জিপি হাউজ

কর্মক্ষেত্রের ধারণা পাল্টে দেওয়া স্থাপত্য

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ০৩:৪০ এএম

কর্মক্ষেত্র মানেই যেন চার দেয়ালের মাঝে সারি সারি টেবিল-চেয়ার আর তাতে কম্পিউটারে মুখ গুঁজে কাজ করা একদল মানুষ। এক দশক আগেও দেশের অফিসগুলোতে এ চিত্রই চোখে পড়ত। সেই চিরাচরিত ভাবনাকে দূরে রেখে দেশে উন্মুক্ত কর্মক্ষেত্রের ধারণা গ্রামীণফোন হেডকোয়ার্টার বা জিপি হাউজ দিয়েই শুরু। এর সাবলীল স্থাপত্য ও কর্মক্ষেত্রের নতুন আবহ দেশের করপোরেট সংস্কৃতিতেও নতুন এক যাত্রার সূচনা করে।

টেলিকম জায়ান্ট টেলিনরের মালিকানাধীন গ্রামীণফোনের মূল স্থাপত্য পরামর্শক ছিল ভিসতারা আর্কিটেক্টস। শুরু থেকেই নকশা প্রণয়নের সময় স্থপতিরা কয়েকটি বিষয়ে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি যেহেতু একটা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কোম্পানি, ডিজাইন ব্রিফিংয়ে তারা বলেছিল, ওদের সমাজ-সচেতনতা অনেক বেশি। সমাজে কোনো কিছু ওরা জোর করে প্রতিস্থাপন করতে চায় না। ওরা যেটা বলেছিল, সেটা হলো ‘গিভ মোর আর্থ’। যার অর্থ হলো, আমরা পৃথিবী থেকে নিচ্ছি প্রতিনিয়তই কিন্তু দিচ্ছি না কিছু। তো সেই ধ্যানধারণা থেকে শুরু হয় কাজটা। এছাড়া ভবন তৈরিতে টেকসই নির্মাণ অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও ছিল উদ্দেশ্য। স্থপতিরা এ বিষয়গুলোর দারুণ মিশেল ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন জিপি হাউজে, এর বাইরে-অন্দরে সেই বিষয়টা এখন দৃশ্যমান।

জিপি হাউজের মূল কমপ্লেক্সটি উত্তর-দক্ষিণে দুটো উইংয়ে ভাগ করা। দুটো উইং যুক্ত করেছে লিফট, সিঁড়ি আর সুপ্রশস্ত লবি। এ যেন টেলিকম প্রতিষ্ঠানটির যে নিরবচ্ছিন্ন সংযুক্তির প্রতিশ্রুতি, তারই স্থাপত্যিক প্রতিবিম্ব। দুটো উইংয়েই পরিচালিত হয় অফিশিয়াল কার্যক্রম, দুপাশই প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আর এ দুই অংশের মাঝেই গোলাকার জলাধার, ঝরনাধারায় পানির অবিরাম প্রবাহ যেন এখানে অবিরাম প্রাণচাঞ্চল্যকে মনে করিয়ে দেয়।

সাধারণ দর্শনার্থীদের কাছেও জিপি হাউজের অন্যতম আকর্ষণ এর প্রবেশদ্বার। সুবিশাল পাবলিক প্লাজা দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে জলাধার, যার পাশেই আবার বাগান, যে জলে পাশের স্থাপনার প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। এ যেন আমাদের চিরাচরিত বাড়ির উঠোনের মতোই এক আবহ মনে করিয়ে দেয়। এ অংশ দিয়েই পাবলিক জোনে প্রবেশ করা যায়, গাড়িতে করে প্রবেশ করলেও এই সৌন্দর্য যে কেউ অবলোকন করবেন। দেশের শীর্ষ টেলিকম সেবাদাতা হিসেবে নাগরিকদের প্রতি গ্রামীণফোনের দায়বদ্ধতা রয়েছে, সেজন্যই প্লাজাতেও দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং পথচারীদের প্রবেশকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। করপোরেট অফিসে গ্রামীণফোনের গ্রাহকদের কাস্টমার কেয়ারে আসারাও এখানে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই এর বিশালতা উপভোগের সুযোগ পান।

জিপি হাউজের স্থাপনা পরিবেশ সংবেদনশীল, টেকসই এবং শক্তিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির মিশেলে বাংলাদেশের স্থাপত্যচর্চায় অনেকগুলো নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখন পর্যন্ত অফিসের যে ধ্যান-ধারণা, তা আমূল পাল্টে দিয়েছে এই ভবনটি। জিপি হাউজের প্রধান স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশ মনে করেন, অফিস হলো ক্লাসরুমের মতো আমার যখন ইচ্ছে যেখানে খুশি বসব। প্রতিদিনই এক জায়গায় গিয়ে বসতে হবে এ ধারণা থেকে এটা বেরিয়ে এসেছে। মূল ব্যাপারটা হলো কাজ করা।

জিপি হাউজের স্থাপনা পরিবেশ সংবেদনশীল, টেকসই এবং শক্তিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির মিশেলে বাংলাদেশের স্থাপত্যচর্চায় অনেকগুলো নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখন পর্যন্ত অফিসের যে ধ্যান-ধারণা, তা আমূল পাল্টে দিয়েছে এই ভবনটি। জিপি হাউজের প্রধান স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশ মনে করেন, অফিস হলো ক্লাসরুমের মতো আমার যখন ইচ্ছে যেখানে খুশি বসব। প্রতিদিনই এক জায়গায় গিয়ে বসতে হবে এ ধারণা থেকে এটা বেরিয়ে এসেছে। মূল ব্যাপারটা হলো কাজ করা। অফিস যখন একজনকে হায়ার করে, সে ক্ষেত্রে কাজটা হচ্ছে কি না, এটা হলো গুরুত্বপূর্ণ। আপনার অ্যাসাইনমেন্ট ফুলফিল হলো কি না, এটা গুরুত্বপূর্ণ। কে কোথায় বসলেন, এটা গুরুত্ব বহন করে না। দার্শনিকতার এ বিষয়টি রূপায়ণ করা সম্ভব হয়েছে জিপি হাউজের স্থাপত্যে।

ভবনটি মাঝখানে একটা জলচত্বর আছে। সেখানকার পানি কিন্তু বাইরে না এসে আবার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে যেটা হয়, ফোয়ারার পানি বাইরে চলে আসে। কিন্তু এখানে দার্শনিকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে আমি তোমার কাছ থেকে যা নিচ্ছি, তা আবার তোমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছি। ভবনটিতে কারও নির্দিষ্ট কোনো বসার জায়গা নেই। এমনকি ম্যানেজিং ডিরেক্টরেরও আলাদা কোনো রুম নেই। সেখানে যখন সবাই একত্রে কাজ করে তখন কে ম্যানেজিং ডিরেক্টর, কে সাধারণ এমপ্লয়ি, তা বোঝার কোনো উপায় নেই। সেখানে সবার এক রকম চেয়ার! আরেকটা মজার ব্যাপার হলো, ভবনটিতে ২ হাজার ৬০০ লোক অফিস করে, কিন্তু চেয়ার আছে দুই হাজারটি। এটা এভাবেই অপটিমাইজ করা। আপনি বাইরের বাতাস যত ঢোকাচ্ছেন, এয়ারকন্ডিশনের লোড বেড়ে যাচ্ছে। গরম বাতাস ঢুকছে, আবার বেরিয়ে যাচ্ছে। রিসাইক্লিং হচ্ছে।

জিপি হাউজ প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ নিজেই উৎপাদন করে। কারণ বিদ্যুৎ অনেক দূর থেকে এলে সিস্টেম লস হয়। মূল বিবেচনা ছিল, যদি সরকারিভাবে বিদ্যুৎ নেওয়া হয়, তাহলে লাগত সাড়ে চার মেগাওয়াট। সেটা একটা ভবনের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। এছাড়া বিদ্যুৎ নিয়ে জেনারেটর লাগাতে হবে। জেনারেটর কী করে? জেনারেটর কিন্তু তাপ ছেড়ে দিচ্ছে। গরম বাতাস যেটা, সেই গরম বাতাসকে ওখানে কাজে লাগানো হয়েছে। স্থপতিরা দেখলেন, জেনারেটরের বদলে যদি তারা টারবাইনে যান, তাহলে গরম বাতাস দিয়ে শতভাগ এয়ারকন্ডিশনের কাজ করতে পারবেন। ফলে দেখা গেল যে, ৬৫ শতাংশ বিদ্যুৎ এয়ারকন্ডিশনের জন্য খরচ হতো এই ব্যবস্থায় তা আর লাগবে না। এভাবে জিপি হাউজকে জ¦ালানি সাশ্রয়ী করা হয়েছে।

জিপি হাউজের স্থাপত্য পরিবেশ সংবেদনশীল, টেকসই এবং শক্তিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির মিশেলে বাংলাদেশের স্থাপত্যচর্চায় অনেকগুলো নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এরকম প্রথম ভবন হিসেবে দেশ-বিদেশে স্বীকৃতির পাশাপাশি দেশের স্থপতিসমাজে এটি সমাদৃত হয়েছে ইতিবাচকভাবে। সমাজ ও পরিবেশবান্ধব নকশা প্রণয়নে অনেক স্থপতিকেই এটি অনুপ্রাণিত করছে।

জিপি হাউজের মূল ডিজাইন পরামর্শক ‘ভিসতারা আর্কিটেক্টস’। এই প্রকল্পের ডিজাইন টিমে ছিলেন স্থপতি কেএম সাইফুল কাদের।

লেখক : স্থপতি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত