মিয়ানমার রাখাইনে রোহিঙ্গা গণহত্যা চালিয়েছে, তার সবরকম আলামতই প্রমাণিত হয়েছে বলে অন্তর্র্বর্তী আদেশে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। গতকাল বৃহস্পতিবার নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আইসিজে এ অন্তর্র্বর্তী আদেশ দেয়। ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে বলেও আদেশে উল্লেখ করেছে আদালত। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা, নিপীড়ন বন্ধ ও বাস্তুচ্যুতির মতো পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে মিয়ানমারকে বিরত থাকারও নির্দেশ দিয়েছে আইসিজে। রাখাইনে গণহত্যা ও রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধে মিয়ানমার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে আদালতে তা দাখিলেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইসিজের আদেশে বলা হয়, জেনোসাইড কনভেনশন-২ অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের হত্যা, শারীরিক বা মানসিক নিপীড়ন কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করা যাবে না। বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টায় আনুষ্ঠানিকভাবে এ আদেশ পড়া শুরু হয়। আদালতের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুলকোয়াই আহমেদ ইউসুফ এ আদেশ পড়ে শোনান। আইসিজের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে এ আদেশ ঘোষণা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
আইসিজের এ আদেশকে বাংলাদেশ ও মানবতার বিজয় বলে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী এ আদেশে আরও একবার চাপে পড়ল মিয়ানমার। তারা বলেন, এ আদেশে এটা প্রমাণিত হয়েছে, মিয়ানমার রোহিঙ্গা গণহত্যা করেছে। তাদের নিপীড়ন-নির্যাতনের ভয়ে রোহিঙ্গারা নিজেদের দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেও এ আদেশের ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন।
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলায় আইসিজের অন্তর্র্বর্তী আদেশ ঘোষণায় সন্তোষ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। গতকাল আইসিজের রায় ঘোষণার পর ইকুয়েডর সফররত পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বার্তায় বলেন, এটা মানবতার বিজয় এবং সারা বিশ্বের মানবাধিকারকর্মীদের জন্য একটি মাইলফলক। এটা গাম্বিয়ার বিজয়, ওআইসির বিজয়, রোহিঙ্গাদের বিজয় এবং অবশ্যই বাংলাদেশের বিজয়।
এ বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘এই আদেশ সারা বিশ্বের মুক্তিকামী শান্তিপ্রিয় মানুষের বিজয়। আদেশে পরিলক্ষিত হয়েছে সারা বিশ্বের মানুষ চায় রোহিঙ্গাদের সমস্যার সমাধান হোক। মিয়ানমার বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে তাদের প্রকৃত আবাসভূমি ফিরিয়ে দিলেই এই সমস্যার সমাধান হবে।’
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালি উর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ রায় প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশের কিছু নয় বলে মনে হলেও এ রায়ের বড় অর্জন আমাদের।’ মিয়ানমারের আইনজীবীরা মামলাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোকা বানানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা বিফলে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গাম্বিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে এই কূটনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, জাতিসংঘ, চীন, ভারতসহ প্রভাবশালীদের নিয়ে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। সদ্য সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক বলেন, ‘আমি খুশি। আন্তর্জাতিক আদালত যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমরা ঠিক পথে আছি। আজকের আদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক আইনের জন্য খুব ভালো একটি উদাহরণ তৈরি হলো। এ আদেশের মাধ্যমে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার পথ অনেক প্রশস্ত হলো।’
গতকাল আদেশ ঘোষণার শুরুতে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ার করা মামলার পক্ষে রোহিঙ্গা নিপীড়ন ও গণহত্যার যেসব আলামত আদালতের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেসব বিরোধের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন বিচারপতি ইউসুফ।
আদালতের চারটি আদেশ হলো জাতিসংঘ কনভেনশন অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে হবে। গণহত্যার প্রমাণ ধ্বংস করা যাবে না। সশস্ত্র বাহিনী আর কোনো গণহত্যা ঘটাতে পারবে না। চার মাস পরপর মিয়ানমারকে আদালতে প্রতিবেদন দিতে হবে, যত দিন না পর্যন্ত বিচারের চূড়ান্ত রায় প্রকাশিত হয়।
আদালত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীকে সব ধরনের গণহত্যার অপরাধ ও গণহত্যার ষড়যন্ত্র থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে এবং গণহত্যা সনদের ধারা ২ এর আওতায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সব ধরনের সুরক্ষা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা মিয়ানমারকে পূরণ করতে বলেছে।
মিয়ানমার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অন্তর্র্বর্তী ব্যবস্থার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গাম্বিয়া যেসব ব্যবস্থার আবেদন করেছে, সেগুলো হুবহু অনুসরণ না করে আদালত কিছু পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে।
রায়ে বলা হয়, আদালতের অন্তর্র্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। গণহত্যা সনদের ধারা ৪১ এর আওতায় তিনটি অন্তর্র্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশের শর্তসমূহ বিরাজ করছে বলে উল্লেখ করা হয়। আদালত বলে, গাম্বিয়া যেসব অন্তর্র্বর্তী ব্যবস্থার আদেশ চেয়েছে, এর প্রথম তিনটির লক্ষ্য হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা দেওয়া। জাতিসংঘ তথ্যানুসন্ধান দলের উপসংহার, যা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অনুমোদিত হয়েছে, তাতে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতায় গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল বলে যে উল্লেখ রয়েছে, তা আদালতের নজরে এসেছে।
গাম্বিয়ার এই মামলা করার এখতিয়ার নেই বলে মিয়ানমার যে দাবি করেছে, আদালত তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, জাতিসংঘ তথ্য অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে যেসব বিবরণ উঠে এসেছে তার আলোকে গাম্বিয়া মিয়ানমারকে যে নোট ভারবাল দিয়েছিল, তা বিরোধের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্য। আদালত বলেছে, গাম্বিয়া স্বনামে এ আবেদন করেছে। এরপর তারা ওআইসিসহ যেকোনো সংস্থা ও দেশের সহযোগিতা চাইতে পারে। তাতে মামলা করার অধিকার ক্ষুণœ হয় না। আদালতের প্রাথমিকভাবে এখতিয়ার আছে কি না, তা গণহত্যা সনদের ৯ ধারার আওতায় বিবেচ্য জানিয়ে আদালত তার যুক্তি তুলে ধরছে।
আইসিজের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে মিয়ানমার সরকার এবং মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। সেই সঙ্গে মিয়ানমার যে আপত্তি জানিয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে এ আদালত। এছাড়া রোহিঙ্গা গণহত্যার এ মামলা চলবে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত।
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এই নৃশংসতাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে গত বছর ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মামলা করে আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। গণহত্যার তদন্ত শুরু না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায় দেশটি। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের পিস প্যালেসে গত ১০ থকে ১২ ডিসেম্বর মামলার শুনানি চলে। ১০ ডিসেম্বর গাম্বিয়ার প্রতিনিধি দল আদালতে গণহত্যার বিষয়ে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করে। শুনানিতে গাম্বিয়ার পক্ষে মামলার প্রতিনিধিত্ব করেন দেশটির বিচারমন্ত্রী আবুবাকার তাম্বাদু।
পরদিন ১১ ডিসেম্বর মিয়ানমারের নেতৃত্ব দেন মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো নেত্রী অং সান সু চি। তিনি তার দেশের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন আইসিজেতে। ১২ ডিসেম্বর মামলার শুনানি শেষ হয়। হেগ শহরে এই শুনানিতে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। ওই দলে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তিনজন প্রতিনিধিও ছিলেন।
গতকাল এ মামলার আদেশ ঘোষণার আগে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মতো ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে তিনি গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে লেখা এক নিবন্ধে তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গারা তাদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের মাত্রাকে অতিরঞ্জিত হিসেবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে রাখাইনে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দেশীয় আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
এ মামলায় চারটি অন্তর্র্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছে আইসিজে। সেগুলো হলো
১. গণহত্যা কনভেনশন-২ অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের হত্যা, শারীরিক বা মানসিক নিপীড়ন কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করা যাবে না। ২. গণহত্যা কিংবা গণহত্যার প্রচেষ্টা বা ষড়যন্ত্র না করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ। ৩. মিয়ানমারকে অবশ্যই চার মাসের মধ্যে লিখিত জমা দিতে হবে যেন তারা সেখানে পরিস্থিতি উন্নয়নে কী ব্যবস্থা নিয়েছে। এরপর প্রতি ছয় মাসের মধ্যে আবার প্রতিবেদন দেবে। ৪. গাম্বিয়া এ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের কাছে আবেদন করতে পারবে।
গাম্বিয়া সরকারকে বিএনপির ধন্যবাদ : রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় আইসিজের সিদ্ধান্তের জন্য গাম্বিয়া সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বিএনপি। গতকাল রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘গাম্বিয়া সরকারের উদ্যোগে আজকে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) তাদের রায় দিয়েছেন, চারটি বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। তারা মিয়ানমারকে বলেছেন যে, জেনোসাইড যেন আর না ঘটে এজন্য তাদেরকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর যেন (পরিস্থিতি) খারাপ না হয় সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। এই মামলার শুনানি ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়া যে মামলা করেছে তার বিচারটা চলতে থাকবে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এছাড়া ভারতীয় সীমান্তে হত্যাকা-ের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে এরকম হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবি জানিয়েছে স্থায়ী কমিটি।’
স্কাইপের মাধ্যমে লন্ডন থেকে যুক্ত হওয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু প্রমুখ।
