চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের দেশে ফেরার পরামর্শ দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। চীনের বাংলাদেশি দূতাবাস জানিয়েছে, হুবেই প্রদেশের উহান শহর ছাড়া অন্য যেকোনো শহর থেকে বিমানযোগে দেশে ফেরার সুযোগ রয়েছে।
বাইরে থেকে আসা কারও মাধ্যমে যেন দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য সব স্থল ও বিমানবন্দরে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গত ৬ দিনে চীন থেকে বাংলাদেশে সরাসরি যে কয়টি ফ্লাইট এসেছে সেখানে দুই হাজারের বেশি যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কারও শরীরে করোনাভাইরাসের লক্ষণ মেলেনি।
এদিকে চীনে যাওয়া-আসার বিষয়ে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের চিন্তা করছে সরকার। আগামী ২৮ জানুয়ারি আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বরিবার পর্যন্ত দেশটিতে দুই হাজার জনের বেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে অন্তত ৫৬ জন। অন্য ১৩টি দেশে আক্রান্ত হয়েছে ৩৮ জন।
চীনে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে হুবেই প্রদেশের উহান শহরে। ওই শহরে বাস করছে কমপক্ষে ৩০০ বাংলাদেশি। উহান ছাড়া বাকি যেকোনো রুট থেকে বাংলাদেশিদের দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশি দূতাবাসের উপ-প্রধান মাসুদুর রহমান বলেন, চীনে বাংলাদেশি কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্তের খবর নেই। আমরা চীন সরকারকে জানিয়েছি আমাদের লোকদের যেন বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়। চীনের সরকার বাংলাদেশিসহ সব বিদেশিদের বিশেষ যত্ন নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বেশিরভাগ অভিযোগ পাচ্ছি উহান শহর থেকে। কিন্তু শহরটি অচলাবস্থায় আছে। দূতাবাসে ২৪ ঘণ্টা হটলাইন সেবা দিচ্ছি। দূতাবাস কর্মকর্তারা পালাক্রমে ডিউটি দিচ্ছেন। আমরা শতাধিক লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছি। এখানে জনপ্রিয় ওইচ্যাটে বাংলাদেশি গ্রুপ খোলা হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা বড় জনগোষ্ঠীর কাছে অল্প সময়ে বার্তা দিতে পারছি।’
এদিকে গতকাল রবিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জরুরি সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘চীন-বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেক গভীর। দেশের বহু মানুষ বাণিজ্যিক কারণে চীনে যাতায়াত করেন। সুতরাং এ ভয়াবহ করোনাভাইরাস বাংলাদেশে যেকোনো উপায়ে চলে এলে সেটি বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ কারণে ২৮ জানুয়ারি আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে চীনে ও চীন থেকে বাংলাদেশে সব ধরনের ভ্রমণ সাময়িকভাবে স্থগিত করা যায় কি-না, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে।’
সভায় বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর জানান, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ নাও ধরা পড়তে পারে। যেহেতু চীনে বহুসংখ্যক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছেন, সুতরাং তারা সবাই এখন ফিরতে গিয়ে এ ভাইরাস দেশে আনলে তা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কাজেই বাংলাদেশ-চীন যাতায়াত সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার উদ্যোগ নিতে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান।
করোনাভাইরাস যাতে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য ২০ জানুয়ারি থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে চট্টগ্রামের শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এখন পর্যন্ত বিমানবন্দরে চীন থেকে আসা ২ হাজার ৪৮ যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের কারও মধ্যে এই ভাইরাসের লক্ষণ পাওয়া যায়নি।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে চীন থেকে যাত্রী আসা কমে গেছে। চীন থেকে আসা বাংলাদেশি যাত্রীদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে, তারা চীনের কোন শহরে কত দিন ছিলেন। আর চীনের কোন শহর থেকে এসেছেন।
আমাদের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, করোনাভাইরাস ঠেকাতে জেলার ভোমরা স্থলবন্দরে সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। গতকাল সকাল থেকে সেখানে বসানো হয়েছে মেডিকেল টিম। আক্রান্তের উপসর্গ আছে এমন সন্দেহজনক কাউকে পেলে সিভিল সার্জনকে অবহিত করা হচ্ছে।
মোংলা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মোংলা বন্দরে এখনো কোনো প্রকার সতর্কতা কার্যক্রম গ্রহণ করেনি কর্র্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে বন্দর কর্র্তৃপক্ষের সহকারী নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. আইয়ুব আলী বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো নির্দেশনা না আসায় সতর্কতা জারি করা হয়নি।
আখাউড়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে করোনাভাইরাস শনাক্ত করতে মেডিকেল ডেস্ক স্থাপন করেছে কর্র্তৃপক্ষ। চীনের নাগরিক এবং ভারত ও বাংলাদেশের যেসব যাত্রী সম্প্রতি চীন ভ্রমণ করেছেন তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। সন্দেহজনক কেউ শনাক্ত হলে তাকে রোগতত্ত্ব কেন্দ্রে পাঠানো হবে বলে জানানো হয়েছে।
