মিয়ানমারকে আইসিজের নির্দেশ মানতে হবে

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ১০:৪১ পিএম

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংস ও বৈষম্যমূলক অভিযানে গণহত্যার উদ্দেশ্য থাকতে পারে এমন বিবেচনা আমলে নিয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা ও বৈষম্য অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা আইসিজে। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে শান্তি প্রাসাদে গত বৃহস্পতিবার সকালে আদালতের আনুষ্ঠানিক অধিবেশনে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের (আইসিজে) প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুলকোয়াই আহমেদ ইউসুফ আনুষ্ঠানিকভাবে এ আদেশ ঘোষণা করেন। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমার সরকারের দীর্ঘ কয়েক দশকের জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়ন এবং ২০১৭ সালের সেনা অভিযানের পটভূমিতে গাম্বিয়া সুরক্ষা চেয়ে আবেদন করে। মিয়ানমার ও গাম্বিয়া উভয়ই ১৯৪৯ সালে গৃহীত গণহত্যা সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ। এ সনদের বাধ্যবাধকতা পূরণে মিয়ানমারকে বাধ্য করার লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হয় গাম্বিয়া। গত বছর ডিসেম্বরের ১০ থেকে ১২ তারিখ তিন দিন এই আবেদনের ওপর শুনানি হয়, তাতে উভয়পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। আন্তর্জাতিক আদালতের ১৫ জন স্থায়ী বিচারপতির সঙ্গে দুই রাষ্ট্রের মনোনীত দুজন অ্যাডহক বিচারপতি মামলার শুনানি গ্রহণ করেন।

বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে আদালত সর্বসম্মতভাবে মিয়ানমারের প্রতি যে চার দফা অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, সেগুলো মেনে চলা মিয়ানমারের জন্য বাধ্যতামূলক। আদালত জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী দলের ২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে উল্লিখিত ‘আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন ঘটেছে বলে বিশ্বাস করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে’ এ বাক্য উদ্বুদ্ধ করে। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের আলোকে গাম্বিয়া যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন করেছিল, তার প্রথম তিনটি রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে আদালত অভিমত দেয়।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এ রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ অবস্থানের ফলে বাংলাদেশে নানারকম আর্থসামাজিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘায়িত হওয়ায় শিবিরে রোহিঙ্গাদের দৈনন্দিন জীবনে নানা সমস্যা ও বঞ্চনা বেড়ে চলেছে। রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে বৈষয়িক টানাপড়েন ও মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতির কারণে স্থানীয় পর্যায়ে জনসংখ্যাগত যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মধ্যে পারস্পরিক অসন্তোষ, সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। তাছাড়া রোহিঙ্গাদের নানারকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। জন্মনিবন্ধন সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা, বাংলাদেশের পাসপোর্ট তৈরি করা, এমনকি ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তিকরণের তৎপরতায় লিপ্ত হওয়ার খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আসছে। বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর বসবাস করার কারণে তাদের মধ্যে হতাশাও লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকের অভিমত, রোহিঙ্গাদের অবস্থান আরও দীর্ঘায়িত হলে তা বাংলাদেশের জন্য একটি নিরাপত্তাঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে পাঁচ দফা এবং ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে একই সংস্থার সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে চার দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন। এই প্রস্তাবগুলোতে তিনি ধর্ম ও গোত্রনির্বিশেষে মিয়ানমারে বসবাসরত সব বেসামরিক লোকজনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি ‘নিরাপদ এলাকা’ তৈরি, টেকসই প্রত্যাবাসনের বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন। ইতিমধ্যে অবশ্য ২০১৮ সালের নভেম্বরে এবং ২০১৯ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ বারই ব্যর্থ হয়েছে। এখন আইসিজের নির্দেশকে নিজেদের পক্ষে কতটুকু কাজে লাগানো যাবে, তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক দক্ষতার ওপর নির্ভর করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের এ সিদ্ধান্ত বিশ্বে আইনের শাসন ও মানবতার মর্যাদা রক্ষায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত হবে। তবে আইসিজে মিয়ানমারে বর্তমানে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা বন্ধের নির্দেশ দিলেও তাতে বাংলাদেশে অবস্থানরত এ জনগোষ্ঠীর সদস্যদের প্রত্যাবর্তনের নির্দেশনা নেই। আর আইসিজে নিজে এ আইন বাস্তবায়ন করতে পারে না, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদই এ আইন বাস্তবায়নের ক্ষমতা রাখে। তবে আইসিজের এ নির্দেশকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির একটা প্রেক্ষাপট আরও শক্তিশালী হলো। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ প্রভাবশালীদের সম্মত করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর অধিক চাপ সৃষ্টির ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি, যতদিন তাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি সম্পন্ন না হচ্ছে, ততদিন তাদের প্রতিপালনের জন্য আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর তহবিলকে কীভাবে আরও বৃদ্ধি করা যায়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। সর্বোপরি, আইসিজের নির্দেশের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা নিপীড়নের যে স্বীকৃতি দিয়েছে, তা এই বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে নিয়ে আসবে এটাই সবার প্রত্যাশা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত