সমাজ থেকে যেকোনো অপরাধ নির্মূল করতে হলে প্রথমে স্বীকার করতে হবে যে অপরাধটা হচ্ছে। অপরাধের কারণ খুঁজে বের করে সেটা দূর করতে হবে এবং অপরাধীদের বিচার করতে হবে। কিন্তু যে অপরাধকে প্রকারান্তরে অপরাধ বলেই স্বীকার করা হচ্ছে না সেটা বন্ধ করা যাবে কীভাবে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু’র বিষয়টিও কি ঠিক এই রকম একটি অপরাধ নয়, যা স্বীকার করা হচ্ছে না? ‘ক্রসফায়ার’ কিংবা ‘এনকাউন্টার’ নাম দিয়ে যেমন অনেক ক্ষেত্রে ‘টার্গেটেড কিলিং’ বা হত্যাকা-কে আড়াল করা হয়, ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু’র ঘটনাগুলোও কি তেমনি প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করে না? সাম্প্রতিককালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রকাশ করেছে তা উদ্বেগজনক। এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে এই ধরনের অপরাধ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের বিষয়ে আইনপ্রণেতাদের মনোভাবের কারণে। সম্প্রতি ধর্ষণ প্রতিরোধের লক্ষ্যে ধর্ষকদের ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘এনকাউন্টার’-এর মাধ্যমে মেরে ফেলার যে দাবি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে তা সম্ভবত এই মনোভাবের আরেক দৃষ্টান্ত।
রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘আইন আছে প্রয়োগ নেই’ শিরোনামে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু রোধের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, সরকার ২০১৩ সালে ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)’ আইন করলেও গত ছয় বছরে এ আইনে কারও সাজা হয়েছে এমন কোনো নজির নেই। তবে এ আইনে করা ১৭টি মামলা এখন বিচারাধীন। কিন্তু এই আইন পাস হওয়ার পর বিগত ছয় বছরে এমন নির্যাতন ও মৃত্যু যে কমেনি বরং বেড়েছে, সেটা পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়। বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, কেবল ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে (গ্রেপ্তার দেখানোর আগে) নির্যাতনে ৪ জন, বিজিবির (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) হাতে ২ জন এবং গ্রেপ্তার দেখানোর পর পুলিশের নির্যাতনে ৬ জনসহ মোট ১২ জন নিহত হয়েছে। একই সময়ে পুলিশ হেফাজতে ২ জনের ‘আত্মহত্যার’ ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে বিভিন্ন ঘটনায় সারা দেশে নিহত হয়েছে ৩৫৬ জন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার দেখানোর আগে ২৬৭ ও গ্রেপ্তারের পর ৮৯ জন এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, গ্রেপ্তারের আগে-পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে হরহামেশাই। অথচ ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা ও উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানায় আটক বা গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অক্ষত অবস্থায় সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করতে পুলিশ বাধ্য। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবশ্যই তাদের পরিচয়পত্র পেশ করে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার এবং এর কারণ জানাবে। আর যাকে ধরা হবে তার মানবাধিকার যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, তাকে কোনো ধরনের নির্যাতন যাতে না করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেন যথাযথ আইনি সুবিধা পান তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে আপিল বিভাগের রায়ে। এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ ধারা অনুযায়ী, হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের (রিমান্ড) ক্ষেত্রেও শারীরিক নির্যাতন না করার বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। বলা বাহুল্য যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আইন, ফৌজদারি কার্যবিধি কিংবা আদালতের নির্দেশনা যেমন মানা হচ্ছে না, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এসব বিষয়ে কোনো জবাবদিহি করছেন না।
নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা যাদের, তাদের হাতেই যদি নাগরিকদের জীবন সংশয়ের আশঙ্কা দেখা দেয় কিংবা নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে ওঠে তাহলে সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে কীভাবে? যে থানা, কারাগার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও সুরক্ষিত জায়গা হওয়ার কথা সেখানেই অনাকাক্সিক্ষত নির্যাতন ও মৃত্যু ঘটলে তা নিশ্চয়ই মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। উপরন্তু বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে হেফাজতে কোনো মৃত্যু ঘটলে কোনো তদন্ত ছাড়াই সঙ্গে সঙ্গে সেটিকে আত্মহত্যা বা হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। নির্যাতন বা মৃত্যু যেভাবেই হোক প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তে যদি কেউ দোষী হন তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশই আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণ আইনটি পাসের পর মানবাধিকারকর্মীসহ সচেতন নাগরিকরা ভেবেছিলেন, এবার হয়তো এমন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। এ অবস্থায় ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ’ আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রের কোনো সংস্থা-প্রতিষ্ঠান-বাহিনীকেই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখা যায় না। এই আইন যথাযথভাবে প্রয়োগই এক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে।
