্য, বাহারউদ্দিন, চান্দ মিয়া, সমর দত্ত, হাসেম মিয়া, মোহাম্মদ কাশেম, পলাশ দত্ত, আবদুল কুদ্দুস, গোবিন্দ দাশ ও শাহাদাত হোসেন।

মামলা শেষ হতে লাগল ৩২ বছর : এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯২ সালের ৫ মার্চ এ ঘটনায় তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রকিবুল হুদাসহ ৪৬ জনকে আসামি করে আদালতে মামলা করেন আইনজীবী শহীদুল হুদা। কিন্তু তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে মামলাটির কোনো অগ্রগতি হয়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মামলাটি আবারও গতি পায়। আদালতের নির্দেশে সিআইডি মামলাটির তদন্ত করে এবং ১৯৯৭ সালের ১২ জানুয়ারি প্রথম দফায় চার্জশিট দেয়। পরে আদালত আরও অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিলে ১৯৯৮ সালের ৩ নভেম্বর দ্বিতীয় দফা চার্জশিট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির তৎকালীন এএসপি এমএ কাদের। চার্জশিটে সিএমপির সাবেক কমিশনার রকিবুল হুদাসহ আটজনকে আসামি করা হয়। সাক্ষী রাখা হয় ১৬৮ জনকে। কিন্তু সাক্ষ্যগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলার বিচারকাজ বিলম্বিত হয়। এর মধ্যে সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনসহ ৫৩ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন। ঘটনার দিন সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা তিনজন সাংবাদিকও এ মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দেন। তারা হলেন দৈনিক আজাদীর তৎকালীন সাংবাদিক হেলালউদ্দিন চৌধুরী, দৈনিক সংবাদের অঞ্জন কুমার সেন ও দৈনিক খবরের কামরুল ইসলাম। গত ১৪ জানুয়ারি অ্যাডভোকেট শম্ভুনাথ বিশ্বাসের সাক্ষীর মধ্য দিয়ে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।

দুদিন বয়সে বাবাকে হারিয়েছি, কেউ মনে রাখেনি : ‘রায়ে খুব খুশি হলাম। যদিও আপনার (প্রতিবেদক) কাছে শুনলাম রায় ঘোষণার বিষয়ে। লালদীঘি গণহত্যার দিনটির ৩২ বছর পূর্ণ হতে তিন দিন বাকি। আরও আগে (রায়) কার্যকর হলে আমার মা অন্তত দেখে যেত পারত। কিছুটা শান্তি পেত মারা যাওয়ার আগে’ গতকাল এ মামলার রায় ঘোষণার পর দেশ রূপান্তরকে এসব কথা বলেন লালদীঘিতে পুলিশের গুলিতে নিহত এথেলবার্ট কিশোর গোমেজের মেয়ে পাপড়ি গোমেজ।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘আমি তো বাবাকে দেখিনি। দুদিন বয়সে বাবাকে হারিয়েছি। মায়ের মুখে শুনেছি বাবা কেমন ছিল। শুনেছি বাবা চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে শেখ হাসিনাকে দেখতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে। মা নেই, ২০০৬ সালে মারা গিয়েছে।’

পাপড়ি মোবাইল ফোনে আরও বলেন, ‘আমার জন্ম বরিশালে। তখনকার যোগাযোগ ব্যবস্থা এত দ্রুত ছিল না। তাই আমার জন্মের সংবাদও বাবা পাননি। আমাকেও দেখতে পাননি। আমি ২২ তারিখ জন্মগ্রহণ করেছি, বাবাকে হারিয়েছি ২৪ জানুয়ারি। বাবা ছাড়া কষ্ট কী তা বোঝাতে পারব না। মা একাই লড়াই করেছেন আমাকে নিয়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাথরঘাটার টেকপাড়ায় থাকতাম আমরা। আর্থিকভাবে সচ্ছলতা কখনো ছিল না, আমার মা খুব ব্যথা নিয়ে বলত, “সরকার যদি আমাদের দিকে নজর দিত, তাহলে আমাদের একটা গতি হতো।” মাস্টার্স পর্যন্ত পড়ে একটা প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষকতা করছি এখন। কোনো সরকারি চাকরি পাইনি। কোনো সহযোগিতা পাইনি। কেউ আমাদের কথা মনে রাখেনি। এখন এ মামলার রায় দ্রুত কার্যকর হলে সেদিন নিহত ২৪ জনের স্বজনরা অন্তত শান্তি পাবেন।’

রায়ের প্রতিক্রিয়া : আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে তখন সমাবেশ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। তারপরও সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। তখন আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে সমাবেশস্থলে যাওয়ার সময়ই গাড়িবহরে হামলা করা হয়। এ সময়ে আমিও উপস্থিত ছিলাম। অল্পের জন্য নেত্রী রক্ষা পান। আমার পায়ে গুলি লেগেছিল। আল্লাহর রহমত ছিল তাই বেঁচে গিয়েছিলাম। আমি এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছি। মামলার রায় হয়েছে। এতে আমি সন্তুষ্ট। এখন শিগগিরই রায় কার্যকর চাই।’

চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে নৃশংসভাবে হত্যা করতে সেদিন নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছিল। আমরাও সেদিন মিছিলে ছিলাম। সেদিন আমরা বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেলেও এ ঘটনায় ২৪ জন শাহাদাতবরণ করেছিলেন; যা বর্বরোচিত ও ন্যক্কারজনক। এরশাদ-বিএনপির কারণে মামলাটি বিলম্বিত হয়েছে, ৩২ বছর পার হয়ে গেছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার আমলেই এ মামলার রায় হয়েছে। এ রায় দ্রুত কার্যকর চাই।’

চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ সালাম বলেন, ‘৩২ বছর পর হলেও এ মামলার যে বিচার হয়েছে, এজন্য আমরা কিছুটা হলেও স্বস্তিবোধ করছি। যারা সেদিন পুলিশের গুলিতে শাহাদাতবরণ করেছিলেন, তাদের পরিবার অন্তত কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত