নিপাহ ভাইরাস একটি আরএনএ জেনেটিক ভাইরাস। নিপাহ ভাইরাসের পাঁচটি প্রজাতি থাকলেও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে রোগ সৃষ্টিকারী গুরুত্বপূর্ণ হলো নিপাহ হে নিপা ভাইরাস প্রজাতিটি।
প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন শ্রেণির বাদুড় যেমন টেরোপিড ফ্রুট ব্যাট অথবা মাইক্রোব্যাট এই ভাইরাস বহন করে। ভাইরাসটি যেমন বাদুড় থেকে মানুষে ছড়াতে পারে, তেমনি আক্রান্ত মানুষ থেকে সুস্থ মানবদেহেও ছড়াতে পারে আবার ভাইরাস সংক্রমিত খাদ্যবস্তুর মাধ্যমেও মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। মানুষ ছাড়াও অন্যান্য প্রাণী যেমন শূকরেও এই ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে। বাংলাদেশে এ রোগে মৃত্যুহার প্রায় ৭৭ শতাংশ। চলতি বছর পর্যন্ত ৩ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংক্রমণ : পৌষ থেকে ফাল্গুন-চৈত্র পর্যন্ত এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। কারণ এ সময় খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয় এবং বাদুড় গাছে বাঁধা হাঁড়ি থেকে রস খাওয়ার চেষ্টা করে এবং এ সময় খেজুরের রসে বাদুড়ের লালা, মলমূত্র মিশে যায়। ভাইরাস বহনকারী বাদুড় থেকে এভাবে খেজুরের রসে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে এবং এ রস কাঁচা খেলে মানবদেহে নিপাহ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে পরবর্তী সময়ে আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে আসা অন্য সুস্থ মানুষেরও ছড়াতে পারে। বিরলতমভাবে আক্রান্ত শূকর থেকেও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।
লক্ষণ : নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণে কোনো লক্ষণ নাও প্রকাশ পেতে পারে। তবে সাধারণত নিপাহ এনকেফেলাইটিস বা একিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা এটিপিকাল নিউমোনিয়া সহকারে প্রকাশিত হয়। জ্বরসহ মাথাব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, খিঁচুনি, প্রলাপ বকা, বমি, অজ্ঞান হওয়া (নিপাহ এনকেফেলাইটিস) অথবা কোনো ক্ষেত্রে তীব্র শ্বাসকষ্ট (একিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) নিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়ে।
প্রতিকার ও চিকিৎসা : দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ভাইরাসের কোনো টিকা এবং সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে সচেতনতা ও সতর্কতাই এ রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায়। রিয়াল টাইম পিসিআর অথবা ঊখওঝঅ পরীক্ষার মাধ্যমে এই ভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় করা যায়। ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপে নিপাহ ভাইরাস নষ্ট হয়ে যায়। তাই কিছু পরামর্শ মেনে চললে রোগটি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
১. খেজুরের কাঁচা রস গ্রহণ থেকে বিরত থাকা।
২. খেজুরের কাঁচা রসে ডুবিয়ে পিঠা বা অন্য খাবার না খাওয়া।
৩. কোনো ধরনের আংশিক খাওয়া ফল না খাওয়া।
৪. ফলমূল পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে খাওয়া।
৫. আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এলে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলা। আক্রান্ত রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
৬. খেজুরের গুড়, টগবগিয়ে ফোটানো বা রান্না করা খেজুরের রসের পায়েস এবং রান্না করে খাওয়া
৭. শাকসবজি ও ফলমূল আহার করা নিরাপদ।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং আইসিডিডিআরবি ২০০৬ সাল থেকে নিপাহ সার্ভেল্যান্স কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। বর্তমানে এ কার্যক্রম সরকারি জেলা হাসপাতালে পরিচালিত হচ্ছে। সম্মিলিত সচেতনতাই পারে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ রোধ করতে।
ডা. হিমেল ঘোষ
এমবিবিএস (ঢাকা মেডিকেল কলেজ) বিসিএস (স্বাস্থ্য)
মেডিকেল অফিসার,
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
ডুমুরিয়া, খুলনা
