টানা দুই বছরের দরপতনের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের শুরুতেও ক্রেতা সংকটের কারণে অধিকাংশ শেয়ারের দর কমে যায়। তবে বাজার স্থিতিশীলতায় সরকারের পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাসে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগ করতে শুরু করেছেন। এতে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে স্টক এক্সচেঞ্জ যে পরিমাণের সূচক হারিয়েছিল, গত সাত কার্যদিবসে তা পুনরুদ্ধার করার পরও কিছু বাড়তি পয়েন্ট যোগ হয়েছে। একই সঙ্গে কেনাবেচার পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের শুরু থেকে গত ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত চলা দরপতনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্যসূচক কমে ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ সময় সূচকটি সাড়ে চার বছর আগের অবস্থানে ফিরে যায়। এরপর সাধারণ বিনিয়োগকারী ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাজার ঘুরে দাঁড়ায়। ফলে গত সপ্তাহের মাত্র পাঁচ কার্যদিবসেই সূচকটি ৩৬৪ পয়েন্ট বা ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ বাড়ে। এ সময়ে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া প্রায় ৯২ শতাংশ সিকিউরিটিজের দর বেড়েছে। এ সময়ে বিদেশি ও স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার ক্রয় করে সূচক বাড়াতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন।
পুঁজিবাজারের পতন রোধে করণীয় নির্ধারণে গত ১৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান ড. খায়রুল হোসেন। এ সময় পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগের দিন পতনরোধে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংককে শেয়ার কেনার নির্দেশ দিয়েছিলেন অর্থবিভাগের সিনিয়র সচিব। পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের প্রস্তাবে ইতিবাচক মতামত দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত এসব উদ্যোগের ফলেই দীর্ঘদিন পর পুঁজিবাজারে চাঙ্গাভাব দেখা দেয়। ডিএসইর বর্তমান প্রধান মূল্যসূচকটি যাত্রার পর এক দিনে সর্বোচ্চ বৃদ্ধির রেকর্ডও হতে দেখা যায়।
গত সপ্তাহে পুঁজিবাজারের উল্লম্ফনে সব খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে। এতে ডিএসইর বাজার মূলধন বেড়েছে ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকারও বেশি। গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি দর বেড়েছে এনবিএফআই খাতের। এ সময় পুরো খাতটির বাজার মূলধন বেড়েছে ২১ দশমিক ২ শতাংশ। পিপলস লিজিংয়ের অবসায়নসহ বিভিন্ন কোম্পানির দুরবস্থার প্রভাবে খাতটি গত দুই বছরে বড় ধরনের দরপতনে দুশ্চিন্তায় ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। চলতি বছরও একই ধারায় চলতে থাকায় ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩ শতাংশ বাজার মূলধন হারায়। এতে এনবিএফআই খাতটির ২৩ কোম্পানির মধ্যে ১০টির দর শেয়ার দর অভিহিত মূল্যের নিচে নেমে যায়। তবে বাজারে চাঙ্গাভাব ফিরে আসায় গত সপ্তাহে এ খাতটির উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দর বাড়ে।
গত সপ্তাহে দরবৃদ্ধির তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিমেন্ট খাত। এ খাতটিও ২০১৮ ও ’১৯ সালে বড় অঙ্কের বাজার মূলধন হারায়। সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকারের দর বৃদ্ধির সঙ্গে জ্বালানি ও অন্যান্য ব্যয় বাড়ায় খাতটির বেশিরভাগ কোম্পানির নিট মুনাফায় টিকে থাকা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। গত দুই বছরে এ খাতের কোনো কোনো কোম্পানির শেয়ার দর এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে। চলতি বছর অবস্থার কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা ও শেয়ার দরের সর্বনিম্ন অবস্থানের কারণে বিনিয়োগকারীরা সিমেন্ট খাতের প্রতি ঝোঁক বাড়িয়েছেন। গত সপ্তাহে এ খাতটির বাজার মূলধন বেড়েছে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
গত সপ্তাহে দরবৃদ্ধির তালিকার তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভ্রমণ ও অবকাশ খাত। এ সময় খাতটির দর বেড়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। বিএটি বাংলাদেশের শেয়ারের দর বৃদ্ধিতে ভর করে গত সপ্তাহে খাদ্য ও অনুসঙ্গ খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। গত সপ্তাহে বিএটি বাংলাদেশের দর বেড়েছে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এছাড়া টেলিযোগাযোগ খাতের দর বেড়েছে ১৩ শতাংশ। এর বাইরে সেবা ও নির্মাণ, ট্যানারি, জ্বালানি ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে ৮ থেকে ৯ শতাংশ। সূচকে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখা ব্যাংক খাতের শেয়ার দরও ৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।
এদিকে গত সপ্তাহে ডিএসইতে কেনাবেচার পরিমাণও বেড়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকও গত সপ্তাহে কিছু শেয়ার ক্রয় করেছে। গত সপ্তাহে ডিএসইর গড় লেনদেন হয়েছে ৪৫৩ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহের চেয়ে ৭১ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে প্রকৌশল, ফার্মাসিউটিক্যালস, ব্যাংক, সাধারণ বীমা ও সিমেন্ট খাতে। একক কোম্পানি হিসেবে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হওয়া কোম্পানি হচ্ছে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, এসএস স্টিল, খুলনা পাওয়ার কোম্পানি, গ্রামীণফোন, বিকন ফার্মা, সিঙ্গার, প্রাইম টেক্সটাইল, এডিএন টেলিকম ও এসকে ট্রিমস।
