চোখের আলোর পাহারাদার ভিটামিন-এ ক্যাপসুল

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২০, ১২:৫৩ এএম

যে সব খাদ্য খেলে শরীরে তাপ ও শক্তি উৎপাদিত হয়, দেহের গঠন বৃদ্ধি হয়, শরীর সবল, কর্মক্ষম ও নীরোগ থাকে, তা-ই পুষ্টিকর খাদ্য। খাদ্য ও পুষ্টি একে অপরের সঙ্গে জড়িত। যে কোনো খাদ্য গ্রহণ করলেই হবে না, তা অবশ্যই হতে হবে পুষ্টিকর এবং নিরাপদ। পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ না করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং শরীরে বিভিন্ন ধরনের রোগ হয়। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করলে শরীর ও মন উভয়ই ভালো থাকে।

খাদ্যের যে সব রাসায়নিক পদার্থ দেহের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে সেগুলোই খাদ্য উপাদান নামে পরিচিত। শ্বেতসার বা শর্করা, তেল ও চর্বি, আমিষ, খনিজ উপাদান, পানি এবং ভিটামিন  খাদ্যের  উপাদান। এদের  মধ্যে অন্যতম খনিজ লবণ ও ভিটামিন সমূহকে একত্রে অনুপুষ্টি বলে।

অনুপুষ্টি উপাদানসমূহ আমাদের অতি সামান্য পরিমাণে প্রয়োজন, কিন্তু এগুলো এতই গুরুত্বপূর্ণ যে নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্রহণ করা না হলে একজন মানুষ অসুস্থ অথবা শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী হতে পারে।

খাদ্যে অনেক ধরনের অনুপুষ্টি আছে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান হচ্ছে - আয়রন, আয়োডিন, জিংক, ক্যালসিয়াম। ভিটামিন দু’ ধরনের- পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন (ভিটামিন ‘বি’ এবং ভিটামিন ‘সি’) এবং তেলে দ্রবণীয় ভিটামিন ( ভিটামিন ‘এ’, ভিটামিন ‘ডি’,  ভিটামিন ‘ই’ এবং ভিটামিন ‘কে’)

ভিটামিন ‘এ’ অসম্পৃক্ত জৈব যৌগের একটি গ্রুপ এবং চর্বি বা তেলে দ্রবণীয় ভিটামিন । শিশুর সুস্থভাবে বেঁচে থাকা, স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও দৃষ্টিশক্তি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভিটামিন ‘এ’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুপুষ্টি ।

ভিটামিন ‘এ’ মূলত দুটি গঠনে থাকতে পারে । রেটিনয়েড (রেটিনল, রেটিনাল, রেটিনয়িক এসিড ইত্যাদি) - যা মূলত প্রাণিজ খাদ্য উৎসে পাওয়া যায় এবং মানবদেহে সরাসরি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ প্রাণিজ খাবারের উৎসগুলো হলোÑ দুধ, ডিম, মাংস,কলিজা, ছোটমাছ ইত্যাদি। 

ক্যারোটিনয়েড (প্রধানত বিটা ক্যারোটিন) যা মূলত উদ্ভিজ খাদ্য উৎসে পাওয়া যায় এবং রেটিনলে রূপান্তরিত হয়ে মানবদেহে ব্যবহৃত হয়। ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ উদ্ভিজ্জ খাবারের উৎসগুলো হলোÑ গাজর, মিষ্টি  আলু, মিষ্টি কুমড়া, লালশাক, পাকা আম, পাকা পেঁপে, পাকা কাঁঠাল ইত্যাদি ।

সাধারণত অপর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ, জন্মের পর শিশুকে শাল দুধ না খাওয়ানো, নিয়মিতভাবে ও পর্যাপ্ত সময় ধরে শিশুকে মায়ের দুধ না খাওয়ানো, যথাযথভাবে পরিপূরক ও সুষম খাবার না খাওয়ানো, দারিদ্র্য ও ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার ক্রয়ে অক্ষমতা, ভিটামিন ‘এ’-এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা ও জ্ঞানের অভাব ইত্যাদি কারণে মানবদেহে ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব দেখা দিতে পারে।

ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে চোখের ওপর অনেক ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে- এর মধ্যে রাতকানা, কনজাংটিভার শুষ্কতা, বিটট স্পট, কর্নিয়ার শুষ্কতা, কর্নিয়ার ক্ষত, কর্নিয়ার স্থায়ী দাগ, চোখের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণরূপে লোপ পাওয়া। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে বলা হয় জেরোফথ্যালমিয়া।     

এ ছাড়াও ভিটামিন ‘এ’ এর আরও কিছু ক্ষতিকর প্রভাব আছে- যেমন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া ফলে শিশুরা শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ যেমন- নিউমোনিয়া, ব্রংকিওলাইটিস ও পরিপাকতন্ত্রের প্রদাহ যেমন- ডায়রিয়া, আমাশয়, কলেরা ইত্যাদি এবং টাইফয়েডসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগে ঘনঘন আক্রান্ত হয়। হাম পরবর্তী জটিলতা বৃদ্ধি পায়, শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, রক্তস্বল্পতা, ত্বকের শুষ্কতা বৃদ্ধি ও ত্বক মলিন হয়ে যায় ইত্যাদি।

ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে ৫ বছরের নিচের বয়সের কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণকারী শিশু, অপরিণত বয়সে জন্মগ্রহণকারী শিশু, অপুষ্টি ও সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশু এবং গর্ভবতী ও প্রসূতি মা।

বড়দের চেয়ে ৫ বছরের ছোট শিশুরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ জন্মের সময় যকৃতে তুলনামূলক কম পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ থাকে। শিশুর জন্মের প্রথম ৬ মাস মায়ের দুধে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ থাকে। কিন্তু পরবর্তীকালে শিশুর বাড়ন্ত সময়ে অধিক ভিটামিন ‘এ’ এবং ডায়রিয়া ও হাম পরবর্তী সময়ে ভিটামিন ‘এ’-এর চাহিদা বেশি থাকে। এছাড়াও শিশুরা সম্পূর্ণভাবে বড়দের ওপর নির্ভরশীল।

ভিটামিন ‘এ’ চর্বিতে দ্রবণীয় ও ৪-৬ মাস যকৃতে জমা থাকে এবং দেহের প্রয়োজন অনুযায়ী দেহে ব্যবহৃত হয়। তাই সরকার ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতিজনিত অপুষ্টি প্রতিরোধ করার জন্য ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের বছরে দুইবার বয়স অনুযায়ী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

১৯৬২ সালে এক গবেষণায় দেখা যায়, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ৪ দশমিক ১ শতাংশ শিশু রাতকানা রোগে আক্রান্ত। ১৯৭৩ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু জাতীয় রাতকানা প্রতিরোধ প্রকল্প শুরু করেন। যার মাধ্যমে ৫ বছর বয়সী শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু হয়। ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই ‘অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব প্রতিরোধ’ কর্মসূচি পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। ১৯৮১ সাল থেকে অদ্যাবধি এই কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীকালে এইচপিএনএসডিপি ও এইচপিএনএসপি (৩য় এবং ৪র্থ সেক্টর প্রোগ্রাম) এর আওতায় জাতীয় পুষ্টিসেবা, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান বছরে দুইবার এই কর্মসূচি পালন করে আসছে। ৫ বছর বয়সী শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ হার বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৯৫  সালে শিশুদের মাঝে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণের কার্যক্রম জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। পরবর্তীকালে ২০০৩ সাল থেকে প্রথমবারের মতো শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো  ক্যাম্পেইন আকারে পালিত হয়। ২০১১ সালে ৬ মাস থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়।

বর্তমানে রাতকানা রোগ প্রায় নেই বললেই চলে। তবে ২০১১-২০১২ সালের জাতীয় অনুপুষ্টি জরিপে দেখা যায় যে ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ২১ শতাংশ শিশু ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবজনিত সমস্যায় ভুগছে। এছাড়াও ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ১১ শতাংশ শিশু আয়রনের ঘাটতিতে, ৪৫ শতাংশ শিশু জিঙ্ক, ৪০ শতাংশ শিশু ভিটামিন ‘ডি’ এবং ২৪ শতাংশ শিশু ক্যালসিয়ামের ঘাটতিতে ভুগছে। যার ফলে বাংলাদেশ সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ এর ঘাটতিজনিত অপুষ্টি প্রতিরোধ করার জন্য বছরে দুইবার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন পালন করে আসছে।

ক্যাম্পেইনে ৬ মাস থেকে ১ বছর বয়সী শিশু একটি ১ লাখ আন্তর্জাতিক মাত্রার নীল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পাবে। ১-৫ বছর বয়সী শিশু ২ লক্ষ আন্তর্জাতিক মাত্রার একটি লাল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পাবে।

সাধারণত এর মাধ্যমে শিশুদের কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হয় না বললেই চলে। শিশুদের একদম খালিপেটে অথবা খাওয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হলে বমি বমি ভাব, বমি হওয়া বা পেটে ব্যথা হতে পারে যা আধা ঘণ্টা থেকে ১ ঘণ্টার মধ্যে এই লক্ষণসমূহ বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং শিশু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১১ সালের এক জরিপে দেখা যায় যে, বছরে দুইবার ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বযসী শিশুর অন্ধত্ব প্রতিরোধ করে, শিশুর দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করে, সব ধরনের মৃত্যু হার ২৪ শতাংশ হ্রাস করে, হামজনিত মৃত্যু হার ৫০ শতাংশ হ্রাস করে এবং ডায়রিয়াজনিত মৃত্যু হার ৩৩ শতাংশ হ্রাস করে।

বাংলাদেশ এমডিজি-৪ অর্জন করেছে এবং বর্তমানে এসডিজির ১৭টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছে। এসডিজি অর্জনে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি তথা শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে ভিটামিন ‘এ’ এর গুরুত্ব অপরিসীম।

লেখক : ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, জাতীয় পুষ্টিসেবা, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত