দেশের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় মূলধনী কোম্পানি গ্রামীণফোন বা ‘জিপি’। পুঁজিবাজারের অন্যতম বড় প্রভাবকও কোম্পানিটি। বিগত বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ইনডেক্স বা ‘ডিএসইএক্স’-এর লাগাতার দরপতনে জিপির শেয়ারের দরপতন ছিল অনেক কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি। এ সময়ে দেখা গেছে, জিপির শেয়ারের দাম ১ টাকা কমলে ডিএসইএক্সের প্রধান মূল্যসূচক প্রায় দশমিক ৬ শতাংশ কমে যায়। তাই সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসির সঙ্গে গ্রামীণফোনের হিসাব নিরীক্ষা বিরোধের জের ছিল পুঁজিবাজারের অন্যতম আলোচিত বিষয়। এসব বিবেচনায় দেশের পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডারদের লাভ-লোকসানের বিবেচনা আমলে নেওয়া জরুরি। এখন গত সাত বছরের মধ্যে গ্রামীণফোনের সবচেয়ে কম লভ্যাংশ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে এ আলোচনা আবারও সামনে চলে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে দেখা যাচ্ছে যে, জিপি-বিটিআরসি নিরীক্ষা বিরোধের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডাররা।
গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘পাওনার বিরোধে কমেছে গ্রামীণফোনের লভ্যাংশ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জিপির লভ্যাংশ ঘোষণার খবর প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, গত মঙ্গলবার ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সমাপ্ত হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য অন্তর্বর্তী লভ্যাংশসহ মোট ১৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে গ্রামীণফোনের পরিচালনা পর্ষদ। এ লভ্যাংশ ২০১৩ সালের পর সর্বনিম্ন। ২০১৮ সালে কোম্পানিটি নিট মুনাফার চেয়ে বেশি লভ্যাংশ দিয়েছিল। সে সময় কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ২৬ টাকা ৪ পয়সা আর লভ্যাংশ হিসেবে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের দিয়েছিল ২৮ টাকা করে। এর আগে ২০১৩ সালে গ্রামীণফোন ১৪০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। তারপর ২০১৯ সালে এই সর্বনিম্ন লভ্যাংশ ঘোষণা করল গ্রামীণফোন। এবার শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ২৫ টাকা আর শেয়ারপ্রতি লভ্যাংশ দেওয়া হলো ১৩ টাকা করে। সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন লভ্যাংশ ঘোষণার কারণ জানতে চাইলে গ্রামীণফোন কর্র্তৃপক্ষ দেশ রূপান্তরকে ই-মেইল বার্তায় জানায়Ñ বর্তমানের অনিশ্চয়তা ও ব্যবসায় স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে লভ্যাংশ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্রামীণফোনের পরিচালনা পর্ষদ এ লভ্যাংশের প্রস্তাব দিয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে, নিরীক্ষা দাবির পাওনা নিয়ে নানামুখী সংকটে রয়েছে দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন। অবশ্য বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় থাকার পরও গ্রামীণফোনের আয় বেড়েছে। দেখা যাচ্ছে, সরকারি পাওনার বিপরীতে সঞ্চিতির অংশ হিসেবে নিট মুনাফার একটি বড় অংশ সংরক্ষণ করছে কোম্পানিটি। দৃশ্যত গত সাত বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে কম লভ্যাংশ ঘোষণা করা এরই ফল। গত ২৪ নভেম্বর বিটিআরসি ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকার নিরীক্ষা দাবির নোটিসের ওপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখে গ্রামীণফোনকে তিন মাসের মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ। এ আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়ে গত ২৬ জানুয়ারি ১২ কিস্তিতে ৫৭৫ কোটি টাকা পরিশোধের প্রস্তাব দিয়েছে গ্রামীণফোন। যদিও গ্রামীণফোনের আবেদনের শুনানি এখনো হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানিটি ২০১৯ সালের নিট মুনাফা থেকে ১ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা সঞ্চিতি হিসেবে সংরক্ষণ করছে।
২০১৯ সালে সব মিলিয়ে গ্রামীণফোনের নিট মুনাফা হয়েছে ৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, গ্রামীণফোনের প্যারেন্ট কোম্পানি টেলিনর দেশের পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত নয়। তবে গ্রামীণফোনের মোট শেয়ারের ১০ শতাংশ ঢাকার পুঁজিবাজারে ছাড়া হয়েছে। তথাপি দেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় মূলধনী কোম্পানি হিসেবে বাজারের অন্যতম বড় প্রভাবকে পরিণত হয়েছে গ্রামীণফোন। কোম্পানিটি একই সঙ্গে দেশের অন্যতম শীর্ষ করদাতাও। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান মতে, সরকার মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ২০ শতাংশ পেয়ে থাকে গ্রামীণফোন ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর কাছ থেকে। এমন বিদেশি কোম্পানিগুলো দেশের নিয়ম মেনে ভালো ব্যবসা করলে তা অর্থনীতির জন্য যেমন ভালো তেমনি পুঁজিবাজারের জন্যও ভালো। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে নানা জটিলতার কারণে বিদেশি ও বড় কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত হচ্ছে না। একইভাবে বলা যায়, গ্রামীণফোনের মতো বড় কোম্পানির সঙ্গে বিরোধ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশিদেরও একটা বার্তা দিচ্ছে, যা ইতিবাচক নয়।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বলা যায়, এখন গ্রামীণফোনের মুনাফার একটা অংশ সঞ্চিতি হিসেবে সংরক্ষণ সম্ভবত বিটিআরসির পাওনা পরিশোধে প্রস্তুতির ইঙ্গিতবাহী। যা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এর মধ্য দিয়ে জিপির শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দুঃখজনক। এ অবস্থায় নিরীক্ষা হিসাবের বিরোধ নিষ্পত্তি এবং শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা নিশ্চিত করার বিষয়ে সব পক্ষেরই দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য। উল্লেখ্য, বিটিআরসির নিরীক্ষায় দাবিকৃত অর্থের বেশিরভাগই সুদ এবং আরেকটি অংশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পাওনা। এমতাবস্থায় আলোচনার মধ্য দিয়ে বিটিআরসি-গ্রামীণফোন নিরীক্ষা বিরোধের আশু নিষ্পত্তি পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হতে পারে।
