প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার আলোচনার পর আবারও সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এবার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সরকারি কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে শেয়ার ছাড়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ লক্ষ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ১৪ কোম্পানির সঙ্গে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়ার বিষয়ে পর্যালোচনা সভার ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব ও বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব উপস্থিত থাকবেন। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ১৪ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদেরও উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে বড় ধরনের দরপতনে করণীয় নির্ধারণে ১৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে যান এসইসির চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেন। বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার পরও পুঁজিবাজারে দরপতন অব্যাহত থাকায় প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চান তিনি। বাজারে তারল্য জোগান, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ঋণসুবিধার পাশাপাশি পুঁজিবাজারে মানসম্মত আইপিও বাড়াতে বহুজাতিক ও সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি তালিকাভুক্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চান এসইসি চেয়ারম্যান। ওই বৈঠকের পর থেকেই মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে ঋণ দিতে তহবিল গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। আর সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্তির বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের যেসব কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো লিক্যুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস লিমিটেড, বাখরাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, গাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি, জালালাবাদ গ্যাস টিঅ্যান্ডটি সিস্টেম, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি, নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ, আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি ও বিআর পাওয়ারজেন লিমিটেড।
এর বাইরে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ তালিকাভুক্ত হলেও এ দুই কোম্পানির আরও শেয়ার বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ রয়েছে সরকারের। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে এ দুই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদেরও আসতে বলা হয়েছে।
ওই বৈঠকে সরকারি কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর অনুমোদিত মূলধন, পরিশোধিত মূলধন, শেয়ার ও ইকুইটি, সর্বশেষ তিন বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ও অন্যান্য তথ্য উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।
২০০৬ সাল থেকে পুঁজিবাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। এর আগের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও সরকারি কোম্পানিগুলোকে শেয়ার অফলোডে বিভিন্ন সময়ে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সরকারি কোম্পানির শেয়ার ছাড়তে উদ্যোগ নেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। মূলত সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের অনীহা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পথে বাধা তৈরি করেছে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে সরকারি কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা তালিকাভুক্ত না হওয়ার কারণ হিসেবে লোকসান, সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন না করাসহ বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়েছিলেন। এ ছাড়া লাভজনক কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা জানান, তাদের নতুন করে মূলধনের প্রয়োজন নেই। ২০১৬ সালে অ্যাসেনসিয়াল ড্রাগস পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য অনুমোদন পেয়েও শেয়ার ছাড়েনি। গত ১০ বছরে শুধু আশুগঞ্জ পাওয়ার বন্ড ইস্যু করে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির আরও ১০ শতাংশ এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের আরও ১৬ শতাংশ শেয়ার অফলোড করার নির্দেশনা থাকলেও তা কার্যকর হয়নি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ছাড়া প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ, চিটাগাং ড্রাইডক, জিইএম কোম্পানি লিমিটেড ও বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি লিমিটেড, কর্ণফুলী পেপার মিলস, বাংলাদেশ ইনস্যুলেটর অ্যান্ড সেনিটারি ওয়্যার ফ্যাক্টরি লিমিটেড ও ছাতক সিমেন্ট মিল লিমিটেডের শেয়ার ছাড়ার নির্দেশনা দেওয়া হলেও ১০ বছরে তা সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারের দরপতনে ভালো আইপিওর অভাবের বিষয়টি আলোচনায় এলে নতুন করে সরকারি লাভজনক কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হলো।
