পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় গত রবিবার রাতে পাথর শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে একজন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় পুলিশ ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে চার-পাঁচ হাজার ব্যক্তিকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে তেঁতুলিয়া মডেল থানায় দুটি মামলা করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই উপজেলাটির বিভিন্ন স্থানে মেশিনের মাধ্যমে পাথর ভাঙা হয়ে আসছিল। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী নীতিমালা না মেনে পাথর ভাঙা মেশিনের ব্যবসা পরিচালনা করছিল। সম্প্রতি স্থানীয় প্রশাসন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পাথর ভাঙা মেশিনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরা বিক্ষোভে নামে। বিক্ষোভের একপর্যায়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধলে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর, বুড়াবুড়ি ও বাংলাবান্ধা এলাকায় এ ধরনের সাত শতাধিক পাথর ভাঙা মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে চার শতাধিক মেশিন রয়েছে শুধু বাংলাবান্ধা ও ভজনপুরে। ভারত থেকে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে ২০১১ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশে পাথর আমদানি শুরু হয়েছে। পাথর আমদানিকারকরা বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের আশপাশে কয়েক শতাধিক মেশিন স্থাপন করেছে। এখানে বোল্ডার পাথর এনে ভাঙার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়ে থাকে। মেশিনগুলোকে নীতিমালার মধ্যে আনতে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রণীত ‘পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ ও স্টোন ক্রাশিং মেশিন স্থাপন নীতিমালা (সংশোধিত ২০১৩)’ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে কার্যকর করার কথা। কিন্তু ‘পাথর ভাঙা মেশিন স্থাপন নীতিমালা’ না মেনে যত্রতত্র স্থাপন করা হয়েছে বা হচ্ছে। তেঁতুলিয়া উপজেলায় প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক ক্রাশিং মেশিনে পাথর ভাঙা, নেটিং, শোটিং ও উত্তোলন কাজের সঙ্গে জড়িত।
বেসরকারি সংস্থা ‘পরস্পরের’ হিসাবমতে, পঞ্চগড় জেলার ১০-১২ হাজার নারী-পুরুষ সরাসরি ও ১ লাখ নারী, পুরুষ ও শিশু পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও শব্দদূষণের শিকার। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরসহ এলসি পাথর সরবরাহকারী এজেন্টদের পরিচালিত শতাধিক পাথর ক্রাশিং মেশিনে নারী ও পুরুষ শ্রমিক কোনোরকম স্বাস্থ্য সুরক্ষা ছাড়াই পাথর ক্রাশিং, নেটিং ও ডাম্পিংয়ের কাজ করছে। ক্রাশিং মেশিনে পাথর সাইটে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বন্দোবস্ত না থাকায় শ্রমিকরা নানা ধরনের অসুখে আক্রান্ত হচ্ছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, উন্মুক্ত পাথর ভাঙার মেশিন জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। পাথরের গুঁড়া ও ধূলিকণা শ্বাসনালিতে ঢুকে ফুসফুসের ক্ষতি করে। এত স্বাস্থ্যঝুঁকি আর কঠোর পরিশ্রমের পর মিলছে না ন্যায্য মজুরি। পরিবেশবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হচ্ছে পঞ্চগড়। বোমা মেশিনে পাথর তোলার কারণে একদিকে যেমন হাজার হাজার একর ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ভূগর্ভে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ২০১৫ সালের পর কয়েক দফা ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল পঞ্চগড় থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে নেপাল ও ভারতে। তাদের আশঙ্কা, নেপালের মতো ৭.৯ মাত্রা ভূমিকম্প হলেই তেঁতুলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা ধসে পড়বে। নদীর বুকে বালু ফেলার পাশাপাশি অসাধু চক্রটি দখল করে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে পাথর উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে। এ কারণে পঞ্চগড়ের নদীগুলো মৃতপ্রায়। মাটি খুঁড়লেই দেখা মিলবে পাথরের। একবার যে জায়গা থেকে পাথর উত্তোলন করা হয়, কয়েক বছর পর ঠিক একই জায়গায় প্রকৃতিগতভাবে পাথরের সন্ধান মেলে। আর তাই এখন আবাদি জমি খুঁড়ে সেখান থেকে পাথর উত্তোলন হচ্ছে, যার ফলে বদলে যাচ্ছে ভূপ্রকৃতি। যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে ভূমিধসের মতো ঘটনা।
ভূগর্ভস্থ এই পাথর নামক খনিজসম্পদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকাতেই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবাধে পাথর উত্তোলন করে চলেছে। গণমাধ্যমের তথ্য থেকে জানা যায়, প্রতি রাতে বিভিন্ন স্থানে মেশিন বসিয়ে প্রতিটিতে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকার পাথর উত্তোলন করা হয়। রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশসহ প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এই ব্যবসায়ীরা বড় অঙ্কের অর্থ আয় করছে। স্থানীয়ভাবে এ মেশিনের অশুভ চক্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনও সংঘটিত হয়ে আসছে। ২০০৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ড্রেজার মেশিনবিরোধী আন্দোলনের সময় আমিরুল ইসলাম নামক একজন স্থানীয় ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছিলেন। মাঝেমধ্যে প্রশাসন ব্যবস্থা নিলেও কিছুদিন পরই আবার চালু করা হচ্ছে পাথর ভাঙা। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন বিগত কয়েক বছরে ভ্রাম্যমাণ অভিযান চালিয়ে দুই শতাধিক মেশিন জব্দ করে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। গত বছরের প্রথমদিকে বেআইনিভাবে পাথর উত্তোলনে কোটি কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন ও অবৈধ অর্থ উপার্জনের বিষয়ে তদন্ত করতে তেঁতুলিয়ায় এসেছিল দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি প্রতিনিধিদল। একই বছরের আগস্ট থেকে স্থানীয় প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। মূলত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতেই শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করেছিলেন।
শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের বিষয়টিকে আরও সংযতভাবে মোকাবিলা করা যেত। বিশেষ করে শ্রমিকের প্রাণহানির পর চার-পাঁচ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা গ্রহণযোগ্য নয়। নিকট অতীতে অসংখ্য ব্যক্তিকে কোনো কোনো মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে হয়রানির দৃষ্টান্ত রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তেঁতুলিয়ার শ্রমিক এবং সাধারণ জনগণ যেন মামলার নামে হয়রানির শিকার না হয়, সেটা নিশ্চিত করাও জরুরি। পাশাপাশি, পরিবেশ বিধ্বংসী পাথর ভাঙা মেশিনের তৎপরতা রোধ এবং এ পেশায় নিয়োজিত শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিতে হবে।
