মানসম্মত চিকিৎসা-সেবার দ্বার খুলে যাক

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২০, ১০:৫৫ পিএম

দেশের স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামোগত অনেক অগ্রগতি হলেও সার্বিক সেবার চিত্র খুব  একটা স্বস্তিদায়ক নয়, তা বলাই বাহুল্য। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য হারে কমা, নবজাতকের মৃত্যুহার হ্রাসে সাফল্য অনেক। কিন্তু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা, ব্যয়বহুল উন্নত চিকিৎসা, চিকিৎসকদের একাংশের দায়িত্বে অবহেলা, ভুয়া চিকিৎসক, চিকিৎসাজনিত অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু, মানহীন ও অনুমোদনহীন অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের উপস্থিতি, যথাযথ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন না করেই চিকিৎসকদের কারও কারও পদবি ব্যবহারের প্রবণতাসহ নানা কারণ চিকিৎসা ব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত কলুষিত করে চলেছে। দেশের জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা রোধে সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা খুব একটা দৃশ্যমান নয়। এরকম একটি হতাশাজনক পরিস্থিতিতে দেশের উচ্চ আদালত একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

দেশের সব অনুমোদনহীন ও মানহীন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধের ব্যর্থতা প্রশ্নে রুল জারি করেছে উচ্চ আদালত। এ ধরনের ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিএমডিসির (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল) নিবন্ধন ও অনুমোদন ছাড়া চিকিৎসকরা নাম, পদবি ও শিক্ষাগত যোগ্যতা ব্যবহার করতে পারবে না বলে আদেশ দিয়েছে আদালত। এ সংক্রান্ত রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল সোমবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এই আদেশ দেয়।  স্বাস্থ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিএমডিসির সভাপতি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ ছয়জনকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে ওই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ২,৮৯৪ জনের জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসক আছেন মাত্র একজন। আর সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১,৬৯৮ জনের জন্য আছে একটি বেড। বাংলাদেশে মোট হাসপাতালের সংখ্যা সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৩,৫৭৫টি। এরমধ্যে সরকারি হাসপাতাল মাত্র ৫৯২টি। সরকারি হাসপাতালের মধ্যে উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে হাসপাতাল আছে ৪৬৭টি আর ১২৫টি বিশেষায়িত হাসপাতাল আছে জেলা পর্যায়ে। বেসরকারি খাতে ৫,২২০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে। এর একাংশ আবার অনুমোদন ছাড়াই হাসপাতালের কার্যক্রমও পরিচালনা করে। তাদের সেবার মান নিয়ে আছে বিস্তর অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসকরা সরকারি হাসপাতালে ঠিকমতো সেবা না দিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে বেশি আগ্রহী। এখন ডেন্টাল সার্জন বাদে মোট নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৭৭৬ জন। আর হাসপাতালে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বেডের সংখ্যা ৯২,৮০৪ টি। ইউনিয়ন পর্যায়ে ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক আছে।

বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা মেনে চলা হচ্ছে না। দি মেডিকেল প্র্যাকটিশনার অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিস (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২ এর ৮ ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া কোনো প্রাইভেট ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। ৯ ধারা অনুযায়ী, শর্তাবলি পূরণ না হলে কর্র্তৃপক্ষ কোনো প্রাইভেট ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার অনুমতি প্রদান করবে না। এ বিধান থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। যার অধিকাংশই অনুমোদনহীন, মানহীন ও সেবা প্রদানের চেয়ে টাকা উপার্জনই মালিকদের উদ্দেশ্যে। এ টাকা উপার্জনের মানসিকতায় অনেক সাধারণ মানুষ অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছে।

২০১৬ সালের ২০ জুলাই বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের প্রচারিত সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘নিবন্ধিত চিকিৎসক বা দন্ত চিকিৎসকরা তাদের সাইনবোর্ডে, প্রেসক্রিপশন প্যাড, ভিজিটিং কার্ড ইত্যাদিতে দেশের বিভিন্ন চিকিৎসা সংক্রান্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রদত্ত ফেলোশিপ এবং প্রশিক্ষণসমূহ ইত্যাদি উল্লেখ করতে পারবেন না।’ কারণ এগুলো কোনো স্বীকৃত চিকিৎসার যোগ্যতা নয় এবং বিএমডিসি কর্র্তৃক

স্বীকৃতও নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেকেই পোস্ট-গ্রাজুয়েশন না করেও ‘বিশেষজ্ঞ’ শব্দ ব্যবহার করেন। যা জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল, বিএমডিসির আইনের পরিপন্থি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু অনেক চিকিৎসক ওই নির্দেশ অমান্য করে তাদের ভিজিটিং কার্ড, সাইনবোর্ড, প্রেসক্রিপশন প্যাডে এসব প্রশিক্ষণের নাম উল্লেখ করায় সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে অপচিকিৎসারও শিকার হয়। চিকিৎসাক্ষেত্রে অনিয়ম হচ্ছে, ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার ঘটনা ঘটছে, এর বেশির ভাগই ঘটছে অনুমোদনহীন যত্রতত্র গড়ে ওঠা হাসপাতাল বা ক্লিনিকে। আবার নামিদামি হাসপাতালেও এ ধরনের অঘটন ঘটছে। অদক্ষ, দুর্নীতিপরায়ণ ও ব্যবসায়িক মনোবৃত্তিসম্পন্ন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা বিএমডিসির রয়েছে। ক্লিনিক আর হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি বিভাগ রয়েছে। কিন্তু কর্র্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অভিযোগ আমলে না নেওয়ার প্রবণতা আর বিচার না হওয়ার উদাহরণ এসব অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এবার উচ্চ আদালতের নির্দেশনা চিকিৎসা খাতে ইতিবাচক রূপান্তরের সূচনা করলে সেটি হবে আনন্দের সংবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত