বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্যের মান আরও উন্নত করে সারা বিশ্বে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রবিবার বিকেলে বাংলা একাডেমি আয়োজিত মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২০ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিকে কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই নয়, বিশ্ব দরবারে পৌঁছাতে চাই। আমরা বাংলা ভাষার সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চাকে যেমন প্রণোদনা দিয়ে আসছি তেমনি অনুবাদ সাহিত্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করছি। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি এখন পর্যন্ত বিশ্বের ১৩টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, যা প্রতিটি বাংলাভাষী মানুষের জন্যই আনন্দের বিষয়।’
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে বাংলা একাডেমি আয়োজিত এবারের মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা হয়েছে। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু রচিত এবং বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থটির আনুষ্ঠানিকভাবে মোড়ক উন্মোচন করেন। অনুষ্ঠানে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া, মন্ত্রীবর্গ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টামন্ডলী, সংসদ সদস্য, বিদেশি কূটনীতিক, বাংলা একাডেমির সদস্য, সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক, কবি, প্রকাশকসহ সিনিয়র সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এবারের একুশে গ্রন্থমেলার অন্যতম আকর্ষণ বঙ্গবন্ধুর নতুন গ্রন্থ ‘আমার দেখা নয়াচীন’-এর প্রকাশনা। আমি বঙ্গবন্ধুর এ গ্রন্থের প্রকাশক বাংলা একাডেমি এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমরা আশা করি অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং কারাগারের রোজনামচার মতো এই গ্রন্থটিও দেশি-বিদেশি পাঠকের কাছে আদৃত হবে। বঙ্গবন্ধু যে কেবল রাজনীতিক ও রাষ্ট্রনায়কই ছিলেন না, একই সঙ্গে ছিলেন একজন অসামান্য লেখক এই বইগুলোর তার প্রামাণ্য দলিল হয়ে রইল।”
অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ বিজয়ীদের হাতে তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন কবিতায় মাকিদ হায়দার, কথাসাহিত্যে ওয়াসি আহমেদ, প্রবন্ধ/গবেষণায় স্বরোচিষ সরকার, অনুবাদে খায়রুল আলম সবুজ, নাটকে রতন সিদ্দিকী, শিশুসাহিত্যে রহীম শাহ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় রফিকুল ইসলাম (বীর উত্তম), বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞানে নাদিরা মজুমদার, আত্মজীবনী/স্মৃতিকথা/ভ্রমণকাহিনীতে ফারুক মঈনউদ্দীন, ফোকলোরে সাইমন জাকারিয়া। পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের হাতে তিন লাখ টাকার চেক, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এর আগে শিল্পী সাজেদ আকবরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থার শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকেও পাঠ করা হয়। মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং ঐতিহাসিক ভাষার গান আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি পরিবেশন করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণে বাংলা একোডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘বাংলা একাডেমি বঙ্গবন্ধু রচিত এবং বাংলা একাডেমি প্রকাশিত আমার দেখা নয়াচীন-এর গ্রন্থের মধ্য দিয়ে বছরব্যাপী বঙ্গবন্ধুবিষয়ক ১০০টি নতুন গ্রন্থ প্রকাশের কার্যক্রম শুরু করল। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে বাংলা একাডেমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সব গ্রন্থ এবং রচনার সমন্বয়ে শেখ মুজিবুর রহমান রচনাবলি প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই রচনাবলি সম্পাদনা করবেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা।’
শুভেচ্ছা বক্তব্যে ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এনডিসি বলেন, ‘জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে অমর একুশে গ্রন্থমেলা একটি ঐতিহাসিক শুভ পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গিত এই মেলা গোটা বাঙালি জাতির প্রাণের মেলা।’ প্রকাশক প্রতিনিধি মো. আরিফ হোসেন ছোটন বলেন, ‘একুশের গ্রন্থমেলা আমাদের জাতিগত বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির স্মারক। গ্রন্থকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা এখন সময়ের দাবি।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গিত অমর একুশে গ্রন্থমেলার এবারের আয়োজন আরও বিস্তৃত, ব্যাপক এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত। আমরা ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বর্ধিত পরিসরে অধিকসংখ্যক প্রকাশককে স্টল বরাদ্দের পাশাপাশি মেলার নান্দনিক অবয়ব নির্মাণে সর্বোচ্চ প্রয়াস চালিয়েছি। বিশ্বের দীর্ঘসময়ব্যাপ্ত এই গ্রন্থমেলার গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড এবং ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।’
সভাপতির ভাষণে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলায় জনমানুষের বিপুল আগ্রহ প্রমাণ করে মুদ্রিত বইয়ের ভবিষ্যৎ মোটেও অনিশ্চিত নয়। বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গিত এবারের মেলা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।’
উদ্বোধন অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন রামেন্দু মজুমদার, নূরুন্নাহার খানম ও ড. শাহাদাৎ হোসেন নিপু। উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী গ্রন্থমেলা পরিদর্শন করেন। বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয় গ্রন্থমেলার প্রবেশদ্বার।
