কথাটা স্পষ্টভাবেই বলে ফেলা যাক দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈঠক বৈষম্য-সংকটের সমাধান দেবে না। কারণ এতে অংশগ্রহণকারী অতি ধনী আর ক্ষমতাবান ১ শতাংশই পৃথিবী নামের গ্রহটিকে নিংড়ে নেওয়া আর ৯৯ শতাংশকে ছুড়ে ফেলা ব্যবস্থাটির মূল সুবিধাভোগী। অসমতা কীভাবে আমাদের সবাইকে আঘাত করে তা বোঝার জন্য বেশি খোঁজখবর করার দরকার নেই। বিশ্বজুড়েই অসাম্য বেশির ভাগ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনীদের সম্পদ বেড়েই চলেছে। আমরা সত্যিই এক অসমতার সংকটের মধ্যে বাস করছি।
যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকাই। সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি জেফ বেজোস দুঃখ করে বলেন, এত সম্পদ কীভাবে খরচ করবেন ভেবে পান না তিনি। বেজোস তাই চাঁদে বসতি স্থাপন করার কথা ভাবছেন। তার অ্যামাজন কোম্পানিকে ২০১৯ সালে শূন্য ফেডারেল আয়করের পরও ১২৯ মিলিয়ন ডলার ট্যাক্স রিবেট দেওয়া হয়েছে। অথচ বেশির ভাগ আমেরিকান সীমিত আয়ে দিনগুজরান করতে হিমশিম খাচ্ছে। এভাবে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, যা সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় ব্যয় করা যেত। এই কর রেয়াত নিশ্চিতভাবেই অ্যামাজনের সাধারণ কর্মীদের ভালো বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়া নিশ্চিত করবে না। জলবায়ুবিষয়ক জরুরি অবস্থাও বৈষম্যের বিষয়টিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। বড় বড় দূষণকারী কোম্পানিকে এ গ্রহটিকে অব্যাহতভাবে লুণ্ঠন করতে দেওয়ার জন্য আমরা কোটি কোটি মানুষের জীবন উৎসর্গ করছি। তারা হচ্ছে মূলত সবচেয়ে দরিদ্র এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিবাসী। অস্ট্রেলিয়া দাবানলে পুড়ে যাচ্ছে, ইন্দোনেশিয়া হিমশিম খাচ্ছে নজিরবিহীন বন্যায়। অথচ দেশগুলোর সরকার বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের পক্ষে ওকালতি করায় ব্যস্ত। আমাদের সমাজের ভিত্তিমূলে রয়েছে পুরুষতন্ত্র, বর্ণবাদসহ অনেক ধরনের বৈষম্য। নারী (বিশেষ করে অশ্বেতাঙ্গ নারীরা) ক্রমবর্ধমান অসাম্যের সবচেয়ে বড় শিকার। সবচেয়ে অনিশ্চিত কাজে তারাই নিয়োজিত থাকে আর সরকারি সেবায় কাটছাঁট হলে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশি। নারীদের কাজের বড় অংশের (অর্থের বিনিময়ে বা পারিশ্রমিকহীন যা-ই হোক না কেন) কোনো স্বীকৃতি ও পুরস্কার নেই। ক্ষমতা ও সম্পদ ক্রমেই গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে পুঞ্জীভূত হতে থাকায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এটা মনে হওয়া সহজ যে এলিটশ্রেণির ক্রমেই ফুলেফেঁপে ওঠা ধনসম্পদ, পুরুষতন্ত্র, বর্ণবাদ ও জলবায়ুবিষয়ক জরুরি পরিস্থিতি পৃথক পৃথক সমস্যা আর এগুলোর সমাধান আলাদাভাবে হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তব সত্যটি হচ্ছে, এগুলোর সবই অভিন্ন নিওলিবারেল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকেই উদ্ভূত। সমাজের ১ শতাংশই এর পেছনে কলকাঠি নাড়ে। অসমতা কেবল ব্যবস্থার একটি ত্রুটি নয়, এটিই এর নকশার প্রাণকেন্দ্র। ধনসম্পদ ও ক্ষমতার জন্য অভিজাতদের সীমাহীন লোভ এই গ্রহ এবং মানবজাতির ক্ষতি করছে। বৈষম্য এভাবে অব্যাহত থাকলে মানবাধিকার টিকবে না। অনেক সাংবাদিক এবং ভাষ্যকার ২০১৯-কে ‘প্রতিবাদের বছর’ বলে অভিহিত করেছেন। আমরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর তরফ থেকে প্রতিবাদ বাড়তে দেখেছি। পাশাপাশি দেখেছি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে ন্যায়বিচারের দাবিতে ক্রমবর্ধমান আন্দোলন। জনগণ সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ করছে। তারা একটি নতুন গল্প লিখছে যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলবে না। দেশে দেশে বিভিন্ন ইস্যু এক হয়ে এক বিশাল আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। চিলিতে ব্যাপক বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় মেট্রোর ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে। ফ্রান্সের ক্ষেত্রে দায়ী ছিল ক্রমবর্ধমান জ্বালানির দাম। লেবাননে ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায় নতুন ‘হোয়াটসঅ্যাপ ট্যাক্স’। বিশ্বজুড়ে তরুণরাই এ গ্রহটিকে বিপর্যয়কর জলবায়ু পরিবর্তন থেকে বাঁচাতে রাস্তায় নেমেছে। কারণ পুরনো প্রজন্মগুলো তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এই প্রতিবাদগুলোও সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ মানুষ উপলব্ধি করতে পেরেছে, পরিবর্তন হতে হবে পদ্ধতিগত, কেবল ছোটখাটো সংস্কারে কাজ হবে না। কেউ যদি মনে করে যে এই নতুন দশকে ২০১৯-এর প্রাণশক্তি এবং দাবি আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, সে ভুল করবে। এই জানুয়ারিতে, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে যখন সমানে শ্যাম্পেনের বোতল খোলা চলছিল, তখন যুক্তরাজ্য, ফিলিপাইন, জাম্বিয়া, কেনিয়া, ভারত, জিম্বাবুয়ে, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, মেক্সিকোসহ ৩০টির বেশি দেশের পথে পথে ফুঁসছিল বিক্ষুব্ধ মানুষ। সমন্বিত এই বৈশ্বিক বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে বৈষম্যের মূল কারণগুলোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন রুখে দাঁড়াচ্ছে।
বৈষম্য এবং এটি আরও যেসব সংকটের জন্ম দেয় তার সমাধান দাভোসের তুষারে ছাওয়া শীতল পাহাড় থেকে আসবে না। তা আসবে সান্তিয়াগো, বৈরুত আর ম্যানিলার উত্তপ্ত রাজপথগুলো থেকে। উন্নততর সামাজিক সেবা, জলবায়ু, ন্যায়বিচার, ন্যূনতম জীবনমানের নিশ্চয়তা দেওয়া মজুরি, গণতন্ত্রের সুরক্ষা, এলজিবিটিকিউআইএ + অধিকার, লৈঙ্গিক সমতা এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের দাবি নিয়ে আমরা পথে নামব। আর হ্যাঁ, আমরা জেফ বেজোসের গোত্রের লোকদের ওপর আরও কর আরোপের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। ধনীরা সীমাহীন সম্পদের পেছনে ছোটার কারণে যে বিশৃঙ্খলা আর ধ্বংস নেমে এসেছে তার জন্য তাদের মূল্য চোকানোর সময় এসেছে। যখন ধনী ব্যক্তিরাই (অন্তত তাদের মধ্যে কিছু লোক) তাদের সম্পদের ওপর আরও বেশি কর আদায় করার আহ্বান জানায়, তখন আমরা বুঝতে পারি বৈষম্য আসলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। অতি ধনীদের কিছু শুভ উদ্যোগকে সুসংবাদ বলে মনে হতে পারে। তবে সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী ব্যক্তিদের দিয়ে অসমতার সমাধান হবে না। আর সরকার এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিশ্রুতি এবং অতি ধনী ব্যক্তিদের দানদক্ষিণার অঙ্গীকার আমাদের এই সংকট থেকে বের করে আনবে তা ভাবাটা খুব সরলতা হয়ে যাবে। ডব্লিউইএফ বলতে কিন্তু তা-ই বোঝায়। বস্তুত, পঞ্চাশতম বছরে এসে ডব্লিউইএফ পরিণত হয়েছে ছলনার প্রতিমূর্তিতে। এর দিন শেষ। পরিবর্তন আসবে রাজপথে। আমরা এখন ক্ষমতার নতুন এক ভারসাম্য দেখছি, যার সূত্রপাত করেছে জনগণ। ২০১৯-এর বড় বড় বিক্ষোভ এই নতুন বছর এবং দশকের বাকি বছরগুলোতে আমরা যেসব পদক্ষেপ নেব তার জন্য একটি অনুপ্রেরণা ও প্রেক্ষাপট হিসেবেই কাজ করবে। দিকে দিকে জনগণ একত্র হচ্ছে। দ্রুত ও জরুরি প্রণোদনার সঙ্গে কাজ করছে তারা। সংকট সমাধানের জন্য তাদের সমাধানগুলো এগিয়ে দিচ্ছে আমাদের সামনে। আমরা এখন বুঝতে পারছি, বিশ্বজুড়ে নিজ নিজ সমাজে আমরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি তার মূল এক ও অভিন্ন অসমতা। আমরা একটি প্রগতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পরস্পরের হাত ধরছি, যেখানে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের সুবিধার্থে আমাদের জীবনকে তুচ্ছ গণ্য করা হবে না। বৈষম্যের মেকি সমাধানের যুগ শেষ। এখন আমরা আমাদের নেতাদের বলছি : এলিটদের কথা নয়, রাজপথ থেকে ওঠা দাবি শুনুন।
লেখক : বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ‘ফাইট ইনইকুয়ালিটি অ্যালায়েন্স’-এর বৈশ্বিক আহ্বায়ক
আল-জাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ
