সংসদে শরিয়ত বয়াতি প্রসঙ্গ

বাউল গানের জন্য কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২০, ০২:১৫ এএম

চুল কাটা বা বাউলদের প্রতি যেকোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি গ্রহণযোগ্য নয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাউল ঐতিহ্য যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, একজন বাউলশিল্পীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখানে বাউল গানের তো কোনো দোষ নেই। বাউল গানে সম্পৃক্ত কেউ যদি কোনো অপরাধে সম্পৃক্ত হন, তাহলেও আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আইন অনুযায়ী অপরাধের বিচার হবে। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে আইসিটি মামলায় টাঙ্গাইলের বাউলশিল্পী শরিয়ত বয়াতির গ্রেপ্তারের বিষয়ে জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, প্রশ্নকর্তা কি এমন কোনো গ্যারান্টি দিতে পারবেন বাউল গান করছেন বলেই ওই শিল্পী কোনো অপরাধে জড়িত নন। নিশ্চয়ই তিনি এমন কোনো অপরাধ করেছেন, যার জন্য তার বিরুদ্ধে এমন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন সরকার বাউল গানকে বিশ্ব ঐতিহ্য করার জন্য উদ্যোগ নিচ্ছে। তাই অনুরোধ করব, বাউল গানে সম্পৃক্তরা যেন এমন কোনো কাজ না করেন, যাতে বিশ্ব ঐতিহ্য বাউল গান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

এর আগে রাজবাড়ীর পাংশার বাউল সম্প্রদায়ের চুল কেটে দেওয়ার ঘটনা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক শাসকদের মতো এখনো যদি চুল কেটে দেওয়ার মতো কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটে, তাহলে সরকার সেটা দেখবে। কারণ অহেতুক চুল কাটা বা বাউলদের প্রতি যেকোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি গ্রহণযোগ্য নয়।

কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন স্থানের বাউল সম্প্রদায়ের কল্যাণে তার সরকারের পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পঁচাত্তরের পর সামরিক শাসকদের যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তাদের মধ্যেই এমন প্রবণতা দেখা গেছে। ক্ষমতায় এসে প্রথমেই তারা চারপাশটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে শুরু করেন। অর্থাৎ সুইপারের দায়িত্ব তারাই নিয়ে নেন। যারা ক্ষমতায় আসেন, তাদের কেউ টি-শার্ট পরে পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করেন, কৃচ্ছ্র সাধনের কথা বলেন, কেউ সাইকেল চালিয়ে অফিসে যাওয়া শুরু করেন। পরে দেখা যায়, তারাই সবচেয়ে দামি গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ান, প্যারিস থেকে স্যুট নিয়ে আসেন, শিফন শাড়ি নিয়ে আসেন। মানুষের চুল কাটাসহ এসব কাজ তারাই করেছেন। অবশ্য তাদের এমন উদ্যোগ বেশিদিন টেকে না। তারপরই দেখা যায়, তারা নিজেদের আসল রূপ প্রকাশ করে ফেলেন।

সাংসদ মাহফুজুর রহমানের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার বিচারপ্রার্থী জনগণের ভোগান্তি লাঘবে সঠিক বিচারের নিশ্চয়তা প্রদান করে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ধনী-গরিবনির্বিশেষে সবার জন্য সমতার ভিত্তিতে সুবিচার নিশ্চিত করা এবং বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সরকার বদ্ধপরিকর।

প্রধানমন্ত্রী সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য সরকার যথাযথ আইন সংস্কার ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। শোষণ-বঞ্চনামুক্ত ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করে আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার ও সুবিচার নিশ্চিত করা আমাদের সরকারের মূল লক্ষ্য। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আধুনিক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের মাঝে উপলব্ধি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে যে সব নাগরিক আইনের চোখে সমান এবং কোনো অপরাধী অপরাধ করে পার পাবে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে এ দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত অপরাধ বিচারের লক্ষ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিগত পাঁচ বছরের বহুল আলোচিত একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্রসংক্রান্ত মামলা, সিলেটে চাঞ্চল্যকর জোড়া শিশু হত্যা মামলা, নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত চাঞ্চল্যকর ৭ খুনের মামলা এবং জাপানি নাগরিক কুনিও হোশির হত্যা মামলাসহ চাঞ্চল্যকর মামলার বিচার শেষ হয়েছে।

দল-মতনির্বিশেষে সন্ত্রাসী ওয়ারেন্টভুক্ত সাজাপ্রাপ্ত আসামিসহ নিয়মিত মামলার আসামি গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ অস্ত্র বিস্ফোরক ও মাদকদ্রব্যসহ সব ধরনের অবৈধ মালামাল উদ্ধার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান পরিচালনায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং মাদকের অনুপ্রবেশ রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সার্বক্ষণিক নজরদারি বৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অপরাধী শনাক্ত ও তাদের আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

সাংসদ সদস্য ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, ইসমাত আরা সাদেক অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতেন। ইসমাত আরা সাদেকের সবচেয়ে বড় গুণ ওনার সততা, একাগ্রতা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম। এটা ছিল অসামান্য।

প্রধানমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের স্মৃতিচারণা করে বলেন, মিসেস সাদেক, আসলে তিনি গৃহিণী ছিলেন। বিভিন্ন সংস্থার সাথে জড়িত ছিলেন কিন্তু কখনো রাজনীতিতে খুব সক্রিয় ছিলেন না। তার স্বামী এ এস এইচ কে সাদেক ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৯১ সালে যখন আমরা সরকার গঠন করতে পারলাম না তিনি (এ এস এইচ কে সাদেক) আমার সঙ্গে দেখা করলেন, বললেন, আমি আসছি এবং সংগঠনের জন্য কাজ করতে চাই। সেই থেকে প্রায়ই তারা দুজন একসঙ্গেই আসতেন।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ১৯৯৬ সালে যখন সরকার গঠন করি মিসেস সাদেকের স্বামী এ এস এইচ কে সাদেককে মন্ত্রী করি। তখন তিনি অনেক কাজ করে দিয়ে গেছেন। একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস করা, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট করার জন্য কমিটি করে দিয়েছিলাম তারই নেতৃত্বে। সুন্দরবন ইউনেসকো বিশ্ব ঐহিত্য ঘোষণা দিয়েছে সব ব্যাপারে তার স্বামীর যথেষ্ট অবদান রয়েছে।

মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগেও ওনার সঙ্গে অনেক কথা বললাম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বললাম অপারেশন করার আগে আরেকজনের মত নেন। আর চিন্তা করবেন না, আমি তো আপনার চেয়ে বড়। তখন বললেন হ্যাঁ জানি, কিন্তু মৃত্যু তো আর বড়-ছোট হয়ে আসে না। মঙ্গলবার সকালে একনেক বৈঠকের সময় খবর পেলাম উনি আর নেই। আসলে মৃত্যু তো এভাবেই আসে। এই সংসদে এবার আমাদের কী রকম দুর্ভাগ্য পরপর চারজন মৃত্যুবরণ করলেন। হঠাৎ করে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে এটা আমি ভাবতেও পারিনি। এটা সত্যি কষ্টকর। অনেক সদস্যকে হারিয়েছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত