গত ২১ জানুয়ারি দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধপ্রযুক্তি বিভাগের এক শিক্ষকের পিএইচডি থিসিসের প্রায় ৯৮ শতাংশ হুবহু নকল। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কাজ শুরু করার এক থেকে দেড় বছরের মাথায় ২০১৫ সালে থিসিসের কাজ শেষ করে ফেলেন ওই শিক্ষক। অথচ একটি পিএইচডি থিসিসের কাজ শেষ করার জন্য সাধারণত তিন থেকে সাড়ে তিন বছর লাগে আর উত্তর আমেরিকায় চার থেকে ছয় বছর লাগে। সারা পৃথিবীতেই পিএইচডি কাজের একটি সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। আবার ব্যতিক্রমীদের জন্য ব্যতিক্রম নিয়মেরও ব্যবস্থা আছে। ব্যতিক্রম মানে অতুলনীয় ও দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মতো কেউ যদি থাকে তার জন্য নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো দোষের কিছু নয়। কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায় দ্রুত কাজ শেষ করে প্রথমে তিনি সহ-তত্ত্বাবধায়কের স্বাক্ষর ছাড়াই ডিগ্রির জন্য অভিসন্দর্ভটি জমা দেন। কিন্তু সেখানে সহ-তত্ত্বাবধায়কের স্বাক্ষর না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবন থেকে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে অভিযুক্ত শিক্ষক আবুল কালাম লুৎফুল কবীর গবেষণার সহ-তত্ত্বাবধায়ক ও একই বিভাগের অধ্যাপক ফারুককে ‘অনেক অনুনয়-বিনয়’ করে তার কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে আবার জমা দিলে, তা ২০১৫ সালেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটে অনুমোদিত হয়। উল্লেখ্য, অভিযুক্ত শিক্ষক আবুল কালাম লুৎফুল কবীর বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টরের দায়িত্বে আছেন। আরও লজ্জার বিষয় যে সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক জোনাস নিলসন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. আখতারুজ্জামানকে একটি চিঠির মাধ্যমে আবুল কালাম লুৎফুল কবীরের বিরুদ্ধে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ আনেন।
সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের এক শিক্ষক জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রির সনদ নিয়েছেন বলে কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম হলো ‘যদি কোনো বিভাগের শিক্ষক ওই বিভাগেই পিএইচডি করেন, তবে তিনি দুই বছর পরেই পিএইচডি জমা দিতে পারবেন। সে নিয়ম অনুসারে দর্শন বিভাগের শিক্ষক হাফিজুল ইসলামকে পিএইডি প্রদান করা হয় ৩৭তম একাডেমিক কাউন্সিলে। এর এক বছর পর একই নিয়মে মোস্তফা কামালকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এ নিয়মটি শুধু ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের জন্যই প্রযোজ্য। তা ছাড়া এ নিয়মটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়সহ পৃথিবীর অনেক দেশেই আছে।’
ওপরের ঘটনা দুটি ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছে। দুই ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত শিক্ষক ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক শিক্ষকদের রাজনৈতিক গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং হয় প্রক্টর না হয় সহকারী প্রক্টর। ওপরের দুটি ঘটনায়ই দেখা যায় বিভাগের অভ্যন্তরীণ শিক্ষক বিধায় দুই বছরের মধ্যেই পিএইচডি ডিগ্রি লাভ। অর্থাৎ পিএইচডি ডিগ্রির মধ্যেও ছাড়? বিভাগের অভ্যন্তরীণ শিক্ষক হয়েছে বলে এই ছাড় দিতে হবে কেন? এ রকম উদাহরণ পৃথিবীতে আর কোথায় পাবেন? ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, চীন কোরিয়াসহ পৃথিবীর কোনো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যন্তরীণ শিক্ষকের জন্য এ রকম এক্সট্রা খাতির বা সময়ের রেয়াত পাওয়া কল্পনাও করা যায় না। এখন তো পিএইচডি ব্যতীত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই হওয়া যায় না। সুতরাং শিক্ষক হওয়ার পর নিজ বিভাগে পিএইচডি করার সুযোগই নেই। এমনকি কেবল পিএইচডি ডিগ্রিই এখন আর যথেষ্ট নয়। পিএইচডি ডিগ্রি লাভের পরও এক বা একাধিক পোস্ট-ডক অভিজ্ঞতা আছে কি না, সেটাও দেখা হয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কি দেখা যায়? এটাই সমস্যা। পিএইচডিবিহীন শিক্ষক নিয়োগ দিলে দেখা যায় অনেক শিক্ষকই আর পিএইচডি করতে দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পান না। ফলে তারা একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বোঝা হয়ে ওঠেন।
শুধুই কি নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি? অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে তাদের প্রায় সবাই একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও মাস্টার্স করেছেন। সত্যি বলতে কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব শিক্ষকই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও মাস্টার্স করা। এতে অসুবিধা কি? অসুবিধা হলো একজন ছাত্র মাস্টার্স পাস করেই তার নিজের বিভাগে নিয়োগ পেলে শিক্ষক হয়েই বিভাগের সব সহকর্মী হিসেবে পান নিজের সরাসরি শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকদের। তাই বিভাগের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কোনো জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেন না। তিনি কেবল জি স্যার, জি স্যার করতে করতেই অনেক বছর কাটিয়ে ফেলেন! ফলে তার মেরুদ- শক্ত হওয়ার কোনো সুযোগই তৈরি হয় না। এ জন্যই উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের নিজ গ্র্যাজুয়েটদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয় না। নিজ গ্র্যাজুুয়েটদের ফ্যাকাল্টি হিসেবে নিয়োগ দিলে আরেকটি অসুবিধা হলো, বিষয় ও চিন্তার বৈচিত্র্য আসে না। ফলে সব মিলিয়ে বিভাগগুলো একেকটি ভাগাড়ে রূপান্তরিত হয়। উন্নত বিশ্বে আপন গ্র্যাজুুয়েটদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না এ রকম কোনো লিখিত নিয়ম নেই; কিন্তু তারা এটাকে নিরুৎসাহিত করে। বিশেষ ক্ষেত্রে নিয়োগ দিলেও তারা নিশ্চিত হয় যে প্রার্থী অন্য কোথাও পোস্ট-ডক ও শিক্ষকতা করে সুনাম অর্জন করেছেন। তারপর তারা নিয়োগ পেতেও পারেন। প্রকৃতির একটি মূল নীতিই হলো বৈচিত্র্য। এ বৈচিত্র্যই হলো নতুন সৃষ্টি বা সৃষ্টিশীলতার আধার।
এই অভ্যন্তরীণ শিক্ষক বা ‘internal candidate’ নামে একটি টার্ম আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব প্রচলিত। এই টার্ম ব্যবহার করে কত যে অন্যায় সংঘটিত হয়েছে তার কিছু উদাহরণ তুলে ধরাই আজকের লেখার মূল উদ্যেশ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের জন্য কিন্তু প্রথাগত প্রমোশন বলতে যা বোঝায় সে রকম কিছু ছিল না। প্রতিটি প্রমোশনই আসলে নতুন করে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় টিকে নতুন করে নিয়োগ পাওয়া বোঝায়। কত সুন্দর নিয়ম! আমরা শিক্ষকরা শিক্ষক সমিতির মাধ্যমে চাপ দিয়ে এই নিয়মের একটি ব্যতিক্রমী ইনোভেটিভ উপায় বের করেছি যাকে বলে ‘restructuring কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা ছাড়াই প্রমোশন হয়ে যায়। কেবল দেখা হয় ন্যূনতম যোগ্যতা আছে কি না। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন নিয়োগের সময়ও অলিখিত ও অঘোষিত নিয়ম হলো অভ্যন্তরীণ বা ইন্টারনাল প্রার্থী থাকলে এবং তার ওই পদের ন্যূনতম যোগ্যতা থাকলে বহিরাগত প্রার্থীর যত ভালো যোগ্যতাই থাকুক অভ্যন্তরীণ প্রার্থীর প্রমোশন নিশ্চিত। সত্যি সত্যি যদি আমরা ‘restructuring’ সিস্টেমটা বাদ দিয়ে কে অভ্যন্তরীণ আর কে বহিরাগত না দেখে কেবল যোগ্যতম প্রার্থীর নিয়োগ নিশ্চিত করতে পারতাম তাহলে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুরবস্থা হতো না। সেটা করতে হলে শিক্ষকদের প্রমোশন আর বেতন বৃদ্ধি এই দুটোকে Decouple বা আলাদা করতে হবে। শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধিকে মোটামুটিভাবে সময়ের সঙ্গে গেঁথে দিয়ে প্রমোশনকে যদি রিওয়ার্ড এবং বেতনের সঙ্গে এক্সট্রা বোনাস হিসেবে রাখতে পারতাম তাহলে অনেক কিছুর সমাধান হতো বলে আমার বিশ্বাস। প্রমোশনের সঙ্গে বেতনের যোগসাজশের কারণে অধিকাংশ শিক্ষকই এটিকে বেতন বৃদ্ধি হিসেবে দেখেন। কিন্তু এর সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণায় উৎকর্ষ জড়িত সেটা অনেকেই মনে রাখে না।
আমরা ইন্টারনাল ক্যান্ডিডেট বা অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের কীভাবে প্রমোট করি তার আরও কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়োগ কিংবা প্রমোশনের জন্য একটি অন্যতম শর্ত হলো গবেষণা। আর এই গবেষণাকে য়ঁধহঃরভু করা হয় বিশেষায়িত জার্নালে প্রকাশিত আর্টিকেলের সংখ্যা দিয়ে। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের সুবিধা দেওয়ার জন্য এক নজিরবিহীন আইন করেছেন। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিষয়ের একটি জার্নাল বা সাময়িকীর নাম ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল অব সায়েন্স’। এই জার্নালে আর্টিকেল জমা দেওয়ার জন্য অন্যতম প্রধান শর্ত হলো আর্টিকেলটি যারা লিখেছেন তাদের অন্তত একজনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হবে। বিষয়টা এ রকম যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক একটি গবেষণাপত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল অব সায়েন্সে প্রকাশ করতে চান সে ক্ষেত্রে তাকে বা তাদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে ধরতে হবে যিনি ওই আর্টিকেলের কো-অথর হতে রাজি। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের জন্য গবেষণায় কোনো রকম কন্ট্রিবিউট না করেও একটি আর্টিকেলের মালিক হওয়ার কী অনন্য তরিকা তারা আবিষ্কার করেছেন! আশ্চর্যের বিষয় হলো এ নিয়মটি যুগ যুগ ধরে চলছে। এ রকম একটি নিয়ম পৃথিবীর কোনো দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার কথা নয় এবং আমার জানা মতে নেই। কী অসভ্যতা! প্রথম কথা হলো বিশ্বে খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়ই আছে যেখান থেকে জার্নাল প্রকাশিত হয়। শুধুই কি তাই? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘জার্নাল অব সায়েন্স’-এর এডিটরিয়াল বোর্ডের সব সদস্যই কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পৃথিবীর কোথাও কোথাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিজস্ব জার্নাল প্রকাশ করলেও এডিটরিয়াল বোর্ডে কেবল ওই দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয় নয়, অন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা গবেষককেও এডিটরিয়াল বোর্ডের সদস্য করা হয়। অনেকেই হয়তো অক্সফোর্ড পাবলিশার্স কিংবা কেমব্রিজ পাবলিশার্সের নাম বলতে পারেন। কিন্তু এগুলোর সঙ্গে অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তেমন কোনো সম্পর্কই নেই। আসলে এগুলো অন্য যেকোনো প্রফেশনাল পাবলিশার্স যেমন Springer ,Elsevier ইত্যাদির মতোই সম্পূর্ণ স্বাধীন, যাদের সঙ্গে অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তেমন কোনো সম্পর্কই নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ছাত্র অন্যত্র মাস্টার্সের থিসিস করে। এই থিসিস তারা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের সঙ্গে করতে পারে। তবে থিসিস অন্যত্র অন্য যার সঙ্গেই করুক না কেন বিভাগীয় কোনো একজন শিক্ষক হবেন সুপারভাইজার আর যার সঙ্গে ছাত্র আসলে কাজ করবে সে হবে কো-সুপারভাইজার! কোন ধরনের অসভ্যতা বুঝতে পারছেন। যিনি আসলে ছাত্রের থিসিস কাজে তত্ত্বাবধান করবেন, তিনি হবেন সহ-তত্ত্বাবধায়ক আর কেবল অভ্যন্তরীণ শিক্ষক হওয়ার সুবাদে বিভাগের একজন শিক্ষক হবেন মূল তত্ত্বাবধায়ক, অন্তত কাগজে-কলমে। এখানেই শেষ নয়। ওই ছাত্র এবং বাইরের সেই সুপারভাইজারের সঙ্গে কাজ করলেও সেই কাজ থেকে যদি কোনো আর্টিকেল প্রকাশিত হয় তার একজন কো-অথর হবেন বিভাগের সেই শিক্ষক; যার ওই কাজে অথর হওয়ার মতো হয়তো কোনো কন্ট্রিবিউশনই নেই। আরও আছে। থিসিসে acknowledgement-এ অভ্যন্তরীণ তত্ত্বাবধায়ককে লালায়িত তোষামোদির বাক্যবাণে সমুদ্র বানিয়ে ফেলতে হবে আর আসলে যিনি কাজে সহযোগিতা করেছেন তাকে যত কম প্রশংসা করা যায় সেদিকেও নজর রাখা হয়। পৃথিবীর অনেক ভালো জার্নালেই কার কতটুকু ইন্টেলেকচুুয়াল কন্ট্রিবিউশন সেটা লিখিত আকারে ডিক্লেয়ার করতে হয়। ওই গবেষণা কাজে কোনো প্রকার সাবস্টেনশিয়াল কন্ট্রিবিউশন ছাড়া পেপারে অথর হওয়া অন্যায় কাজ। ছাত্ররা তো এগুলো দেখে। তারা এসব বোঝেও। এতে শিক্ষক সম্বন্ধে ছাত্রদের ধারণা ও সম্পর্ক নষ্ট হতে বাধ্য। আজ না হয় বাধ্য হয়ে পেপারে নাম দিল কিন্তু ভবিষ্যতে সুযোগ এলে ফাহাম আব্দুস সালামের মতো কোনো একদিন সে ঠিকই বুঝবে।
শুধুই কি তাই? শিক্ষকদের সন্তানরা যখন ভর্তি পরীক্ষা দেন, সেখানেও তারা অভ্যন্তরীণ শিক্ষকের সন্তান হওয়ার সুবিধা ভোগ করেন। অর্থাৎ ভর্তির ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সন্তানদের জন্য এই বিশেষ কোটা আছে। পৃথিবীর আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বলুন তো যেখানে এ রকম কোটা সিস্টেম বলবৎ আছে। আমরা জানি আমাদের দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া কত কঠিন। বিজ্ঞান অনুষদে ৯০ হাজার ছাত্রছাত্রী ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয় কেবল ১ হাজার ৭০০ আসনের জন্য। শিক্ষকদের সন্তানরা ভর্তি পরীক্ষায় টিকতে না পারা বরং বাবা হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জার। লজ্জা তো আমরা পাই-ই না উল্টো আমরা আমাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে এই অন্যায় সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছি। এসব ঠিক না করলে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টেলিটক, বিমান, রেল ইত্যাদির মতো নষ্ট হতেই থাকবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বলে যা ইচ্ছে তাই করার লাইসেন্স নিশ্চয়ই আমাদের ’৭৩-এর অধ্যাদেশ দেয়নি। ’৭৩-এর অধ্যাদেশের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু যে আস্থা এবং সম্মান আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমাজের ওপর রেখেছিলেন আমরা সেটি রাখতে পারিনি। অবারিত স্বাধীনতা আসলে স্বাধীনতা নয়। আশা করি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
লেখক
অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
