মাঠের প্রচার শেষ, ডিজিটাল প্রচারে নির্বাক ইসি

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২০, ০২:৫৯ এএম

আইন অনুযায়ী গতকাল বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকেই শেষ হয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণা। আজ শুক্রবার থেকে পথসভা-মিছিলসহ কোনো ধরনের নির্বাচণী প্রচারণা চালাতে পারবেন না প্রার্থীরা। কিন্তু এই প্রচারণার আওতার বাইরে থাকছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মুঠোফোনের মাধ্যমে খুদে বার্তা পাঠানো ও ডিজিটাল প্রচারণা। নির্বাচণী আচরণবিধিতে এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। ফলে সব ধরনের প্রচারণার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এসব মাধ্যমে প্রচার চালালে ওই প্রার্থীর বিরুদ্ধে ঠিক কতটা ও কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারবে, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে ইসি।

বিশেষ করে কোনো প্রার্থী ফেইসবুকের মাধ্যমে প্রচারণা চালালে বা মুঠোফোনের মাধ্যমে ভোট চেয়ে খুদে বার্তা পাঠালে কিংবা কোথাও কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচার চালালে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই নির্বাচনী প্রচারণাসংক্রান্ত বিধিমালায়। এমনকি কেউ কোনো অভিযোগ করলে, তার সত্যতা যাচাইয়ে উপযুক্ত প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও নেই ইসির কাছে।

ইসি অবশ্য বলছে, সব ধরনের নির্বাচনী প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু আদৌ সে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে কমিশনের।

এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রচারণা মানে সব ধরনের প্রচারণা, সেটা যে মাধ্যমেই হোক। তাই বলে যদি কোনো প্রার্থী কারও বাড়িতে যান বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন, সেখানে ভোট চান, সেটা তো আর বন্ধ করা যাবে না। একইভাবে যদি কেউ তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেন বা কেউ যদি পুরনো কোনো কনটেন্ট শেয়ার বা লাইক দেন বা কোনো কমেন্ট করেন, সেটা কীভাবে বন্ধ করবেন? এ ব্যাপারে প্রচারণা বিধিমালায় আলাদা করে কোনো নির্দেশনা নেই।

এই সুযোগে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা মাঠে প্রকাশ্য প্রচারণা বন্ধ করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন। গতকালও তাদের ও সমর্থকদের ফেইসবুক পেজে ভোট চেয়ে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। তারা ভোট চেয়ে প্রার্থীর পক্ষে তৈরি করা ভিডিও ও বার্তা নতুন করে শেয়ার দিচ্ছেন। এসব কর্মী ও সমর্থকরা জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত ফেইসবুক পেজ থেকে প্রার্থীর নির্বাচনী জনসংযোগের লাইভ সম্প্রচার থেকে শুরু করে নানা ভিডিও কনটেন্টের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম শেষবারের মতো তুলে ধরা হবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ শেয়ার কিংবা তৈরি করা নিজস্ব ভিডিও কনটেন্ট নতুন করে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

উত্তর সিটি করপোরেশনের আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আতিকুল ইসলামের রয়েছে ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট। তার আগের মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ২০১৮ সালে মেয়র হন আতিকুল। তখনই ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট তৈরি করেছিলেন তিনি। শুরু থেকেই তার ব্যক্তিগত ফেইসবুক পেজের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা জমিয়ে তুলেছেন তিনি। নৌকার মেয়র প্রার্থী আতিকের মতো বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালেরও ব্যক্তিগত ফেইসবুক পেজ সক্রিয় রয়েছে বিভিন্ন জনসংযোগ সরাসরি সম্প্রচারে।

এ ব্যাপারে উত্তর সিটির আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলামের প্রচার কমিটির দপ্তর সেলের সমন্বয়ক প্রলয় সমদ্দার বাপ্পি গত রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা সব প্রচারের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি কঠিনভাবে অনুসরণ করি। রাত ১২টায় (গতকাল) প্রচার শেষ হওয়ার পর বিধি অনুযায়ী যতটুকু কর্মকা- চালানো সম্ভব ততটুকুই আমরা করব। মেয়রপ্রার্থীর মুভমেন্ট (গতিবিধি) ফেইসবুকে লাইভ করার পরিকল্পনা আছে। এ ছাড়া আচরণবিধির মধ্যে থেকে মিডিয়াকে সাক্ষাৎকার দেওয়া গেলে সেটাও করা হতে পারে। এমনিতে আতিকুল ইসলাম আগামীকাল (আজ শুক্রবার) সারা দিন অফিসেই থাকবেন। অনেকগুলো মিটিং আছে, সেগুলোতে অংশ নেবেন। এ ছাড়া মোবাইলে যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয় করবেন।

একইভাবে উত্তরের বিএনপিদলীয় মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল শুরু থেকেই ফেইসবুক-টুইটারের মাধ্যমে ব্যাপাক প্রচারণা চালান। তিনি ভিডিও কনটেন্টও তৈরি করেছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসের ফেইসবুক পেজ থেকে মাঠের প্রচারণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পাশাপাশি অনলাইন পোস্টার ও অনেক ধরনের ভিডিও কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়েছে। তাপসের জীবনী তুলে ধরার পাশাপাশি শর্টফিল্মের আকারে তুলে ধরতে দেখা গেছে তার বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা। মাঠের প্রচারণার পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালান ঢাকা দক্ষিণে বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেন। ইশরাকের নিজস্ব পেজের বাইরেও ফেইসবুকে অন্যান্য পেজ ও ইউটিউবে বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করে প্রকাশ করা হয়েছে। গতকালও এসব প্রার্থীর ফেইসবুক থেকে এসব কনটেন্ট নতুন করে প্রচার করতে দেখা গেছে।

কয়েকজন কাউন্সিলর প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিজিটাল প্রচারের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন থেকে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। এ জন্য মাঠের প্রচার শেষ হলেও ডিজিটাল প্রচার বন্ধ করবেন না তারা। প্রতিপক্ষ প্রার্থী কী করেন সেদিকে তাকিয়ে কেউ কেউ সিদ্ধান্ত নেবেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। নতুন ভিডিও আপলোড না করে নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকে যেসব ভিডিও ফেইসবুক, ইউটিউবসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে ছাড়া হয়েছিল, সেগুলোই নতুন করে বুস্ট করার কথাও বলেছেন প্রার্থীরা।

ডিএসসিসি ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন হয় এমন কিছু আমি করব না। ডিজিটাল প্রচারে কী করা যাবে কী করা যাবে নাÑএ ব্যাপারে ইসি আমাদের কিছুই বলেনি। তবে আমি চেষ্টা করব কাল (আজ) নতুন ভিডিও আপলোড না করতে। তবে আমার প্রতিপক্ষ যদি করে সে ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। পুরাতন ভিডিওগুলোই চলবে।

এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো এই প্রচারমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করার মতো প্রযুক্তিগত সামর্থ্য আমাদের নেই। আইনেও কিছু নেই। টেকনিক্যাল সাপোর্ট যদি হাতে না আসে বা আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকে, তা হলে আমরা কিছুই করতে পারি না। ইসি চাইলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তবে এই নির্বাচন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দল নিয়ে বিদ্বেষমূলক ও অপপ্রচার ঠেকাতে ইসি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে বলে জানান দক্ষিণের রিটার্নিং কর্মকর্তা ইসির যুগ্ম সচিব আবদুল বাতেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল প্রচারণার ব্যাপারে সত্যিকার কোনো কোড অব কনডাক্ট নেই। তবে যেহেতু প্রচারণা আজ (গতকাল) মধ্যরাত থেকে আনুষ্ঠানিক সমাপ্ত, ফলে সব ধরনের প্রচারণাই এর মধ্যে পড়বে। সামাজিক মাধ্যমে এমন কিছু ছাড়া যাবে না যেটা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে।

অবশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানোর পক্ষে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সবকিছু আইন দিয়ে হয় না। ডিজিটাল যুগে এ মাধ্যমে প্রচারণা চালালে কোনো অসুবিধা দেখি না। তা ছাড়া এ ব্যাপারে কোনো আইনও নেই। নির্বাচন কমিশন যদি চায়, মনে করে তাহলে আইন করে বন্ধ করতে পারে। এটা কমিশনকে করতে হবে।

রাত পোহালেই ভোট : আগামীকাল ১ ফেব্রুয়ারি শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একযোগে এই দুই সিটিতে ভোট হবে। ইসির তথ্যমতে, ভোটে প্রায় ৩৫ হাজার ইভিএম মেশিনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ২৮ হাজারের মতো ইভিএম মেশিন সরাসরি ভোটকেন্দ্রগুলোতে ব্যবহার করা হবে। বাকিগুলো বিকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে। ইভিএমের টেকনিক্যাল সাপোর্টের জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে সেনাবাহিনীর দুজন করে টেকনিক্যাল সদস্য মোতায়েন থাকবেন।

ইসি জানায়, উত্তর সিটিতে (ডিএনসিসি) ৫৪টি ওয়ার্ডে ভোটার সংখ্যা ৩০ লাখ দশ হাজার ২৭৩।  ১ হাজার ৩১৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ৮৭৬টি কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ (গুরুত্বপূর্ণ)। বাকি ৪৪২টি কেন্দ্র সাধারণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। দক্ষিণ সিটি (ডিএসসিসি) ভোটে ৭৫ ওয়ার্ডে ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪ ভোটার। মোট ১ হাজার ১৫০ কেন্দ্রের ভেতর ঝুঁকিপূর্ণ (গুরুত্বপূর্ণ) কেন্দ্র ৭২১টি এবং সাধারণ কেন্দ্র ৪২৯টি ঘোষণা করেছে ইসি।

ইসির জারিকৃত পরিপত্র অনুসারে নিরাপত্তার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে ছয়জন অস্ত্রসহ পুলিশ (একজন এসআই ও পাঁচজন এএসআই, কনস্টেবল), দুজন অস্ত্রসহ অঙ্গীভূত আনসার এবং ১০ জন লাঠিসহ অঙ্গীভূত আনসার/ভিডিপি সদস্য (চার ও ছয়জন পুরুষ) মোতায়েন থাকবে।

ভোটের দিন ঢাকা মহানগরে সব ধরনের গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে কিছু যানবাহন চলতে পারবে অনুমতি সাপেক্ষে। প্রচার শেষের পাশাপাশি আজ রাত ১২টা থেকে ১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বাস, বেবিট্যাক্সি/সিএনজি অটোরিকশা, ট্যাক্সি ক্যাব, মাইক্রোবাস, জিপ, পিকআপ, কার, ট্রাক, টেম্পো, অন্যান্য যন্ত্রচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে বলে এক প্রজ্ঞাপনে জানিয়েছে ইসি। মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকবে ৩০ জানুয়ারি রাত ১২টা থেকে ২ ফেব্রুয়ারি সকাল ৬টা পর্যন্ত। তবে মোটরসাইকেল ও বিভিন্ন যানবাহনে নিষেধাজ্ঞা রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের এজেন্ট, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ক্ষেত্রে শিথিলযোগ্য। এ ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষকদের পরিচয়পত্র থাকতে হবে। এ ছাড়া সিটি নির্বাচন উপলক্ষে ২৪ ঘণ্টা ইঞ্জিনচালিত নৌযান বন্ধ থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত